সর্বশেষ ২০০০ সালের দাঙ্গায় বহু মুসলিম নারী ও শিশুকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। অসংখ্য মুসলমানকে গৃহহীন করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে সেখানকার হাজার হাজার মুসলমান এখন উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
সিন্ধু অববাহিকা থেকে নিয়ে আরব সাগর তীরবর্তী গোটা উপকূল অঞ্চলে ছিল অসংখ্য মুসলমানের বসবাস। এসব অঞ্চলে মুসলমানরাই ছিলো সংখ্যাগুরু। এ অঞ্চলের মুসলমানদের আদিপুরুষরা ছিলেন মূলতঃ আরব। মুহাম্মদ বিন। কাসিমের সিন্ধু অভিযানের সময় যে সকল মুসলিম যোদ্ধা হিন্দুস্তানে এসেছিলেন তাদের অধিকাংশই হিন্দুস্তানে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেছিলেন।
মুসলমানদের আগমনের বহু পূর্ব থেকেই সোমনাথ ছিল একটি বন্দর এলাকা। এখানে প্রাচীনকাল থেকেই আরব বণিকেরা আসা-যাওয়া করত। বিভিন্ন দেশের জাহাজ এখানে এসে নোঙর করতো। ইসলামের আবির্ভারের পর এক দু’জন করে মুসলমান এখানে এসে বসবাস করতে শুরু করে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত অভিযানের সময়েও সোমনাথ এলাকায় অনেক মুসলমান। বসবাস করত।
সোমনাথ ছিল একটি বিশাল মন্দির। সারা ভারত থেকে হিন্দুরা এখানে পূজা দিতে আসতো। সোমনাথ এলাকার শাসক ছিল কুমার রায়। সে ছিল ভীষণ অত্যাচারী। মুসলমান প্রজাদের উপর খুবই অত্যাচার করতো। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ আছে, প্রতি চাঁদের পূর্ণিমাতে সোমনাথ মন্দিরের মূল বেদীতে একজন মুসলমানকে ধরে বলি দেয়া হতো এবং তার রক্ত দিয়ে মূর্তিগুলোর গা ধুইয়ে দেয়া হতো।
সোমনাথ মন্দিরের গোড়াপত্তন কবে কখন কে করেছিল, ইতিহাসে এর কোন সুনির্দিষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে সোমনাথকেন্দ্রিক কিছু পৌরাণিক কাহিনী। যে কাহিনী খুবই অশ্লীল ও সভ্যতা বিবর্জিত।
বলা হয় চন্দ্র নামের এক দেবতা একবার এক ব্রাহ্মণ প্ৰজার কয়েকজন মেয়েকে একসাথে বিয়ে করে। এদের মধ্যে রুহানী নামের মেয়েটি ছিল সবচেয়ে সুন্দরী । চন্দ্রদেবতা রূহানীকেই সব সময় কাছাকাছি রাখতো। আর অন্যদের উপেক্ষা করতো। এই অবস্থা দেখে সেই ব্রাহ্মণ একদিন চন্দ্রদেবতাকে বললো সকল মেয়ের সাথেই সমান আচরণ করতে! কিন্তু চন্দ্র তা শুনলো না। ফলে ব্রাহ্মণ দেবতাকে অভিশাপ দিলো। তাতে চন্দ্রদেবতা কুষ্ঠরোগী হয়ে গেল ।
এক পর্যায়ে ব্রাহ্মণ শর্ত দিলো, সে তার অভিশাপ তুলে নেবে; কিন্তু চন্দ্রদেবতাকে যমীনে মহাদেব এর কোন চিহ্ন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
হিন্দুদের ধর্মীয় বর্ণনা মতে- ব্রাহ্মণের শর্ত মেনে চন্দ্রদেবতা অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য সমুদ্রতীর ঘেষে একটি জায়গায় বিশাল একটি গোলাকার পাথরে শিবলিঙ্গের প্রতি মূর্তি স্থাপন করে এবং সেটিকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল মন্দির গড়ে তোলে। যার নাম দেয়া হয় সোমনাথ। সোম অর্থ চন্দ্র আর নাথ অর্থ প্রভু। এ অর্থে সোমনাথের অর্থ হয় চন্দ্রের প্রভু।
প্রতি চাঁদের পূর্ণিমাতে সাগর কিছুটা উত্তাল হয় এবং সমুদ্র পিষ্ঠ উঁচু হয়ে জোয়ারের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ফলে সমুদ্রের পানিতে ব্যাপক তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়। হিন্দু পুরোহিতরা এটাকে প্রচার করে, চন্দ্রদেবতা তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রতিমাসেই সোমনাথ মন্দিরের পা ধুইয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, একেবারে সমুদ্রতীরে গড়ে উঠার কারণে সবসময়ই জোয়ারের পানিতে সোমনাথের দেয়াল গাত্র প্লাবিত হতো। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকার সোমনাথ মন্দিরের পুরনো ধ্বংসস্তূপের উপর নতুন করে বিশালাকারে মন্দির নির্মাণ করে।
সোমনাথকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের এমন সব পৌরাণিক কাহিনী বর্ণিত আছে যে, এগুলো গ্রন্থিত করলে বিশাল আকারের গ্রন্থ হয়ে যাবে।
বস্তুত সেকালের সোমনাথ মন্দির ছিল স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। সমুদ্র তীর খনন করে অনেক গভীর থেকে মন্দিরের দেয়াল উঠানো হয়েছিল। মন্দিরে ৫৬টি স্তম্ভ ছিল। এগুলো ছিল সেগুন কাঠের। সুদূর আফ্রিকা থেকে জাহাজ বোঝাই করে বিশাল আকারের সেগুন গাছ আনা হয়েছিল। সেগুন গাছের ভেতরে লোহা ।কিয়ে স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল। মন্দিরে শিবের মূর্তিই ছিল প্রধান। এ ছাড়াও ছোট বড় আরো বহু মূর্তি ছিল। সব মূর্তির গায়েই ছিল দামী দামী হীরা ও মণিমুক্তার অলংকার। তাছাড়া সোনা ও রুপার তৈরি মূর্তিও ছিল।
যে কক্ষে মূর্তিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল, সে কক্ষে কোন মশাল, প্রদীপ বা বাতি জ্বালানো হতো না। কিন্তু মূর্তির কক্ষ সব সময় আলোকিত থাকতো। আলোর ব্যবস্থার জন্যে কক্ষের উপরে এমনভাবে হীরা ও মুক্তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল যে, অন্যান্য কক্ষের আলো হীরার মধ্যে পড়লে হীরায় প্রতিবিম্বিত হয়ে মূর্তির দেহ ও ঘর আলোকিত হয়ে যেতো। যেহেতু হীরা ও মুক্তার মধ্যে বিভিন্ন রঙের মিশ্রণ রয়েছে সেহেতু আলোর মধ্যেও বিভিন্ন রঙের প্রতিস্বরণ ঘটতে। তাতে সৃষ্টি হতো একটা অপার্থিব আবহ, যাকে পুরোহিতরা স্বর্গীয় পরিবেশ বলতো। এই মোহনীয় আলোয় মূর্তিগুলোকে জীবন্ত মনে হতো। পূজারীরা এ কারণে আরো বেশি মোগ্রস্ত হয়ে পড়তো। পাথরের মূর্তিগুলোকেই তারা জীবন্ত দেবদেবী বলে বিশ্বাস করতো।
