আজ সেই শহীদানের কবরের উপর মন্দির গড়ে উঠছে এবং পৌত্তলিকতার পূজা চলছে। বিন কাসিমের বিজিত এলাকার মসজিদগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে এবং মুসলমান তরুণীদের সম্ভ্রম নিয়ে হুলিখেলা চলছে। হিন্দুস্তানে ইসলামের বাতি এখন প্রায় নিভতে বসেছে।
বন্ধুগণ! আমি একটি ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াইয়ে নেমেছি। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করেন দেখুন, ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদকে যদি আমরা স্তব্ধ করে না দেই, আমরা যদি পৌত্তলিকতার বিষ বৃক্ষ উপড়ে না ফেলি, তাহলে হিন্দুস্তান মুসলমানদের জন্যে কসাইখানায় পরিণত হবে।
আর সেখানকার মসজিদগুলো নোংরা আস্তাবলে পরিণত হবে। আমি আপনাদের কি বলতে চাচ্ছি, তা বুঝতে আপনাদের মোটেও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আপনারা সবসময় আপনাদের কান, চক্ষুও বিবেককে সত্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অসাড় করে রেখেছেন। আপনাদের বদ্ধ চোখ, কান ও বিবেকের কপাট আমি খুলতে এসেছি।
এখন আপনাদের সামনে আমি দুটি নির্দেশনা পেশ করছি–
১. প্রথমতঃ আপনারা আপনাদের অর্ধেক সৈন্য আমাকে দিয়ে দেবেন। তাদেরকে আমি হিন্দুস্তানে নিয়ে যাবো । আপনারা সবাই একটি চুক্তিতে সই করবেন যে, আমার অবর্তমানে আপনারা গযনী আক্রমণ করবেন না; বরং গযনীর নিষ্ঠাবান প্রহরীর ভূমিকা পালন করবেন।
২. দ্বিতীয়তঃ নয়তো আমি আপনাদের সবাইকে গ্রেফতার করে আপনাদের শাসিত সবগুলো অঞ্চলকে গযনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করে নেবো। আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমার এই শক্তি আছে। ইচ্ছা করলে খুব সহজেই আমার এই কথা আমি বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম।
একথা বলে সুলতান মাহমূদ থেমে গেলেন। তিনি উপস্থিত সবার চেহারার দিকে তাকিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া যাচাই করলেন।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন, আমার উপস্থাপিত এই দুই নির্দেশনা যদি কারো পছন্দ না হয় তিনি হাত তুলে তার আপত্তি জানাতে পারেন।
উপস্থিত কোন শাসকই তাদের হাত উপরে উঠানোর সাহস করলো না। সুলতান উপস্থিত সবাইকে মোরাবকবাদ জানিয়ে বললেন, আগামীকাল আপনাদের সামনে মৈত্রী চুক্তির দলিল পেশ করা হবে, সেখানে সবাইকে মোহরাখিত দস্তখত দিতে হবে।
* * *
পর দিন সকাল বেলায় ফজরের নামাযের পর সুলতান মাহমূদ চুক্তিপত্র লেখার জন্য সরকারী মুহরিরকে নির্দেশ দিলেন। চুক্তিনামা প্রস্তুত হওয়ার পর সুলতান সকল শাসককে তার তাঁবুতে ডাকলেন। এ সময় সুলতানকে জানানো হলো, সমরকন্দ ও বলখের শাসক আলাফতোগীন অনুপস্থিত। তার তাঁবুও খালি। তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তল্লাশী করে জানা গেছে, ভোরের অন্ধকারেই কয়েকজন অশ্বারোহী বুখারার দিকে চলে গেছে।
সুলতানের নির্দেশে কিছুসংখ্যক অশ্বারোহীকে পিছু ধাওয়া করার জন্য পাঠানো হলো। দ্রুতগামী অশ্বারোহীরা পথিমধ্যেই আলাফতোগীনকে পেয়ে গেলো। আলাফতোগীন ছিল নিরাপত্তা প্রহরী বেষ্টিত। সে তার নিরাপত্তারক্ষীদেরকে প্রতিরোধের নির্দেশ দিল।
কিন্তু গযনী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল তার নিরাপত্তা রক্ষীর চেয়ে দ্বিগুণ। গযনীর সৈন্যরা নিরাপত্তারক্ষীদের চরম হুমকী দিলে তারা মোকাবেলার সাহস পেলো না। তারা সবাই আত্মসমর্পন করলো। ফলে সহজেই গ্রেফতার হলো আলাফতোগীন। গযনীর সৈন্যরা তাকে এনে সুলতানের সামনে হাজির করলো।
পলাতক আলাফতোগীনকে দেখে সুলতান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন- আমার আহবান উপেক্ষা করে তুমি পালিয়ে গেলে, কিন্তু আল্লাহর পাকড়াও থেকে কি তুমি নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবে? আমি তো তোমার উপর আমার আনুগত্যের খড়গ চাপাতে আসিনি। আল্লাহর আনুগত্যের পয়গাম নিয়ে এসেছি। তোমার পালিয়ে যাওয়ার কারণ কি?
আমি গযনীর আনুগত্য স্বীকার করি না-জবাব দিলো আলাফতোগীন।
একে শিকলে বেঁধে এখনই হিন্দুস্তানে পাঠিয়ে দাও এবং মুলতানের কয়েদখানায় বন্দি করে রাখো। বাকী জীবনটা ওকে সেখানেই কাটাতে হবে।
বাস্তবেও আলাফতোগীনের বাকী জীবন সুলতানের কয়েদখানার একটি ছোট্ট কক্ষেই কাটাতে হয়েছে।
আলাফতোগীন ছাড়া সকল শাসকই চুক্তিনামায় দস্তখত করে তাদের আনুগত্যের অঙ্গীকার ব্যক্ত করলো।
সুলতান মাহমুদ চুক্তিপত্র সম্পাদনের অনুষ্ঠান সমাপ্ত ঘোষণা করতে যাবেন, ঠিক এই সময় তাকে জানানো হলো- ইসরাঈল সেলজুকীও হাজির হয়েছে।
ইসরাঈল সেলজুকী ইতোমধ্যে দু’বার সুলতানের সাথে টক্কর দিয়ে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এবার সুলতানের নিয়ে আসা সামরিক শক্তি দেখে সে বুঝতে পেরেছিল তার পক্ষে এদের মোকাবেলায় টিকে থাকা অসম্ভব। মূলত সে আনুগত্য প্রকাশ করতেই এসেছিল। অবশ্য সে সময়কার ঐতিহাসিক প্রামাণ্যগ্রন্থ তাবকাতে নাসেরীতে লেখা হয়েছে
তুকমানী সেলজুকীদের নিয়ে গঠিত একটি সেনা ইউনিটের আগে আগে আসছিল ইসরাঈল সেলজুকী। সে মাথার টুপিটাকে বাঁকা করে রেখেছিল। এটা ছিল তার বীরত্ব ও শক্তির পরিচায়ক। সে তার ঘাড়টা উঁচিয়ে রেখেছিল, তাতে বুঝানো হচ্ছিল সে কাউকে পরোয়া করে না।
ইসরাঈল সেলজুকী যখন সুলতান মাহমুদের সাথে সাক্ষাত করলো, তখন ইসরাঈল সেলজুকীকেও তিনি সেই কথাই বললেন, যা অন্য শাসকদের বলেছিলেন। তাদের পরস্পর কথাবার্তার পর ইসরাঈল সেলজুকী সুলতানের আনুগত্যের ঘোষণা দিল। সুলতান যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আমাকে কতোজন সৈনিক দিতে পারবে?
