সোমনাথের মূর্তিগুলোর চারপাশে পাঁচ মন ওজনের একটি খাঁটি সোনার শিকল দিয়ে দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল।
মন্দিরের প্রতিটি কক্ষেই কম বেশি মূর্তি ছিল। এসব মূর্তির সবগুলোতেই ছিল দামী মণিমুক্তা হীরা জহরত। প্রতিটি কক্ষের দরজায় ছিল খুব দামী কাপড়ের পর্দা। আর তাতে জড়ানো ছিল নানা রকমের হীরা জহরতের জরি ।
সোমনাথ মন্দিরের ব্যবস্থাপনা এতোটাই ব্যাপক ও বিশাল ছিল যে, প্রায় দশ হাজার পুরোহিত মন্দির এলাকায় অবস্থান করতো। তারা পর্যায়ক্রমে চব্বিশ ঘণ্টা পূজা-অর্চনায় লিপ্ত থাকতো। মন্দিরের জন্য এক হাজার গ্রাম দান করা হয়েছিল। এসব গ্রামের সকল আমদানী মন্দিরের প্রয়োজনে ব্যয় করা হতো। তাছাড়া হিন্দুস্তানের সকল রাজা মহারাজাই এই মন্দিরে মোটা অংকের অনুদান দিতেন। শুধু তাই না প্রতি চন্দ্র মাসের পূর্ণিমাতে লাখো পূজারী এখানে জমায়েত হতো। তারা মন্দিরে নিজেদের অর্জিত সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ দান করতো।
সোমনাথ থেকে গঙ্গা নদীর দূরত্ব ছিল অন্তত সাতশ মাইল। সেই সাত’শ মাইল দূর থেকে পানি এনে প্রতি দিন সোমনাথের মূর্তিকে ধৌত করা হতো। এজন্য বিশাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। সবসময় পানি আনা-নেয়ার কাজে অশ্বারোহী দল নিয়োজিত থাকতো। এভাবে একটা নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল গঙ্গা জলে মূর্তিদের পবিত্রকরণ কাজে।
সোমনাথ মন্দিরে গান-বাজনা ও নৃত্যগীতের জন্য সবসময় সুন্দরী তরুণীদের প্রস্তুত রাখা হতো। এরা হতো মন্দিরের জন্য উৎসর্গীত। বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত এসব সুন্দরী মন্দিরে নৃত্য গীত করতো। তাদের সহায়তা করতে তিনশ বাদক। বিভিন্ন রাজা মহারাজারাও মন্দিরে সুন্দরী নর্তকী দান করতো। অনেক হিন্দু মা-বাবা তাদের মেয়ে সন্তানকে মন্দিরের সেবাদাসী রূপে উৎসর্গ করে। দিতো।
মন্দিরের পুরোহিতরাই ছিল এখানকার রাজা। পুরোহিতদের হুকুমেই চলতো মন্দির। সকল নর্তকী সেবাদাসী পুরোহিতদের দাসানুদাস ছিল। পুরোহিতদের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করতে মন্দিরের এসব অবলা নারীদের ভাগ্য।
সোমনাথের প্রধান মূর্তিই হলো শিবের লিঙ্গ যা হিন্দু জাতির যৌনতার প্রতীক। সেবাদাসীরা নিজে থেকেই পুরোহিতদের যৌন লালসা মেটানোর জন্যে নিজেদের উপস্থাপন করতো। আর ভক্তদের দাবী পূরণে প্রকাশ্যেই পুরোহিতরা নারীদের উপভোগ করতো। সোমনাথ ছিল ধর্মীয়ভাবেই একটি অবাধ যৌনতার উন্মুক্ত কেন্দ্র।
তখন পর্যন্ত সোমনাথ সম্পর্কে সুলতান মাহমূদ তেমন কিছু জানতেন না। শুধু সোমনাথের খবরটি তার কানে পৌঁছে ছিল মাত্র। কোন দিন সোমনাথ আক্রমণের চিন্তাও তার মাথায় আসেনি। কারণ গযনী থেকে সোমনাথের দূরত্ব অন্তত সাত’শ মাইল। এই বিশাল এলাকা পাড়ি দিয়ে সোমনাথে আক্রমণ চালানোর ব্যাপারটি আজকাল সহজ মনে হলেও সেই যুগে এত সহজ ছিল না।
