সুলতানের প্রস্তাবে ইসরাঈল সেলজুকী যা বলেছিল তা অক্ষরে অক্ষরে ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়েছে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক গীবন লিখেছেন–
ইসরাঈল সেলজুকী তার তীরদান থেকে একটি তীর বের করে সুলতানের হাতে দিয়ে বললো, এই তীরটি যদি আপনি উত্তর দিকে ছুঁড়েন তাহলে পঞ্চাশ হাজার তুর্কমানী সেনা আপনার ডাকে সাড়া দেবে। আপনার যদি আরো সৈন্যের প্রয়োজন হয় তাহলে আরেকটি তীর বলকানের দিকে ছুঁড়ে দেবেন তাহলে আরো পঞ্চাশ হাজার অশ্বারোহী আপনার কাছে চলে আসবে।
সুলতান বললেন, তোমার সকল সৈন্যদেরই যদি আমার প্রয়োজন হয় তবে কি করবে?
তাহলে আমার ধনুক আপনি দূতের হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। সে গোটা এলাকায় গিয়ে তা দেখিয়ে ফিরে আসবে। এরপর দেখবেন, দু’লাখ সৈন্য আপনার কাছে চলে আসবে- বললো ইসরাঈল।
ইসরাঈলের ভাবভঙ্গি এবং তার কথাবার্তা শুনে সুলতান মাহমুদ সংশয়ে পড়ে গেলেন। ইসরাঈলের কথার মধ্যে তার সন্দেহ হলো ।
নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ ‘মজমুআতুল আনসার’ এ লেখা হয়েছে- সুলতান ইসরাঈলকে অতিথিদের জন্যে বরাদ্দকৃত তাঁবুতে পাঠিয়ে তার কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তার যথাযথ সম্মানও সেবাযত্ন করতে। ইসরাঈল চলে যাওয়ার পর সুলতান তার সম্পর্কে আরো খোঁজ-খবর নিলেন।
এর মধ্যে কাদের খান সুলতানকে জানালো, সেলজুকীরা সকলের জন্যেই একটা প্রকট সমস্যা হয়ে ওঠেছে। এদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি রক্ষার আশা করা ঠিক নয়।
সুলতানের বিশ্বস্ত ও প্রিয় সেলজুকী সেনাপতি আরসালান জাযেব সুলতানকে বললেন, সেলজুকীদের মধ্যে কোন নীতি নৈতিকতার বালাই নেই। এরা কোন নিয়ম নীতিকেই সম্মান করতে জানে না।
ইসরাঈল সেলজুকীর ভাবভঙ্গি ও কথাবার্তায় সুলতান পূর্বেই সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। তদুপরি অন্যদের সাথে পরামর্শ করার পর ইসরাঈল সেলজুকীর প্রতি আস্থা না রাখার ব্যাপারেই চূড়ান্ত হিসাবে নেয়া হলো। এরপর তিনি নির্দেশ দিলেন- ইসরাঈল সেলজুকীকে গ্রেফতার করে কালাঞ্জর দুর্গের বন্দিশালায় পাঠিয়ে দেয়া হোক।
তখনই ইসরাঈলের হাতে হাতকড়া ও পায়ে জিঞ্জির বেঁধে তাকে কাশ্মীরের পথে রওয়ানা করানো হলো। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন- সাত বছর ইসরাঈল কালাঞ্জর দুর্গের বন্দিশালায় আটক ছিল। একবার সে ফেরার হওয়ার চেষ্টা করে জেলখানা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল, কিন্তু বরফের কারণে বেশি দূর যেতে পারেনি। ধরা পড়ে আবার কয়েদ হয় । সাত বছর জেলখানার ঘানি টেনে ইসরাঈল সেখানেই মৃত্যুবরণ করে।
ইসরাইলকে যখন গ্রেফতার করে হাতে হাতকড়া এবং পায়ে জিঞ্জির বেঁধে কাশ্মীরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তার সাথে আসা তুকমানী সৈন্যরা পাশেই দাঁড়ানো ছিল। তখন সে তুর্কনীদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে নির্দেশ দেয় তোমাদের এখন প্রধান কাজ হলো, গযনীর প্রতিটি ইট ধসিয়ে দেয়া। যাও তোমরা তাই করো।
সুলতান মাহমূদ সেলজুকী নেতাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাদের বসবাসের জন্য তিনি একটা স্বতন্ত্র এলাকা দান করবেন। ইসরাঈল সেলজুকীকে গ্রেফতারের পর তিনি ঘোষণা দিলেন, জিউন ও যরফাশা নদীর মধ্যবর্তী এলাকাটা সেলজুকীদের বসবাসের জন্য বরাদ্দ করা হলো। তিনি তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলন, সকল সেলজুকী গোত্রের লোকদেরকে এখনই এই এলাকায় নিয়ে আসা হোক।
সুলতানের নির্দেশ মতো চার হাজার সেলজুকী পরিবারকে জিউন ও যরাশো নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় নিয়ে আসা হলো।
তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি তুর্কীস্তানী ও তুর্কনীদের আলাদা করে ফেললেন এবং বহু গয়নী সেনা নিয়োগ করলেন। এই প্রথমবার তুকমানী ও তুর্কস্তানীরা সুলতান মাহমুদকে সরাসরি দেখার ও তার কথা শোনার সুযোগ পেলো। সুলতানের লোকেরা তাদের বুঝাতে লাগলো, সুলতান মাহমূদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ কি? তিনি কেমন শাসক? কেমন স্বভাবের মানুষ? সুলতানের লোকেরা তুৰ্কৰ্মানীও তুর্কীদের সাথে উঠাবসার কারণে গযনী বাহিনীর নীতি নৈতিকতা এবং সুলতান সম্পর্কে তাদের মনে ইতিবাচক ধারণা জন্মালো।
এরপর একদিন সুলতান তুর্কমানী ও তুর্কিস্তানী সেলজুকীদের উদ্দেশ্যে বললেন- তোমরা গযনী সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে যাও। সুলতানের এই আহবান সফল হলো। খুশি মনে বহু তুর্কি ও তুর্কমানী গযনী বাহিনীতে ভর্তি হয়ে গেলো। ফলে সুলতানের এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্যই সফল হলো। তিনি এবার অনেকটা নিশ্চিন্তভাবে ভারতের দিকে মনোনিবেশ করার সুযোগ পেলেন।
* * *
হিন্দুস্তানের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত গুজরাট রাজ্য। গুজরাট রাজ্যের একেবারে সমুদ্রতীরে অবস্থিত খাটায়ার শহর। সেখান থেকে সত্তর মাইল দক্ষিণের শহরের নাম সোমনাথ। সোমনাথ হলো একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন মন্দিরের নাম। হিন্দুস্তানের বিখ্যাত ও প্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে সোমনাথ অন্যতম। সুলতান মাহমুদের সময় গুজরাটের গোটা সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় অসংখ্য মুসলমান বসবাস করতো। আজো গুজরাটের আহমদাবাদ এলাকা একটি মুসলিম প্রধান এলাকা।
আহমদাবাদে ১৯৪৭ এর পর থেকে কয়েকবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। এসব দাঙ্গায় হিন্দু সন্ত্রাসীদের হাতে বহু নিরীহ-নিরপরাধ মুসলমানের প্রাণ দিতে হয়েছে। কয়েকটি দাঙ্গায় সেখানকার হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন ও পুলিশের লোকেরা মুসলিম নিধনে হিন্দুদের সহায়তা করেছে বলে বিভিন্ন তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের কোন সরকারই মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে যথার্থ পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
