ওরা আর জ্বলবে কখন, আমরাইতো জ্বলে ভষ্ম হয়ে যাচ্ছি, পণ্ডিত মহারাজ!
আপনি কি এখনো বুঝতে পারেননি মহারাজ হরিদেব মহাদেব ও কৃষ্ণদেব আমাদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট? এটা আপনাদের পাপের ফসল। আপনাদের মতো যাদের হাতে সৈন্যসামন্ত ছিল তাদের পাপের কারণেই আজ হিন্দুজাতির এই দুরবস্থা।
রাজা গোবিন্দ আর রাজা তরলোচনপাল আমাকে ধোকা দিয়েছে পণ্ডিতজী! নয়তো গযনীর একটি সৈনিকও জীবন নিয়ে পালানোর সুযোগ পেতো না। আর সুলতান মাহমুদ আমাদের হাতে বন্দি হতো ।
আমি শপথ করেছিলাম গযনীর সুলতানকে জীবন্ত পাকড়াও করবো, আর তাকে দিয়ে প্রতিদিন মন্দির ঝাড়ু দেয়াবো। আর সে মন্দিরে আসা পূজারীদের জুতা সোজা করবে.. যাক সেসব কথা। এখন আর এসব বলে লাভ নেই। আমাকে বলা হয়েছে, একটি সুন্দরী তরুণী ও একজন সুদর্শন যুবক মুসলমানকে নিয়ে সোমনাথ গিয়ে তরুণীকে মন্দিরে উপহার দিতে আর যুবককে সোমনাথের বেদীতে বলি দিতে। আর শিবদেবের পায়ে মাথা রেখে রাজত্ব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করতে। যাতে শিবদেব আমার রাজত্ব ফিরিয়ে দেন।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন আপনি। আমার মনের কথাটিই আপনি বলে দিয়েছেন। কিন্তু আমার তো মনে হয় না আপনি একাজ করতে পারবেন, বললো পণ্ডিত।
করতে পারবো- বললো রাজা অৰ্জুন। কিন্তু সুন্দরী তরুণী আর মুসলমান যুবক কোথায় পাবো?
কেন, আপনি কি একেবারে কাঙাল হয়ে গেছেন? রাজা হিসেবে আপনার কাছে নিশ্চয়ই এখনো অনেক ধন-সম্পদ আছে। আপনি চেষ্টা করে যান, শিকারের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে।
আছে, আছে পণ্ডিতজী! আমি কেবল রাজ্য হারা হয়ে গেছি। তাছাড়া বাকী সবই আমার আছে। মেহেরবানী করে আপনি আমাকে বলুন, শিকার কোথায় কখন কিভাবে পাওয়া যাবে?
আপনার রাজকুমারীরা কি মাঝে মধ্যে নদীতে স্নান করতে যেতো না? অনুরূপ মুসলিম শাসকদের ছেলেমেয়েরাও প্রায়ই নদ তে গোসল করতে যায়।
গযনীর শাহজাদীরা যায় নদীতে গোলস করতে? কি বলছেন এসব? সুলতান মাহমূদ তো থাকে গযনীতে। এখানে শাহজাদী আসবে কোত্থেকে?