* * *
যে সময় সুলতান মাহমূদ তার প্রতিবেশি মুসলিম শাসকদের একত্রিত করে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা ও আনুগত্যের অঙ্গীকার নিচ্ছিলেন সেই দিনগুলোতে গোয়ালিয়রের রাজা অর্জুন বিভিন্ন মন্দিরে ঋষি ও পুরোহিতদের কাছে ধর্না দিয়ে তাদের অনুকম্পা পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অর্জুন সুলতান মাহমূদের কাছে চরম পরাজয়ের শিকার হয়েছিলেন। ফলে তার রাজ্যের লোকেরাও তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। এজন্য এক ঋষি তাকে পরামর্শ দিলো, তিনি যেন দামী উপহার উপঢৌকন নিয়ে সোমনাথ মন্দিরে গিয়ে সেখানকার পুরোহিতদের পায়ে পড়ে আবেদন-নিবেদন করে এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেন। ঋষি তাকে আরো জানালো, সোমনাথের পুরোহিতদের সবচেয়ে পছন্দের উপহার হলো সুন্দরী তরুণী। তরুণী ছাড়াও তিনি যেন একজন সুদর্শন যুবক মুসলমানকে সাথে নিয়ে গিয়ে সোমনাথের বেদীতে বলিদান করেন।
পণ্ডিত ও ঋষিদের পরামর্শ অনুযায়ী রাজা অৰ্জুন সুন্দরী তরুণী ও এ যুবক মুসলমানের তল্লাশী করতে লাগলেন। যে কোন রাজার জন্যে দু’চারজ। তরুণী সগ্রহ করা আর কোন একজন যুবক মুসলমানকে অপহরণ করা মোটেও কঠিন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু অর্জুন তখন নামে মাত্র রাজা। বাস্তবে নে রাজ্যহারা ভবঘুরে। তাছাড়া গোয়ালিয়র ও আশেপাশের রাজ্যগুলোতে মুসলিম জনবসতি খুব কম ছিল। অধিকাংশ মুসলমান বসবাস করতো ভেরা, মুলতানও লাহোরে। যুবতী ও সুন্দরী তরুণী এবং একজন সুদর্শন যুবক মুসলমানের ব্যাপারটিও তার জন্যে সমস্যার সৃষ্টি করেছিল।
একদিন গোয়ালিয়রের এক পুরোহিতের সাথে রাজা অর্জুনের সাক্ষাত হলো। গোয়ালিয়রে তখন মুসলমানদের রাজত্ব। মন্দিরের অবকাঠামো ঠিক থাকলেও সেখানে কোন মূর্তি ও পূজারী ছিল না। বরং সেখানে মুসলমানরা পাঁচ ওয়াক্ত আযান দিয়ে নামায আদায় করতো। রাজা অর্জুন পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এখন কোথায় থাকেন?
জঙ্গলে থাকি- জবাব দিলো পণ্ডিত। মন্দির উজাড় হয়ে গেলেও দেবতার পূজা থেকে তো আর আমাদের কেউ বিরত রাখতে পারবে না। গভীর জঙ্গলে গিয়ে আমরা ক’জন মিলে একটি ঝোঁপের মধ্যে মন্দির বানিয়ে নিয়েছি। আপনি দেখবেন মহারাজ মুসলমানদের উপর কঠিন বিপদ আসবে। অপবিত্র ম্লেচগুলো সামরিক শক্তিবলে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। এরা হরেকৃষ্ণ মহাদেব ও বিষ্ণদেবকে পরাজিত করতে এসেছে, দেখবেন এরা জীবন্ত পুড়ে ছাই ভয়ে পরিণত হবে।
