চিন্তা করছো কি? ঘাবড়াবার কিছু নেই। সবই আছে আমাদের। প্রধান সেনাপতিকে আশ্বস্ত করতে বললেন সুলতান। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী ঈমান ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। দৃঢ় ইচ্ছা ও ঈমানী শক্তি থাকলে সবকিছুই সহজ হয়ে যায়।
সুলতান মাহমূদ ও আলতাঈ উভয়েই মানচিত্রের প্রতি মনোযোগ দিলেন এবং অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি করতে লাগলেন।
সুলতান মাহমুদ হয়তো তখনো বুঝতে পারেননি, তিনি এমন এক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন যাতে তিনি বিজয়ী হলে এটা হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে ইসলামের বিজয় এবং এই বিজয় সাধিত হলে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে অনুসারীদের সংশয় সৃষ্টি হবে।
১০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর মোতাবেক ৪১৬ হিজরী সনের ২২ শাবান সোমনাথের উদ্দেশ্যে রওয়ান হলেন সুলতান মাহমুদ। এসময় তার সাথে কতো জন সৈনিক ছিলো একথা কোন ঐতিহাসিক সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। কেউ বলেছেন, সোমনাথ অভিযানে ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী নিয়ে তিনি গযনী থেকে রওয়ানা করেছিলেন। কেউ বলেছেন, সোমনাথ অভিযানে রওয়ানা করার সময় গযনী থেকে তার সফর সঙ্গী হয়ে ছিলো ত্রিশ হাজার স্বেচ্ছাসেবী ।
হিন্দুস্তানের সীমানায় প্রবেশ করে সুলতান মাহমুদ লাহোরের দিকে না গিয়ে সোজা মুলতানের দিকে অগ্রসর হলেন। বিশাল সেনাবাহিনী দেখে মুলতানের লোকজনের মধ্যে কৌতুল সৃষ্টি হলো । সুলতান এমন বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে কোথায় যাবেন?
১০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর মোতাবেক ১৫ রমযান সুলতান মুলতান পৌঁছেন। নাসিরুদ্দৌলার বক্তব্য শুনে সুলতান মাহমূদ সাথে সাথেই সোমনাথ অভিযানে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেন, দুই কারণে–
১. যে কোন বিষয়ে কালক্ষেপণ ছিলো সুলতানের স্বভাব বিরোধী।
২. তখন ছিলো শীতকাল। গরম চলে এলে এই দীর্ঘ সফর তার সেনাদের জন্যে কষ্টকর হয়ে উঠবে, এজন্য তিনি কাল বিলম্ব না করে সোমনাথের উদ্দেশ্যে অভিযানের নির্দেশ দেন।
সুলতানের মুলতান আগমন ছিল খুবই দ্রুত। তিনি মুলতানে পৌঁছেই সেখানে নিয়োজিত গযনীর সরকারী কর্মকর্তাদের একত্রিত করে বললেন, আমাকে খুব তাড়াতাড়ি সোমনাথ পৌঁছার ব্যবস্থা করতে হবে।
সেই সাথে তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন, তার এই অভিযানের কথা যেনো বাইরের কেউ জানতে না পারে? আর পথের সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
বাস্তবে এতো বিশাল সেনাবাহিনীর আগমন ও তাদের গতিবিধি গোপন রাখার ব্যাপারটি সহজ ছিল না। কারণ সুলতানের শত্রুপক্ষের গোয়েন্দারাও সক্রিয় ছিল। সেখানে হিন্দুরাও বসবাস করতো। বাস্তবে মুলতানে তখনো হিন্দু বসতির সংখ্যাই ছিলো বেশি।
গযনী সালতানাতের যেসব কর্মকর্তা মুলতানে নিয়োজিত ছিলো, তাদের মধ্যে কেউ কেউ হিন্দুদের সুন্দরী নারী ও বিপুল টাকা পয়সার লোভে পড়ে ঈমান বিরোধী এবং রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। ফলে সুলতান মাহমুদ মুলতান পৌঁছার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই শীর্ষ হিন্দুরা জেনে ফেলেছিল সুলতান মাহমূদ সোমনাথ আমণ করতে যাচ্ছেন।
সোমনাথ মনিরের সবচেয়ে বড় শিবমূর্তিটি ছিল তখনকার হিন্দুদের অন্যতম প্রধান বেতা পুরো হিন্দু জাতির প্রাণ। কারণ শিব ছিল দেবতাদেরও দেবতা। সোমনাথের ধ্বংস তো দূরের কথা সোমনাথের এতটুকু অবমাননাও সহ্য করতে রাজী নয় হিন্দু সম্প্রদায়। মুলতানের হিন্দুরা যখন জানতে পারলো, সুলতান মাহমূদ সোমনাথ যাচ্ছেন, তখন তাদের আত্মা কেঁপে উঠলো। তারা সুন্দরী যুবতীদের ইজ্জত ও সোনার থলের বিনিময়ে সুলতানের সোমনাথ অভিযানের পরিকল্পনা জেনে নিলো। সাথে সাথেই সোমনাথ কর্তৃপক্ষের কাছে এই খবর পৌঁছানোর জন্য দূত পাঠিয়ে দিলো।
শুধু তাই নয়, যেসব ছোট্ট ছোট্ট রাজ্যের হিন্দু রাজাও বড় বড় মহারাজাদের সাথে তখনো পর্যন্ত সুলতান মাহমুদের সংঘর্ষ হয়নি, মুলতানের হিন্দুরা তাদের কাছেও খবর পৌঁছে দিলো। হিন্দুরা সোমনাথ রাজ্যের শাসক রায় কুমারের কাছে এই বলে খবর পৌঁছালো- তিনি যেনো সোমনাথের বাইরে সুলতান মাহমূদকে ঠেকানোর ব্যবস্থা করেন।
মুলতান পৌঁছে সুলতান মাহমূদ সোমনাথ অভিযানের জন্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উট ও পানির ব্যবস্থায় মনোযোগ দিলেন। মুলতানে সুলতানের এক বুযুর্গ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাত হলো।
বুযুর্গ সুলতানকে বললেন, সম্মানিত সুলতান! আপনি সোমনাথকে সেসব মন্দিরের মতো মনে করবেন না, যেসব মন্দির ইতোমধ্যে আপনি ধ্বংস করেছেন। সোমনাথ দুর্গকেও আপনি সেসব দুর্গের মতো মনে করবেন না, এরই মধ্যে যেসব দুর্গ আপনার বিজিত হয়েছে। আমাদের কা’বার উপর যদি আক্রমণ হয়, কা’বাকে বাঁচানোর জন্যে কি দুনিয়ার সকল মুসলমান জীবন বাজী রাখবে না? সোমনাথের জন্যও হিন্দুস্তানের সকল হিন্দু জীবনবাজী রাখবে। সোমনাথে আপনার কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। এটাকে শুধু একটি মন্দির বা দুর্গ ভাবার কোন অবকাশ নেই। এখানে ইসলাম ও পৌত্তলিকতা মুখোমুখি হবে। আপনি এখানে পরাজিত হলে সেটিকে ইসলামের পরাজয় ভাবা হবে। আর হিন্দুরা আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে তাদের শিব দেবতাই সত্য। তারা এটাও প্রচার করবে, শিবদেবের সামনে কেউ টিকতে পারবে না। এর পরিণতি হবে, উপকূল এলাকার দুর্বল মুসলমানরা হিন্দুত্বকে গ্রহণ করবে অথবা তাদেরকে হিন্দুত্ব গ্রহণে বাধ্য করা হবে।