আমি গয়নীর শাহজাদীদের কথা বলছি না। আমি বলছি সেসব কর্মকর্তাদের বিবি-কন্যাদের কথা যারা এখানকার দুর্গে বসবাস করে। এদের তরুণীরা প্রহরী সাথে নিয়ে প্রায়ই নদীতে নৌবিহার করতে আসে। আপনি কিছু উপহার উপঢৌকনক দিন, আমি এগুলো আমার বিশ্বস্ত লোকজনকে দিয়ে দু’একজন তরুণী ও দু’একজন যুবক প্রহরীকে অপহরণ করিয়ে নিয়ে আসবো। গোয়ালিয়র এখান থেকে বহু দূর। অপহরণের খবর যতোক্ষণে গোয়ালিয়র পৌঁছাবে ততোক্ষণে আমরা বহু দূর চলে যাবো।
আপনি কি সোমনাথের পথ জানেন? পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করলো রাজা অৰ্জুন।
আপনি কোথায় রাজত্ব করেন মহারাজ? প্রতিদিনই এ পথ দিয়ে সোমনাথের স্নানের পানি বহনকারী কাফেলা যাতায়াত করে। তারা খুব দ্রুত যাতায়াত করে। আপনি কি কয়েকটি ঘোড়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন? অন্তত ছয়টি দ্রুতগামী ঘোড়ার প্রয়োজন হবে।
ঘোড়া যে কয়টা দরকার জোগাড় করা যাবে। আমাকে ঠিক সময় মতো। খবর দেবেন তাহলেই হবে- বললো অর্জুন।
গোয়ালিয়র দুর্গে বহু উচ্চপদস্থ মুসলমান কর্মকর্তাদের পরিবার পরিজন বসবাস করতো। তাদের স্ত্রী কন্যারা প্রায়ই দশ পনেরো মাইল দূরে অবস্থিত পদ্মা নদীতে নৌবিহারের জন্য আসতো। একদিন কয়েকজন প্রহরীসহ চার যুবতী নৌবিহারে এলো। তাদের মধ্যে একজন ছিল খুবই সুন্দরী কিশোরী। সে ছিল একজন প্রবীন সেনা কমান্ডারের মেয়ে। তার নাম ছিল শেগুপ্তা। শেগুপ্তার তখনো বিয়ে হয়নি। বিয়ের কথাবার্তা চলছে। তাদের দলে ছিলো পাচঁজন নারী এবং চারজন সেনা প্রহরী।
নদীর তীরবর্তী একটি জায়গা ঘন ঝোঁপ ঝাড় এবং ঘন গাছ-গাছালীতে পূর্ণ। নদীর তীরটা এখানে ঢালু ও বালুকাময়। মেয়েরা জায়গাটি উপযুক্ত মনে করে এখানেই নেমে পড়লো এবং ঝোঁপের আড়ালে নদীতে জলকেলীতে মেতে উঠলো। তাদের প্রহরীরা সেখান থেকে একটু দূরে বসে গল্পগুজব করতে লাগলো।
এসময় গেয়ে পোষাকের একটি লোক ভীত বিহ্বল অবস্থায় হাঁপাতে হাঁপাতে প্রহরীদের কাছে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো- তিনজন লোক আমার স্ত্রীকে জোর করে নিয়ে গেছে। তারা আমাকে মারপিট করে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমার স্ত্রীকে বিবস্ত্র করে তার সম্ভ্রম হানির চেষ্টা করছে। এরা এখান থেকে বেশি দূরে নয় কাছেই আছে।
আপনারা মুসলমান! আপনারাই মহারাজ! আমাদের জীবন সম্ভ্রমের মালিক আপনারা! আতংকিত কণ্ঠে বললো লোকটি।
সাহায্যপ্রার্থী লোকটির কথা শুনে চার প্রহরী তার দেখানো পথে ছুটতে লাগলো। এরা যখন যথেষ্ট দূরে চলে গেলো তখন গোসলরত মেয়েদের উপর অতর্কিতে হামলে পড়লো ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজা অর্জুনের লোকেরা। তারা সেনা কমাণ্ডারের মেয়ে শেগুপ্তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল। অন্য মেয়েরা আতংকিত হয়ে আর্তচিৎকার শুরু করে দিল। গযনীর মেয়েদের চিৎকার শুনে প্রহরীরা যখন বিভ্রান্ত হয়ে তাদের দিকে ফিরে এলো, তখন ঝোঁপের আড়াল থেকে তাদের তিনজনের পাঁজরে বর্শা বিদ্ধ করলো হিন্দুরা। সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো তিন প্রহরী। আর একজনের উপর লাফিয়ে পড়ে তাকে ঝাঁপটে ধরে কাবু করে ফেললো।
শেগুপ্তাকে একটি ঘোড়ার পিঠে তোলে এবং বেঁচে থাকা একমাত্র প্রহরী নাসিরুদ্দৌলাকে বেঁধে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে আটটি ঘোড়া এক সাথে ঘনঝোঁপ ঝাড়ের মধ্যে দ্রুত ছুটতে লাগলো।
