এই অশ্বারোহীদের মধ্যে শেগুপ্তাকে নিজের ঘোড়ায় তুলে ধরে রেখেছিল রাজা অর্জুন নিজে। আর নাসিরুদ্দৌলাকে একটি ঘোড়ার পিঠে ধরে রেখেছিল এক শক্ত-সামর্থ জোয়ান। একটি ঘোড়াতে সওয়ার ছিল পণ্ডিত। আর অন্যরা তাদের ভারাটে খুনী। ভাড়াটে খুনীদেরকে রাজা অৰ্জুন নগদ মুদ্রা দিতে চাইলে তারা বলে- আমাদের কোন নগদ টাকা-পয়সা দেয়ার দরকার নেই, আমরা আপনার খরচে আপনার সাথে সোমনাথ সফর করবো।
শেগুপ্তা ও প্রহরীদের হারিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে শেগুপ্তার সঙ্গীনীরা যখন গোয়ালিয়র দুর্গে পৌঁছে, ততোক্ষণে রাজা অর্জুনের দল অনেক দূরে চলে গেছে। গোয়ালিয়র দুর্গে কর্তব্যরত গযনীর কর্মকর্তাদের কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, রাজ্য হারা ভবঘুরে রাজা অর্জুন এমন ভয়ংকর কিছু একটা ঘটাতে পারে।
দুই দিন আগে দুর্গপতি মুসলিম শাসককে রাজা অর্জুন জানিয়েছিল, সে সোমনাথ যেতে চায়। তাকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হোক। দুর্গপতি তাকে সোমনাথ যাওয়ার অনুমতি দিলে রাজা অর্জুন দুদিন আগে সোমনাথের উদ্দেশে দুর্গ ত্যাগ করে।
সন্ধ্যার আগেই পণ্ডিতের দেখানো পথে অর্জুনের দল সেই পথের সন্ধান পেয়ে গেল, যে পথ দিয়ে সোমনাথের পানি বহণকারীরা যাতায়াত করে। এক পর্যায়ে পানি বহনকারী দলকে তারা পেয়ে গেল। পরদিন শেগুপ্তা ও নাসিরুদ্দৌলার বাঁধন খুলে দিয়ে রাজা অৰ্জুন তাদেরকে বললো- তোমরা যদি মুক্তির চিন্তা ও চেষ্টা করো তাহলে তা হবে অর্থহীন। এর চেয়ে বরং শান্তভাবে আমাদের সাথে থাকো। এটাই হবে তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। নাসিরুদ্দৌলার জিজ্ঞাসার পরও তাদেরকে জানানো হয়নি, কোথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
টানা বিশ দিন পথ চলার পর অর্জুনের দল সোমনাথে পৌঁছলো। অর্জুন ও পণ্ডিত নাসিরুদ্দৌলাকে সোমনাথের প্রধান পুরোহিতের সামনে দাঁড় করিয়ে তার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে বললো- এই তরুণীকে মন্দিরের জন্যে এবং এই যুবককে শিব দেবের নামে বলি দেয়ার জন্যে আপনার চরণে পেশ করছি।
নাসির পণ্ডিত ও অর্জুনের ভাষা বুঝতো কিন্তু শেগুপ্তা তাদের ভাষা বুঝতে । শেগুপ্তা ফারসী ভাষায় নাসিরকে জিজ্ঞেস করলো- এরা কি বলাবলি করছে? নাসির শেগুপ্তাকে এদের কথাবার্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলে দিল। নাসিরের কথা শুনে শেগুপ্তা ভীত হওয়ার পরিবর্তে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও রুদ্ররোষে তার ভাষায় হিন্দুদের গালমন্দ করতে শুরু করলো।
শেগুপ্তাকে এভাবে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে দেখে প্রধান পুরোহিত নাসিরকে জিজ্ঞেস করলো- মেয়েটি কি বলছে?
