গয়নী বাহিনীতে তাতারী বা তুর্কী ইউনিট বলে একটি বিশেষ সেনা ইউনিট ছিল। এরা ছিল অত্যন্ত সাহসী, দৈহিক গঠনে বিশাল এবং লড়াক। সুলতান তাতারী ও তুর্কী সৈন্যদের আহ্বান জানালেন, কারা আছে যে, এই হাতিগুলোকে কজা করতে পার?
হাতিগুলোকে মদ খাইয়ে মাতাল করে দুর্গের বাইরে এনে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। মাতাল হাতিগুলো বাঁধনমুক্ত হয়ে গযনী বাহিনীর উপর কেয়ামত বয়ে আনলো। তাঁবু, রসদসহ সবকিছু তছনছ করতে শুরু করলো।
সৈন্যদের মধ্যেও দেখা দিল আতঙ্ক। এ অবস্থায় তাতারী বা তুর্কী ইউনিটের যযাদ্ধারা তাকবীর দিয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে হাতি নিয়ন্ত্রণে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং বহু কষ্টে সব কটা হাতিকেই তারা কজা করতে সমর্থ হলো। অবশ্য সুতলতান তাদেরকে নিদের্শ দিয়েছিলেন, তীর-বল্লম, তরবারী যেভাবে পারো এগুলোর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে সেনা শিবির হেফাযত করো। কিন্তু অসীম সাহসী যোদ্ধারা মাতাল হাতিগুলোর একটিকেও হত্যা না করে কাবু করতে সক্ষম হল। দুর্গ প্রাচীরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে কালাঞ্জরের হিন্দু অধিবাসীরা গয়নী সেনাদের সাহসিকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চিৎকার করতে থাকে- বলতে থাকে সাবাশ গযনীর যোদ্ধারা! সত্যিই তোমরা অজেয়, তোমরা সাহসী, তোমরা বীরের জাতি। আমরা তোমাদের প্রণাম করি। নমস্কার জানাই।
মহারাজা গোবিন্দের আত্মসমর্পণের পর সুলতান মাহমূদ গযনী বাহিনীকে লাহোরে নিয়ে গেলেন। সুলতানের লাহোর আগমনের খবর পেয়ে লাহোরের বর্তমান রাজা তরলোচনপাল লাহোর ছেড়ে আজমীর চলে গেল। সুলতান মাহমুদ পুনর্বার লাহোরে প্রবেশ করে লাহোরকে গযনী সালতানাতের অঙ্গ ঘোষণা করলেন এবং তার অত্যন্ত প্রিয় গোলাম ও সঙ্গী আয়াযকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করলেন। আয়ায ছিলেন সুলতান মাহমূদের একান্ত ভৃত্য। ভৃত্য হলেও সুলতান তাকে বন্ধুর মতোই সম্মান ও মর্যাদা দিতেন। অস্বাভাবিক মেধা, বুদ্ধি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার অধিকারী আয়াযের নাম সুলতান মাহমূদের সাথে সাথেই উচ্চারিত হয়।
লাহোরে বিপুল সংখ্যক সেনা রেখে সুলতান মাহমূদ ১০২৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ এপ্রিলের দিকে গযনী ফিরে এলেন। এদিকে গযনীর বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর শক্তি নিয়ে অপেক্ষা করছিল ইসরাঈল সেলজুকী।
৫.৪ সোমনাথের ফটকে
লাহোরকে গযনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করে সেখানে আয়াযকে গভর্নর নিযুক্ত করে সুলতান মাহমূদ যখন গযনী ফিরে এলেন তখন তাকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। বিনা যুদ্ধে তেমন কোন সংঘর্ষ ছাড়াই বিশাল শক্তির অধিকারী তিনটি রাজ্যকে জয় করে গযনী ফিরে এলেও সুলতানের মধ্যে অন্যান্য বারের মতো বিজয়ের উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছিল না। তিনি কোন যেন বিমর্ষ চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। তাকে দেখে বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল।
এই অবস্থা দেখে সুলতানের ডান হাত বলে খ্যাত ইতিহাস বিখ্যাত সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সুলতান! এবার হিন্দুস্তান থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আপনাকে কেমন যেন পেরেশান বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ কি?
সেনাপতির জিজ্ঞাসার জবাবে একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে সুলতান বললেন, বয়সতো আমার তেমন একটা হয় নি। কিন্তু কিছু দিন থেকেই অনুভব করছি শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে, ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে শরীর। সামান্য পরিশ্রমেই ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে।
সুলতানের বয়স তখন পঞ্চান্ন বছর। এটাকে তিনি মোটেও বেশি মনে করছিলেন না।
প্রধান সেনাপতি তখনই চিকিৎসককে ডেকে পাঠালেন। চিকিৎসক এসে সুলতানের স্নায়ু পরীক্ষা করলেন। শরীরের অবস্থা সম্পর্কে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলেন। হৃদযন্ত্রের কম্পন পরিমাপ করে বললেন, সুলতানের এখন দীর্ঘ বিশ্রামের দরকার। তার স্নায়ু খুব দুর্বল। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। সুলতান যদি পূর্ণ বিশ্রাম না নেন, তাহলে সামান্য অসুখও তার জন্যে জীবনহানির কারণ হতে পারে।
আমি আরাম আয়াসের মধ্যে মরতে চাই না- বললেন সুলতান। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর সাথে আমি সাক্ষাত করতে চাই না। আমি নিজেকে বিলাসিতায় ডুবিয়ে দিতে পারি না। শরীরতো মাটির সাথে মিশে যাবে। দেহের শক্তি কমে গেলেও আমি আত্মার শক্তিতে আমার উপর আল্লাহর দেয়া কর্তব্য পালন করে যাবো। শায়খুল আসফান্দ! আপনি বলুন! আমার হৃদযন্ত্র ঠিক আছে তো?
হৃদযন্ত্র অবশ্য ঠিকই আছে- জবাব দিলেন চিকিৎসক শায়খুল আসফান্দ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আপনার শরীর কোন ধরনের অভিযান, অবরোধ ও যুদ্ধের জন্যে মোটেও উপযোগী নয়। মূলত আপনি এখন যা করছেন এর সবই সম্ভব হচ্ছে আপনার আত্মবলে।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন আপনি। বললেন সুলতান মাহমুদ। আমার পীর ও মুর্শিদ শায়খ আবুল হাসান কিরখানী এটাকেই ঈমানী শক্তি বলে অভিহিত করতেন। শরীর মানুষের অনুভূতি অনুযায়ী দুর্বল হয়। দুর্বলতা এবং ব্যথা অনুভূতির দু’রকম বহি:প্রকাশ মাত্র। আপনি কোন ব্যথাকে যতটুকু তীব্র মনে করবেন, ব্যথাটা ঠিক ততটুকুই তীব্র হবে। হেকিম সাহেব! আপনাকে আমার ডেকে আনতে ইচ্ছে করছিল না কিন্তু আবু আব্দুল্লাহ ভয় পেয়ে আপনাকে ডেকে এনেছে।
সম্মানিত সুলতান! আপনি শারীরিক দুর্বলতার কথা বলেছিলেন, এজন্যই আমি হেকিম সাহেবকে ডেকে এনেছি- বললেন আবু আব্দুল্লাহ। শারীরিক দুর্বলতা ভালো লক্ষণ নয়।
