আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি যা বলছে, এই কথা তোমরা পাথরের মূর্তির মাধ্যমে বাস্তবে ঘটিয়ে দেখাতে পারবে না- পণ্ডিতের উদ্দেশ্যে বললো নাসির। আমি বিশ্বাস করি, মজলুম ও অসহায় এই তরুণী যে ভবিষ্যতবাণী করছে তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
মহারাজ! এদের সাথে এতো কথা বলা কি খুব জরুরী? না আপনি এদের ধর্ম বদলাতে পারবেন, না ওরা আপনার ধর্ম বদলাতে পারবে? সোমনাথের প্রধান পুরোহিতের উদ্দেশ্যে বললো গোয়ালিয়রের পণ্ডিত।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো! এদের সাথে এতো কথা অর্থহীন। তবে এই যুবককে বলে দেয়া দরকার মনে করি, আগামী চাঁদের পূর্ণিমার দিন তাকে বলি দেয়া হবে। এবং তার রক্ত শিবদেবের পায়ে অর্পণ করা হবে। তাকে আমরা একথা বলে দিতে চাই কারণ আমরা কাউকে ধোকায় ফেলে বলি দিতে চাই না। তার জানা থাকা দরকার তাকে যে সোমনাথ কুরবানীর জন্য পছন্দ করেছে এটা যে কোন মানুষের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই যুবক খুবই ভাগ্যবান।
শুধু শুধুই নিজেকে ও তোমার দেবতাদেরকে তোমরা থোকা দিচ্ছো পণ্ডিত! বললো নাসির। তোমাদের শিবদেব কি জানে না, আমাদেরকে ধোকা দিয়ে অপহরণ করা হয়েছে? ধোঁকা দিয়ে আমাদের তিন সাথীকে হত্যা করা হয়েছে? তোমাদের ধর্ম এমন জঘন্য যে, নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে?
এ সময় প্রধান পুরোহিত তার একান্ত সেবকদের ডেকে বললো, এদের দু’জনকে নিয়ে যাও।
নাসিরকে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে দ্রুততার সাথে শেগুপ্তাকে নাসির বললো শেগুপ্তা! গযনীর আত্মাভিমানী মেয়েদের মতো ইজ্জত রক্ষার জন্যে জীবন দিয়ে দেবে তবু ইজ্জত দেবে না। আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো।
নাসির ও শেগুপ্তাকে মন্দিরের একটি খোলা জায়গায় নিয়ে গেলো মন্দিরের সেবকরা। এক সময় নাসিরকে শেগুপ্তার কাছ থেকে ভিন্ন করে ফেলা হলো। প্রত্যেকের সাথে ছিল দু’জন করে প্রহরী।
হঠাৎ শেগুপ্তার উচ্চ কণ্ঠস্বর ‘খোদা হাফেজ নাসির! ভেসে এলো নাসিরের কানে। পর মুহূর্তেই শোনা গেল, ধরে ফেলো, ধরে ফেলো, চিৎকার।
ভেসে আসা আওয়াজের দিকে তাকিয়ে নাসির দেখতে পেলো, সেখানে একটি বড় কূপের উঁচু বেদিতে দাঁড়িয়ে আছে শেগুপ্তা এবং পলকের মধ্যেই সেই কূয়ার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল শেগুপ্তা।
এ অবস্থা দেখে নাসিরকে ধরে রাখা দুই প্রহরীও কূপের দিকে দৌড়ালো এবং তাদের চেঁচামেচিতে আরো বহু লোক জমা হয়ে গেলো । ততোক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। বিশাল আঙিনায় একপাশে একটি মাত্র মশাল জ্বলছে। সমবেত সকল লোক কূপের ভেতর থেকে শেগুপ্তাকে উদ্ধারের জন্যে দৌড়াদৌড়ি করছে।
এক পর্যায়ে একটি দীর্ঘ দড়ি কূপের ভেতর ফেলা হলো এবং সেই দড়ি বেয়ে এক লোক কূপে নেমে গেলো। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, মরে গেছে!
