তোমরা যাই বলল, আমি কিন্তু এটাকে অন্যরকম নির্দশন মনে করছি। আমি অনুভব করছি, আমাকে আমার রুহ’ বলে দিচ্ছে, তোমার যা কিছু করণীয় তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে। হিন্দুস্তানের মূর্তিগুলো আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেয় না। আমার ভয় হয়, কর্তব্য কাজ সম্পন্ন করার আগেই না আবার আমার দুনিয়া থেকে চলে যেতে হয়।
এই মুহূর্তে আমার বিপুল সমরশক্তির দরকার। অথচ মুসলিম শক্তিগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন। যেসব সরদার, নেতা ও শাসকরা আমার অবর্তমানে গযনীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে তাদের সবাইকে আমার একত্রিত করতে হবে। আমার আশংকা হচ্ছে, আমার জীবন আর বেশি দিন নেই, আমি হয়তো কর্তব্যকর্মগুলো সমাপ্ত করে যেতে পারবো না।
প্রধান সেনাপতি নানা কথায় সুলতানের আবেগকে প্রশমিত করে তাকে আশপাশের বৈরী মুসলিম শক্তিগুলোকে বাগে আনার কিংবা তাদের শক্তি নিঃশেষ করে দেয়ার কৌশল নিয়ে বাস্তবসম্মত উপায় নিয়ে কথা শুরু করলেন। অবশেষে তারা উভয়েই একমত হলেন, তারা তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিবেশী বৈরী শক্তিগুলোকে আনুগত্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য করবেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে আশংকাজনক অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল ইসরাঈল সেলজুকী।
* * *
১০২৪ সালের প্রথম দিকে সুলতান মাহমূদ এমন বিশাল সেনাদল দিয়ে বলখের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন যে, সেনাদের পায়ের চাপে ঘমীন প্রকম্পিত হচ্ছিল। এই সেনাদলের মধ্যে একজন সৈন্যও পদাতিক ছিলো না। সবাই ছিলো অশ্বারোহী। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে- সেই সৈন্যদের মধ্যে চুয়ান্ন হাজার ছিল অশ্বারোহী, তাছাড়া তাদের সাথে তেরশ জঙ্গী হাতি ছিল। হাতির উপরে তীর বল্লমে সজ্জিত ছিল আরো প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্য।
সকল সৈন্য অত্যন্ত খোশমেজাজে ধীরস্থিরভ সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হচ্ছিল। সুসজ্জিত এই সেনাবহর দেখতে অত্যন্ত সুশীল ও সুন্দর হলেও শত্রুদের জন্যে তারা সৃষ্টি করেছিল মরণ আতংক। এই সৈন্যদল ছাড়াও সুলতান মাহমুদের আরো হাজার হাজার সেনা গযনী এবং হিন্দুস্তানের সীমান্ত ও বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন ছিল।
সেনাদের অগ্রভাগে ছিল সুলতানের সংবাদ বাহক দল। প্রতিটি ছোট্ট ছোট্ট রাজ্যে পৌঁছে অগ্রবর্তী দলের সংবাদবাহীরা শাসকদের কাছে গিয়ে বলতো–
গযনীর সুলতান চুয়ান্ন হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ও তেরোশ জঙ্গি হাতি নিয়ে আসছেন। আপনি যদি আল্লাহর নামে কাফেরদের বিরুদ্ধে সুলতানের অভিযানে শরীক হওয়ার জন্যে সুলতানের সাথে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার আনুগত্য করতে সম্মত হন তাহলে আপনার ক্ষমতা ও রাজত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। নয়তো আপনি গযনী সেনাদের সঙ্গে যেমন আচরণ করবেন সেরকমই আচরণ করা হবে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বিশাল সেনাবহর ও সমরশক্তি দেখে গযনীর প্রতিবেশী এবং শত্রুতা পোষণকারী সকল শাসক ও ছোট ছোট রাজত্বের অধিকারী আমীর উমারা দামী দামী উপহার উপঢৌকন নিয়ে আগেভাগেই সুলতানের সামনে হাজির হয়ে তার আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে নিচ্ছিল এবং তাদের রাজ্যে সুলতানকে স্বাগত জানাচ্ছিল। সুলতান তাদের উপহার গ্রহণ করে এবং তাদের সঙ্গে মৈত্রীত্বের ঘোষণা করে বলতেন, আপনাদের সবাইকে জিহোন নদীর তীরবর্তী কোন জায়গায় দাওয়াত দেয়া হবে। সেখানে আপনাদেরকে উপস্থিত থাকতে হবে। সেখানে আপনাদের সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা হবে এবং আপনাদের সম্মানজনক আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
এক পর্যায়ে সুলতান জিহোন নদী পার হয়ে গেলেন। খুতুন নামের একটি রাজ্যের শাসক ছিলেন কাদের খান। তিনি ছিলেন সুলতান মাহমূদের ঘোর তর শত্রু। তাঁর কাছে যখন সুলতানের সমর শক্তির বর্ণনা দিয়ে সংবাদবাহীরা সুলতানের আনুগত্যের দাওয়াত দিল, তখন কাদের খান কোনরূপ কথাবার্তা না বলে অনেকগুলো উট বোঝাই করে দামী দামী উপহার নিয়ে সুলতানের কাছে হাজির হয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন।
সুলতান জিহোন নদীর তীরবর্তী একটি জায়গায় সেনাদের যাত্রা বিরতি দিয়ে তাঁবু ফেলার নির্দেশ দিলেন এবং সেই অঞ্চলের সকল আমীর ও শাসকদের দাওয়াত করলেন। সেসব অঞ্চলের মধ্যে সুলতান সবচেয়ে বেশি বৈরী মনে করেছিলেন বলখের শাসক আলাফতোগীন ও সেলজুকী নেতা ইসরাঈল সেলজুকীকে। এরা সম্মিলিতভাবে সুলতানের বিরুদ্ধে একবার যুদ্ধ করেছিল এবং শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়েছিল।
সুলতান মাহমূদ এদের কাছেও তার দূত পাঠিয়ে দাওয়াত দিলেন।
সুলতানের দূতেরা যখন আলাফতোগীনের কাছে তার পায়গাম পৌঁছাল, তখন আলাফতোগীন চরম অবজ্ঞা ভরে সুলতানের পয়গাম শুনলো। তার পাশে বসাছিল তার সুী স্ত্রী ।
তোমার সুলতান কি তার দাওয়াত কবুল করার জন্যে আমাদের প্রতি অনুরোধ করেছে? দূতের উদ্দেশে বললো আলাফতোগীনের স্ত্রী।
সম্মানিত রানী! গযনীর সুলতান শুধু বলখ ও সমরকন্দের শাসককে তার মজলিসে দাওয়াত করেছেন। তিনি আপনার কথা উল্লেখ করেননি- বললো দূত।
তোমাদের সুলতানের এই দাওয়াতের উদ্দেশ্য কি? জানতে চাইলেন আলাফতোগীন।
দূত বললো, সুলতান চুয়ান্ন হাজার অশ্বারোহী ও তেরো’শ জঙ্গি হাতি নিয়ে এসেছেন। তার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য বোঝা মোটেও কঠিন নয়। আপনার প্রিয় বন্ধু কাদের খান ইতোমধ্যে সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে তার রাজ্যে সুলতানকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। আমি আশা করবো, সুলতানের দাওয়াত গ্রহণ না
