মনে হচ্ছে আমি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি- বললেন সুলতান মাহমূদ।
অবশ্যই, এটা হবে আপনার জীবন ও ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকি বললেন বুযুর্গ। যুদ্ধ সম্পর্কে আপনি ভালো জানেন সুলতান! এ ব্যাপারে আমার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, শত্রুরা কিন্তু আপনার ব্যাপারে বেখবর নয়। আপনি গোপনে নিজের চৌকির তল্লাশী নিন এবং নিজের আস্তীনেরও খবর নিন। আপনার নিজের ঘরের শত্রুরাই আপনার জন্যে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ ব্যাপারে আপনি কি আমাকে সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে পারেন? বুযুর্গকে অনুরোধের স্বরে বললেন সুলতান।
হ্যাঁ, আমার শিষ্যরা আপনার এক কর্মকর্তা সম্পর্কে বলেছে, সে নাকি হিন্দুদের কাছে ঈমান বিক্রি করে দিয়েছে। এই কর্মকর্তা শুরু থেকেই মুলতানে দায়িত্ব পালন করছে। আজ তার ঘরের দিকে আপনি একটু নজর রাখবেন। হয় তার কাছে কেউ আসবে, নয়তো সে কোন জায়গায় যাবে।
* * *
সুলতান মাহমূদ তখনি একজন ডেপুটি সেনাপতিকে সন্দেহভাজন কর্মকর্তার গতিবিধির উপর চোখ রাখার দায়িত্ব দিলেন। ডেপুটি সেনাপতি মধ্য রাতে সুলতানকে খবর দিলো, সন্দেহভাজন কর্মকর্তা একটি লম্বা আলখেল্লা পরে মাথা কাপড়ে ঢেকে এক হিন্দু প্রতাপশালী ব্যক্তির হাবেলীতে প্রবেশ করেছে।
সুলতান নির্দেশ দিলেন, সেই হাবেলীকে ঘেরাও করে প্রাচীর ডিঙিয়ে বাড়ির কেউ বুঝে উঠার আগেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে হাতেনাতে পাকড়াও করবে। যাতে অভিযোগ অস্বীকার করার সুযোগ না থাকে।
সঙ্গে সঙ্গে সুলতানের নির্দেশ পালিত হলো। প্রভাবশালী হিন্দুর হাবেলীর মূল ফটকের কড়া না নেড়ে পার্শ্ববর্তী বাড়ির ফটকের কড়া নাড়লো সুলতানের গোয়েন্দা বাহিনী। আর সেই হাবেলীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলা হলো। পার্শ্ববর্তী বাড়ির গেট খুলে দিতেই দ্রুতগতিতে সেই বাড়িতে কয়েকজন সৈন্য প্রবেশ করে তাদের কাছ থেকে জেনে নিলো, পাশের বাড়িতে উপর দিয়ে প্রবেশের পথ কোনটা? তারা জানালো, এদিক থেকে ওই বাড়িতে যাওয়ার কোন পথ নেই। ছাদ থেকে রশি বেয়ে নিচে নামতে হবে।
নির্দেশনা মতো কয়েকজন সৈনিক পাশের বাড়ির ছাদে রশি বেঁধে নিচে রশি ফেলে দিলো এবং একের পর একজন করে দ্রুততার সাথে কয়েকজন সৈনিক বাড়ির উঠানে নেমে পড়লো। প্রথম সৈনিক হাবেলীর উঠানে নামার সাথে সাথেই বাড়ির মধ্য থেকে কেউ তাকে দেখে হুশিয়ারী উচ্চারণ করলো- সাবধান! এখান থেকে চলে যাও, নয়তো প্রাণে বাঁচবে না ।
সাথে সাথে হুশিয়ারী উচ্চারণকারীর উদ্দেশ্যে পাল্টা হুমকি এলো- সাবধান! যেখানে আছে সেখানেই থাকো। একটু নড়াচড়া করলেই তীর ছোঁড়া হবে। আমরা কোন ডাকাত নই, সরকারী লোক।
ততোক্ষণে দশ বারোজন সৈনিক রশি বেয়ে সেই বাড়ির উঠানে নেমে পড়েছে। তারা হুশিয়ারি উচ্চারণকারী ব্যক্তির বুকে তরবারী ঠেকিয়ে বললো, গযনী সরকারের অমুক কর্মকর্তা কোন কক্ষে অবস্থান করছে?