এমন হৈ-হুঁল্লোড়ের মধ্যে নাসিরের প্রতি নজর রাখার ব্যাপারটি সবাই ভুলে গেলো। কিছুক্ষণ পর নাসিরের পাহারায় নিয়োজিত লোক দু’জন ভীত বিহ্বল অবস্থায় এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো, তারা নাসিরকে কোথাও দেখতে পেলো না।
ততোক্ষণে নাসির মন্দিরের চৌহদ্দি পেরিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। মন্দিরের লোকজন যখন শেগুপ্তাকে উদ্ধারের ব্যাপারে ব্যস্ত তখন নাসির চতুর্দিকে তাকিয়ে একদিকে একটা দরজার মতো দেখতে পেলো। ভাগ্যক্রমে সেটি দিয়ে সে বেরিয়ে দেখলো, সামনে খোলা মাঠ। সে দ্রুত খোলা মাঠ পেরুতে দৌড়াতে লাগলো এবং দৌড়ে সে অনেকটা দূরে চলে এলো।
নাসির মন্দির থেকে বেরিয়েই দেখতে পেয়েছিল সামনে সাগর। সাগর দেখে ঠিক এর উল্টো দিকে অগ্রসর হলো। দৌড়াতে দৌড়াতে এক পর্যায়ে তার সামনে পরলো একটি ছোট্ট নদী। এলাকাটি ছিল নাসিরের সম্পূর্ণ অচেনা অজানা । হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকায় কোন মুসলমানের বাড়িতেই কেবল তার জন্যে আশ্রয় হতে পারে। কিন্তু নাসিরের পক্ষে এটা জানার কোন উপায় ছিলো না যে এই এলাকায় কোথায় মুসলিম বসতি রয়েছে। আর সেটাইবা কোন দিকে। আল্লাহর নাম নিয়ে কাল বিলম্ব না করে নাসির নদী পার হয়ে গেলো । নদীতে তেমন পানি। ছিলো না।
নদী পার হয়ে নাসির বিরতিহীন পথ চলতে লাগলো। নাসির ভাবছিল সারা রাত যতটুকুই যাওয়া যায় সে পথ চলবে। দিনের আলোর যা হওয়ার হবে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ চলার পর তার চোখে পড়লো একটু আলো। আলো লক্ষ্য করে সে অগ্রসর হতে লাগলো। আলোর কাছাকাছি পৌঁছে নাসির দেখতে পেলো, মসজিদের মতো একটি মিনার সম্বলিত ঘরের মধ্যে আলো জ্বলছে। ঘরটি সম্পূর্ণ নির্জন এলাকায়। পাশে আর কোন ঘর নেই। তবে একটু দূরেই একটি বসতির মতো দেখা যাচ্ছে। নাসির পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো সেই বাতি ঘরের দিকে।
নাসিরের মনে হচ্ছিল এটি হয়তো মসজিদ হবে, কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারছিলো না, হিন্দুস্তানের এতোটা ভেতরেও কোন মসজিদ থাকতে পারে। পায়ে পায়ে ঘরটির আঙিনায় এগিয়ে গেল নাসির। গিয়ে দেখে ঘরের ভেতরে প্রদীপের সামনে বসে একজন সাদা শশ্রুধারী লোক কি যেন পড়ছে।
ভেতরে না গিয়ে দরজার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়াল নাসির। এমন সময় তার কানে ভেসে এলো- আসোলামু আলাইকুম…. নাসির জবাব দিলো- ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম…। সালামের পর লোকটি আরো যে কয়টি কথা বললো তার কিছুই নাসিরের পক্ষে বুঝা সম্ভব হলো না। কিন্তু লোকটির মধ্যে ইসলামের অনুশীলন দেখে নাসিরের মধ্যকার সকল ভয়ভীতি দূর হয়ে গেল এবং অনেকটাই নিরাপদবোধ করছিল নাসির।
