করে আপনি আপনার সৈন্যদেরকে গণহত্যার শিকার করবেন না।
কাদের খান একটা কাপুরুষ। তোমাদের সুলতানের মোকাবেলা হবে একজন দুঃসাহসী বীরপুরুষ বাদশার সাথে বললো আলাফতোগীনের স্ত্রী।
সম্মানিত রানী। লড়াই কোন নারীর কাজ নয়। আমি বলখের শাসকের সাথে কথা বলতে এসেছি, আপনার সাথে নয়। বলখের শাসককে পরিষ্কার ভাষায় বলতে হবে তিনি সুলতানের দাওয়াত কবুল করবেন কি-না। দৃঢ়কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো দূত।
আমি যাববা! তবে এ ব্যাপারটি এখনই আমি বলে দিতে পারবো না, গযনীর আনুগত্য আমি গ্রহণ করবো কি-না?
অবশেষে আলাফতোগীনও সুলতান মাহমূদের দাওয়াতে হাজির হলেন। কিন্তু তার রানী তার সাথে আসেননি। আলাফতোগীন সাথে করে কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে এলেন।
আপ্যায়, শেষে সুলতান মাহমূদ সকল সামন্ত শাসকদের একত্রিত করলেন। সুলতান শাসকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেয়ার সময় তার পাশে রাখলেন প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ ও অন্যতম সেনাপতি আরসালান জাযেবকে। আরসালান জাযেব ছিলেন খাওয়ারিজমের গভর্নর। আরসালান ছিলেন শত্রুদের ব্যাপারে অত্যন্ত আপসহীন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে দারুন পারদর্শী। তিনি মনে করতেন, শত্রুদের উপর দয়া করা নিজেকে বিপদে ফেলা ও পরাজয়ের পথ প্রশস্ত করার নামান্তর।
ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর ও ইবনুল জওযীর ভাষ্যমতে, সেদিন সামন্ত শাসকদের উদ্দেশে সুলতান বললেন-বন্ধুগণ! আপনারা আমার সমরশক্তি প্রত্যক্ষ করেছেন। আমি এখান তেরো’শ জঙ্গি হাতি নিয়ে এসেছি। আরো বারো’শ জঙ্গি হাতি গফনীতে রয়ে গেছে। এখানে যে পরিমাণ অশ্বারোহী সৈন্য এসেছে এর চেয়ে ঢের বেশি গযনী সালতানাতের বিভিন্ন জায়গায় নিয়েজিত রয়েছে।
আপনারা দেখেছেন, আমি একজন পদাতিক সেনাকেও সাথে আনিনি। এসব সৈন্য কি আপনাদের নিরস্ত্র করতে সক্ষম নয়? কিন্তু আমি আপনাদেরকে সামরিক শক্তির ভয় দেখাতে আসিনি। আল্লাহর ভয় স্মরণ করিয়ে দিতে এসেছি। আমি আল্লাহর পথে জীবনের শুরু থেকেই জিহাদে লিপ্ত রয়েছি। এজন্য তিনি আমাকে এই বিপুল সৈন্যবল দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। এই বিপুল শক্তি অর্জনে আমার ব্যক্তিগত কোন কৃতিত্ব নেই। এসবই একমাত্র আল্লাহর দান।
আমি জানি, আপনারা আমাকে হিন্দুস্তানের লুটেরা এবং ধনসম্পদ ও অর্থ লোভী বলে গালিগালাজ করেন। সত্যিকার অর্থে যদি আমি ধনসম্পদের পূজারী হতাম, তাহলে যে পরিমাণ ধনসম্পদ আমার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সঞ্চিত আছে, এগুলো দিয়ে শুধু আমি কেন আমার ভবিষ্যত তিন পুরুষ আরাম আয়েশে জীবন-যাপন করতে পারতো।
আপনারা জানেন, আমি আপনাদের মতো বিলাসী জীবন-যাপন করি না। আমার গোটা জীবনটাই যুদ্ধে যুদ্ধে রণাঙ্গনে কেটেছে। আমি আরামের বিছানায় শুয়ে শুয়ে মরতে চাই না। আমি চাই আমার মৃত্যু হোক রণাঙ্গনে। আর হিন্দুস্তানের মাটিতে আমার দেহ মিশে যাক।…
এখানে উপস্থিত আপনারা সবাই আমার ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু আমার বিরোধিতা করলেও আপনারা কিন্তু কখনো সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে পারেননি। কারণ আপনারা সবাই ক্ষমতার পূজারী। আপনারা কি বলতে পারবেন, খুব আরাম ও সুখের জীবন পেয়েছেন আপনারা? আপনারা দেশের সাধারণ মানুষকে গোলামে পরিণত করেছেন। এজন্য সবসময় গণ-বিদ্রোহের আতংকে থাকেন আপনারা।
বুখারা ও সমরকন্দের শাসক আলাফতোগীন আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন। আমি জানতে পেরেছি, তিনি সাধারণ মানুষকে খুব অত্যাচার- উৎপীড়ন করেন। কোন একজন নাগরিকও তার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। আমি জানি, শাসন ক্ষমতা মানুষের মনে দারুন সুখানুভূতি ও নেশার সৃষ্টি করে। আপনাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছেন যারা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে ধোঁকা দিয়ে প্রজাদের শাসন করছেন। এমন শাসকরা নাগরিকদের সামনে নিজেকে ইসলামের প্রহরী বলে সাব্যস্ত করেন বটে; কিন্তু তারা বুঝতে চান না, তাদের চেয়ে বড় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তাআলা। তিনি ইচ্ছা করলে যেকোন সময় যে কারো ক্ষমতার মসনদ উল্টে দিতে পারেন।
জনসাধারণের উপর যুলুম করা, তাদেরকে সম্মান না করা এবং দেশের সাধারণ নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করা, ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছাড়ানো কঠিন গোনাহর কাজ। আল্লাহ তাআলা এমন গোনাহ ক্ষমা করেন না। আপনাদের অপরাধের কারণেই হয়তো আজ আল্লাহ আপনাদের উপর আমাকে চাপিয়ে দিয়েছেন।
আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আপনাদের বলে দিচ্ছি, আমি আপনাদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে গোলাম বানাতে আসিনি। আমি আপনাদের রাজ্য দখল করতে আসিনি। আমি আপনাদের বলতে এসেছি, এই যমীনের মালিক আল্লাহ! এই যমীনের উপর শাসক হিসাবে বসবাস করার আপনাদের যেমন অধিকার রয়েছে, একজন নগণ্য-নাগরিকেরও ততটুকুই অধিকার রয়েছে।
আমি আপনাদেরকে ইসলামের পতাকাতলে একত্রিত করতে এসেছি। আমি আপনাদের কাউকেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার সাথে রণাঙ্গনে নিয়ে যেতে চাই না। রণাঙ্গনের ব্যাপারটি আমি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছি। আমি হিন্দুস্তানকে ইসলামী সালতানাতে পরিণত করতে চাই। কারণ, হিন্দুস্তান একসময় ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। হিন্দুস্তান তো সেইসব মুসলমানদের অর্জিত ভূমি যেসব মুজাহিদ মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাথে নিজেদের জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে বিক্ষুব্ধ সাগর পারি দিয়ে হিন্দুস্তানে এসেছিলেন এবং এখানেই তারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
