গযনী….. গযনী। বলে ইশারা-ইঙ্গিতে নিজেকে সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীর লোক বলে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করল নাসির। শশ্রুধারী লোকটি তাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেলেন। ঘরটি ছিল প্রকৃত পক্ষেই একটি মসজিদ এবং তিনি ছিলেন সেই মসজিদের ইমাম। তিনি নামাযের পূর্বে নীরবে কোন কিতাব পাঠ করছিলেন। তিনি এই এলাকাতেই থাকতেন। তবে তার কথাবার্তায় নাসির বুঝতে পারলো তিনি প্রকৃতপক্ষে এই এলাকার লোক নন।
ইশারা ইঙ্গিতে ইমাম সাহেবকে নাসির বুঝাতে সক্ষম হলো, সোমনাথের লোকেরা তাকে বন্দি করেছিলো, সেখান থেকে সে পালিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে তার একটি নিরাপদ আশ্রয় দরকার। ইমাম সাহেব আরেকজন লোককে ডেকে আনলেন। সেই লোকটি হিন্দুস্তানের বিভিন্ন ভাষা জানতো। নাসির হিন্দুস্তানের যে ভাষা বুঝততা এবং কথা বলতে পারতো সেই লোকটির কাছে সেই ভাষায় তার অবস্থা বললো। ফলে ইমাম সাহেব বুঝতে পারলেন, নাসিরের উপর দিয়ে কি অত্যাচার বয়ে গেছে এবং এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে তাকে এখন কি করতে হবে?
বস্তুত এখানকার মুসলমানরা সুলতান মাহমুদ সম্পর্কে তেমন কিছু জানতো । তারা তোক মুখে উড়ো উড়ো কিছু কথা শুনেছে- উত্তর পশ্চিমাঞ্চল থেকে এক শক্তিশালী লুটেরা বাদশাহ প্রতি বছর হিন্দুস্তানের বিভিন্ন মন্দিরে হামলা করে সেখানকার মূর্তিগুলোকে ভেঙে চুড়ে সোনা দানা লুট করে নিয়ে যায়। হিন্দুস্তানের পশ্চিমাঞ্চল থেকে যারা সোমনাথে পূজা করতে আসে তাদের মুখে তারা এসব কথাবার্তা শুনে আসছে।
নাসির তাদেরকে জানালো, সুলতান মাহমূদ কোন লুটেরা বাদশা নন। তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান সুলতান। তিনি হিন্দুস্তানে মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সালতানাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে চান। তিনি এখানকার মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি ও মুসলমানদের জীবন নিরাপদ করার জন্যে মন্দির ও মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করেন এবং সেখানে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।
আমরা আরব বংশোদ্ভূত লোক। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন আরব। তারা মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাথে এ দেশে এসেছিলেন, বললেন ইমাম। তিনি আরো বললেন, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা ডাবেল থেকে ফুল আদম পর্যন্ত গোটা উপকূলীয় এলাকায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই সোমনাথের তখন কোন গুরুত্বই ছিল না। মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রভাব কমে যাওয়ার পর সোমনাথ এতোটা প্রচার পেয়েছে। ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতেরা সোমনাথকে ঘিরে এমনসব কাহিনী ছড়িয়ে দিয়েছে যে, বড় বড় রাজা মহারাজারাও এখন সোমনাথে পূজা দিতে আসে।
সুলতান মাহমূদ যদি সত্যিকার অর্থেই মূর্তি সংহারী হয়ে থাকেন এবং ইসলামের পতাকাবাহী হয়ে থাকেন তবে তার জানা দরকার, এখানে সোমনাথ নামের একটি মন্দিরও আছে এবং হিন্দুরা দাবী করে তাদের দেবদেবীরা এই মন্দির বানিয়েছে।
আপনারা যদি আমাকে একটি ঘোড়া দিতে পারেন, তাহলে আমি গোয়ালিয়র ফিরে না গিয়ে সোজা গযনী চলে যাবে এবং সোমনাথ আক্রমণ করার জন্যে সুলতানকে অনুরোধ করবো।
তুমি হয়তো তোমার উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে সোমনাথ আক্রমণের কথা বলছো, বললেন ইমাম। সেই সাথে তিনি বললেন, তোমার সঙ্গীনী যে মেয়েটি কূপে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, হয়ত তারও মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছো তুমি।
ইমাম নাসিরের উদ্দেশ্যে বললেন, তুমি তো এই মন্দিরের প্রকৃত অবস্থা জানো না। এখানে কি ধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড ঘটে তা তোমাকে সবিস্তারে জানাবো এবং দ্রুত গযনী পৌঁছার জন্য ঘোড়াসহ সংক্ষিপ্ত পথও বলে দেবো। তোমার সুলতানকে জানাবে, সোমনাথ ইসলামের তৌহিদী ঝাণ্ডাকে উপড়ে ফেলার হুমকি দিচ্ছে এবং এখানে অসংখ্য নিরপরাধ মুসলিম তরুণীকে হত্যা করা হয়েছে। জানা নেই, কতোজন মুসলিম তরুণীকে এই মন্দিরে এনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে নাচতে বাধ্য করা হয়েছে এবং মূর্তির সামনে তাদের বলি দেয়া হয়েছে।
আমাদের ঘরে কোন সুশ্রী মেয়ে শিশু জন্মালে সেই শিশুকে কিংবা গোটা পরিবারকেই আমরা নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে দেই। তোমাদেরকে যে ভাবে এখানে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে, হিন্দুস্তানের বিভিন্ন জায়গা থেকে সুন্দরী মুসলিম তরুণীদের অপহরণ করে এখানে এনে জবাই করা হয়। এই মন্দিরটি একটি বিকৃত যৌন-অপকর্মকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এখানকার পুরোহিত ও পণ্ডিতেরা রাত দিন অশ্লীল অপকর্মে লিপ্ত থাকে।
ইমাম সাহেব দুভাষীর মাধ্যমে নাসিরকে সোমনাথের পুরো ইতিহাস, এই মন্দির ঘিরে যেসব অপকর্ম ও কর্মকাণ্ড হয় সবিস্তারে জানালেন। তিনি বললেন তুমি তোমার সুলতানকে বলো, হিন্দুস্তানের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ইসলামের আলো পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মোমের মতোই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
ইমাম সাহেব আরো বললেন, হিন্দুস্তানের মুসলমানরা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তারা সবসময় ভয় ও আতংকে দিন কাটাচ্ছে। এখানকার অধিকাংশ মুসলমান হিন্দুদের অত্যাচারে এ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ আরব দেশে ফিরে যাচ্ছে এবং হিন্দুরা ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছে।
ইনশাআল্লাহ আমরা আসবো, সুলতানও আশা করি এখানে অভিযান চালাবেন- ইমামকে আশ্বস্ত করতে বললো নাসির। তখন আপনি দেখবেন, হিন্দুদের কথিত এসব শক্তিধর দেবদেবী টুকরো টুকরো হয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে। দয়া করে আমাকে আপনারা একটি ঘোড়া দিন এবং পথের কিছু পাথেয় দিয়ে পথটা বলে দিন।