সে বলছে- আমি তোমাদের শিবদেবের উপর আল্লাহর লা’নত দিচ্ছি। পুরোহিতকে বললো নাসির। আরো জানালো, শেগুপ্তা বলছে, আমরা তোমাদের বহু দেবতাকে পায়ে পিষ্ট করে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ঘোড় দৌড়ের মঠে ছড়িয়ে দিয়েছি। তোমাদের এসব দেবদেবীকে মন্দিরে রাখা অশোভনীয়।
মেয়েটিকে বললো, আমাদের ধর্মকে সে যেন অপমান না করে। ধর্মের অবমাননা আমরা সহ্য করি না বললো প্রধান পুরোহিত। দেখবে, আমাদের ধর্মের অবমাননার জবাবে শিবদেব গযনীকে ধ্বংস করে দেবেন।
হু! তোমাদের এসব পাথুরে দেবতা আমাদের আল্লাহর মোকাবেলা করবে? আমরা এখন অসহায়, তোমাদের হাতে বন্দি, কিন্তু আমাদের আল্লাহ কোন জড় পদার্থ নন, তাকে কোন প্রকার অসহায় স্পর্শ করে না। আমাদের আল্লাহর প্রতিশোধের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করো পণ্ডিত! বললো নাসির।
শেগুপ্তা অস্থির হয়ে নাসিরকে জিজ্ঞেস করছিল এরা কি বলছে? শেগুপ্তাকে পুরোহিতের কথাবার্তা জানিয়ে দিলো নাসির। নাসিরের কণ্ঠে পুরোহিতের কথা শুনে শেগুপ্তা এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো যে চিৎকার করে কথা বলতে লাগল সে। তার মুখের থুথু ছিটকে গিয়ে প্রাধন পুরোহিতের গায়ে পড়তে লাগল। শেগুপ্তা অনবরত হিন্দুদের উপর অভিশাপ দিচ্ছিল।
অর্জুন মহারাজ! এরা তো ভয় পাওয়ার পরিবর্তে আমাদের গালমন্দ করছে অর্জুনের উদ্দেশ্যে বললো প্রধান পুরোহিত। এরা কি ভাবছে, আমরা এদের গালমন্দে ভীত হয়ে তাদের ছেড়ে দেবো?
আমরা শুধু আল্লাহকে ভয় করি পণ্ডিত! পুরোহিতের উদ্দেশ্যে বললো নাসিরুদ্দৌলা। মৃত্যুকে যদি আমরা ভয় করতাম তাহলে গযনীতেই বসে থাকতাম। আমরা আল্লাহর পয়গাম এখানকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে এবং রসূলুল্লাহর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় জীবন দেয়ার জন্যেই হিন্দুস্তানে এসেছি। আমরা জানি, এ মুহূর্তে আমরা অসহায় কিন্তু আমরা এজন্য খুশি যে, আমরা আল্লাহর পথে কুরবান হতে চলেছি। আমার কুরবানীতে তোমাদের কোনই উপকার হবে না, কিন্তু আমি পৌঁছে যাবো সরাসরি আল্লাহর দরবারে।
ওদের বলে দাও, এই মন্দিরেও সেই ধরনের ভয়াবহ বিপদ আসবে যে বিপদ হিন্দুস্তানের অন্যান্য মন্দিরে এসেছে। এদের এটাও বলে দাও, আমার পবিত্র দেহে যদি কোন পৌত্তলিক হাত তোলে তবে আমার আল্লাহ অবশ্যই এর প্রতিশোধ নেবেন- বললো শেগুপ্তা।
শেগুপ্তার কথা নাসির পণ্ডিতকে জানালো। নাসিরের কথা শুনে পণ্ডিত একটি বাঁকা হাসি দিয়ে বললো– তোমরা এমন জিনিসের পূজা করো, যা তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা আসলে অন্ধ। অন্ধকারে বসবাস করছো তোমরা। তোমরা জানো না, এই মন্দির কার তৈরি? যাকে তোমরা পাথর বলছো, তিনি শিবদেব। এখানে তোমাদের দেহ থেকে যেমন প্রাণ ছিনিয়ে নেয়া যাবে আবার তোমাদের মৃতদেহে প্রাণের সঞ্চার করা যাবে।
