এদিকে মন্দির জুড়ে শুরু হলো নাসিরের খোঁজাখুঁজি। নাসিরের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিতে সোমনাথের প্রধান পুরোহিতের কোন উদ্বেগ ছিল না। কিন্তু নাসিরের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটি রাজা অৰ্জুন ও তার সঙ্গী পণ্ডিতকে খুবই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো। কারণ তাদের উভয় শিকারই হাত ছাড়া হয়ে গেছে।
মন্দির ও আশেপাশের এলাকায় রাজা অর্জুন ও তার সঙ্গীরা যখন নাসিরকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, তখন নাসির সোমনাথ থেকে দশ বারো মাইল দূরে ইমামের সামনে বসা। ইমাম সাহেব তাকে পেট ভরে খাওয়ালেন। এরপর গ্রামের একজন প্রবীন লোককে ডেকে আনা হলো। এই প্রবীণ এলাকার পথঘাট ও চলাচলের গতিপথ সম্পর্কে অত্যন্ত অভিজ্ঞ।
তাকে ঘোড়া না দিয়ে উট দাও- বললেন প্রবীণ। কারণ তাকে অনেক বড় মরুভূমি ও পাহাড়ী এলাকা অতিক্রম করতে হবে। ঘোড়া এতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারবে না, পথিমধ্যেই মারা যাবে। যাত্রীও মারা যাবে। প্রবীণ নাসিরকে পথ বুঝাতে বুঝাতে বললেন, দুপুর পর্যন্ত তুমি সূর্যকে হাতের ডানে রেখে অগ্রসর হবে এবং দুপুরের পর সূর্যকে বামে রেখে যেতে থাকবে। রাতের বেলায় ধ্রুবতারাকে নাক ও কাঁধের মাঝখানে রেখে পথ চলবে।
পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানোর পর তোমাকে পাহাড় ঘুরে যেতে হবে। তবে যতোটাই মোড় নিতে হোক না কেন দিনের বেলায় তুমি সূর্য এবং রাতের বেলায় ধ্রুবতারা লক্ষ্য করে যেভাবে চলতে বলা হয়েছে সেভাবে পথ চলবে। পর দিন রাতের অন্ধকারে নাসির একটি তরতাজা শক্তিশালী উটের পিঠে সওয়ার হয়ে সাথে পর্যাপ্ত রসদ নিয়ে গযনীর উদ্দেশ্য রওয়ানা হলো। কারণ, তাকে যথাসম্ভব দ্রুত গযনী পৌঁছাতে হবে।
* * *
নাসির উটের পিঠে সওয়ার হয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। দিন রাত বিরতিহীনভাবে পথ চলছিল নাসির। উঠের পিঠে বসেই কিছুটা ঘুমিয়ে নিতো। খুব সামান্য সময় সে উটকে বিশ্রাম দিতো।
এদিকে সুলতান মাহমূদ তার সকল প্রতিবেশি রাজ্যের একই চুক্তিতে আবদ্ধ করে প্রত্যেক শাসক ও সরদারের কাছ থেকে কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে গযনী ফিরে এসেছেন। এর ঠিক তিন চার দিন পরের এক বিকেলে তার কাছে খবর পাঠানো হলো, হিন্দুস্তানে নিয়োজিত নাসিরুদ্দৌলা নামের এক সৈনিক এসেছে। সে এখনই সুলতানের সাথে সাক্ষাত করতে চায়।
সুলতান সাথে সাথে তাকে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। নাসিরকে সুলতানের সামনে হাজির করা হলো। তাকে দু’জন প্রহরী ধরে রেখেছিল। কারণ, নিজের পায়ে ভর করে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তার ছিলো না। তার মাথা দুলছিল এবং শরীর মৃতদেহের মতো অসাড় হয়ে পড়েছিল।
নাসিরকে সুলতানের চৌকিতে শুইয়ে দেয়া হলো। সাথে সাথে চিকিৎসক ডাকা হলো। চিকিৎসক নাসিরকে দেখে বললো, রোগী অনেকটা অচেতন এবং তার ঘুমের প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। এই মুহূর্তে তার সাথে কোন কথা বলা যাবে না, তাকে বিশ্রাম দিতে হবে। চিকিৎসক তার পাশে বসে মুখের মধ্যে একটু একটু করে মুধ দিতে লাগলেন।
এভাবে কয়েক ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর নাসিরের চেতনা ফিরে এলো এবং সে ধীরে ধীরে চোখ মেললো। তখন তাকে উপযুক্ত খাবার ও পানীয় দেয়া হলো। পানাহারের পর সে কথা বলার শক্তি ফিরে পেলো। কথা বলার শক্তি ফিরে এলে সে সুলতানকে জানালো- কিভাবে তাকে এবং শেগুপ্তাকে হিন্দুরা অপহরণ করেছে এবং সে সোমনাথে কি দেখেছে এবং সোমনাথ সম্পর্কে কি শুনেছে। তা ছাড়া পালিয়ে এসে ইমামের সহযোগিতায় কিভাবে সে গযনী পৌঁছেছে তার সবই সুলতানকে সবিস্তারে জানালো নাসির। নাসির আরো জানালো, ওখানকার মুসলমানরা সুলতানের আগমন প্রত্যাশায় প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে। নাসির সেখানকার ইমাম সাহেবের পাগামও পেশ করলো।
আমার মন অনেক দিন থেকেই এমন একটা কঠিন অভিযানের কথা ভাবছিল। নাসিরের পয়গাম শোনার পর হিন্দুস্তানের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন সুলতার মাহমুদ। হিন্দুস্তানের মানচিত্রে ডাভেলের উপর আঙুল রেখে সুলতান বললেন, মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রথম এই জায়গাতেই লড়াই করেছিলেন। আর এই হলো… সোমনাথ।
তখনই প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈকে ডেকে পাঠালেন সুলতান মাহমুদ।
আলতাঈ! আমার মনে হচ্ছে এটা হবে আমার জীবনের শেষ অভিযান। মানচিত্র দেখো… খুবই লম্বা সফর এবং মারাত্মক কষ্টকর। আমি যদি সেখানে পৌঁছতে পারি, তাহলে ইতিহাসে আমি নতুন এক অধ্যায় সংযোজন করবো। আর এই যুদ্ধ হবে আমার জীবনের সকল যুদ্ধের চেয়ে কঠিনতম যুদ্ধ। ভবিষ্যতের লোকেরা সোমনাথের সাথে আমার নামও উচ্চারণ করবে।
আলতাঈ গভীরভাবে মানচিত্র দেখছিলেন। তিনি ইতিহাসের খ্যাতনামা অভিজ্ঞ সেনাপতি। জলে স্থলে পাহাড়ে মরুভূমিতে সব ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে ৪ যুদ্ধ করার বিরল অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। কিন্তু এতো দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে তিনি ৪ সেখানে তার সেনাদের নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন কি-না এ বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুললো। আলতাঈর চিন্তায় ছেদ ঘটিয়ে সুলতান বললেন, জানো আলতা! মুহাম্মদ বিন কাসিম কতদূর থেকে এসেছিলেন? আমি তার সেই ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই।
লাহোর আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আমরা সেখান থেকে প্রয়োজনীয় রসদ সামগ্রী নিতে পারব। মুলতানও আমাদের দখলে। সেখান থেকে আমাদেরকে বিপুলসংখ্যক উট সংগ্রহ করতে হবে। কারণ, পথি মধ্যে বিশাল মরু এলাকা রয়েছে। উট ছাড়া এই দুর্গম পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব হবে না।