ঠিক সে সময় এক সাথে দু’টি কক্ষের দরজা খুলে গেল, এবং বিষ্ময় ও আতংকগ্রস্ত চেহারা নিয়ে তিন জন তোক বাইরের অবস্থা দেখে আবার ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিতে চাইলো।
কিন্তু এরই ফাঁকে কয়েকজন সৈনিক দরজা ঠেলে কক্ষে ঢুকে পড়লো। অভিযুক্ত গযনীর কর্মকর্তা একটি পালংকের উপরে বসা ছিল। সে সৈন্যদের দেখে ঘরের এক কোণার দিকে লুকাতে চাচ্ছিল। কিন্তু সৈন্যদের একজন অভিযুক্ত কর্মকর্তার পাজরে তরবারী ঠেকিয়ে বললো- হাত উপরে উঠিয়ে ফেলো, কোন নড়াচড়া করবে না। সেই কক্ষের মেঝেতে একটি কাগজ পড়েছিল। সৈন্যরা সেই কাগজটি উঠিয়ে দেখলো, তাতে পেন্সিল দিয়ে একটা নক্সা আঁকা হয়েছে এবং কিছু সাংকেতিক চিহ্ন দেখানো হয়েছে। কাগজের গুরুত্ব বুঝে সৈন্যরা সেটি তোলে সংরক্ষণ করলো।
সেই কক্ষে আরো ছিলো দু’জন সুন্দরী তরুণী। তারা প্রায় অর্ধ নগ্ন । অসম্ভব সুন্দর তাদের দেহাবয়ব। পাশের কক্ষে ছিল চারজন অভিজাত হিন্দু। এরা সবাই মদ পানে লিপ্ত ছিলো। এরা সুলতান মাহমূদের কর্মকর্তার কাছ থেকে তার সফর সূচী জেনে নিয়ে সুলতানের অভিযান ভণ্ডুলের পরিকল্পনা তৈরি করছিলো। আর সুন্দরী তরুণী দু’জন তাদের দেহ ও রূপ দিয়ে গয়নীর ঈমান বিক্রেতাকে জাহান্নামের আয়াসে পরিতৃপ্ত করার আয়োজনে ব্যস্ত ছিলো।
অভিজাত এই হিন্দুরা অভিযানকারী সৈন্যদের সামনে থলে ভরা স্বর্ণমুদ্রা রেখে বললো- আপনারা আমাদেরকে ছেড়ে দিন, যতো স্বর্ণমুদ্রা দরকার আমরা তাই দেবো। প্রত্যেককে একজন করে সুন্দরী নারীও দেবো। এছাড়াও সাত পুরুষ পর্যন্ত নিশ্চিন্তে থাকার মতো ব্যবস্থা আমরা আপনাদের জন্য করে দেবো। বাকী জীবনটাকে সুখে কাটানোর জন্যে আমাদেরকে ছেড়ে দিন। নগদ উপহার নিয়ে জীবনটাকে ভোগ করুন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও গুরুত্ব তখন আর গ্রেফতারকৃত কর্মকর্তার বুঝতে বাকী রইলো না। অবস্থার আকষ্মিকতায় সে হতবাক হয়ে গেলো। তার মুখে কোন কথাই উচ্চারিত হলো না। গযনীর সৈন্যদেরকে হিন্দুদের কোন লোভ লালসাই দমাতে পারলো না। তারা সবাইকে গ্রেফতার করে সুলতানের কাছে নিয়ে এলো। সুলতান তখনো জেগে জেগে গোয়েন্দা অভিযানের রিপোর্ট পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
