দূত এসে সুলতানের কাছে জানতে চাইলো, আপনি কি চান এবং আপনার আক্রমণের উদ্দেশ্য কি?
সুলতান বললেন, আমি মুসলমান। আমি আপনাদের আহ্বান করছি মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমরা যে একক সত্তা আল্লাহর ইবাদত করি আপনারাও তার ইবাদত করুন। আপনারা আমাদের মতো ইবাদত করুন এবং গরুকে পূজা না করে গরুকে একটি ভক্ষণযোগ্য পশু মনে করে এর গোশত আহার করুন।
দূত বললো, আমাদের পক্ষে গরুর গোশত খাওয়া সম্ভব নয়। তবে আপনি আপনার কোন পণ্ডিতকে দুর্গে পাঠান, যিনি আপনাদের ধর্মের ব্যাপারটি আমাদের কাছে উপস্থাপন করবেন যদি আপনাদের ধর্ম আমাদের ধর্ম থেকে আরো উত্তম হয়, তাহলে আমরা তা মেনে নেবো।
সুলতান সেনাবাহিনীর একজন ইমামকে একজন দুভাষীসহ দুর্গে পাঠিয়ে দিলেন। ইমাম রাজা অর্জুনের সাথে কথা বলে বিকেলে ফিরে এসে জানালেন, রাজা বলেছেন, আপনাদের ধর্ম মেনে নিতে পারবো না, তবে আমরা আপনাদেরকে তিনশ হাতি এবং বিশ মণ রুপা উপঢৌকন দিচ্ছি। এর বিপরীতে আপনারা অবরোধ তুলে নিন।
সুলতান মাহমূদ একথা শুনে পুনরায় রাজা অর্জুনের কাছে বার্তা পাঠালেন, আপনার প্রস্তাব আমরা মানতে রাজি। তবে আমাদের পোষাক পরিধান করে, আমাদের দেয়া তরবারী কোমরে ঝুলিয়ে আপনার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের উধ্বাংশ কেটে আমাদের কাছে অর্পণ করতে হবে। কারণ এটি আপনাদের রীতি। এটা করলেই আমরা মনে করবো আপনি পরাজয় মেনে নিয়েছেন। আমরা নিশ্চিত হতে চাই আপনি এরপর আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করবেন না।
ইতিহাসে পরিষ্কার লেখা আছে, এই সংবাদ নিয়ে যখন সুলতানের দূত রাজা অর্জুনের কাছে গেল, তখন অর্জুন একটি রূপার কুরসীতে সমাসীন ছিলেন। দূত বর্ণনা করল, আমি দেখলাম সুদর্শন একটি যুবককে রুপার কুরসীতে সমাসীন। আমি তাকে বললাম, আপনার জন্যে আমি পোষাক নিয়ে এসেছি তা পরিধান করে আঙুল কেটে দিতে হবে।
তিনি বললেন, আপনি গিয়ে বলুন এই কাপড় পরেই আঙুল কাটা হয়েছে।
আমি দুঃখিত। আমি সুলতানকে প্রতারিত করতে পারবো না। আমাদের পোষাকই পরতে হবে।
রাজা অর্জুন অনিচ্ছা সত্ত্বেও পোষাক পরে নিলেন এবং কোমরে গযনী বাহিনীর দেয়া তরবারী ঝুলিয়ে নিলেন। আমি তার এই করুণ অবস্থা দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। তখন আর তাকে আঙুল কাটার কথা বলতে পারলাম না। তিনি নিজেই একজনকে ডেকে বললেন, ছুরি নিয়ে এসো। ছুরি আনা হলে তিনি খুবই স্বাভাবিকভাবে ছুরিটি হাতে নিয়ে নিজের হাতেই বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের অগ্রভাগ এক ঝটকায় কেটে ফেললেন এবং একটি কাপড়ে মুড়িয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সেই সাথে তার কর্তিত আঙুলে ওষুধ মাখা পট্টি বেধে নিলেন। এ সময় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হলেও তার চেহারা ছিল সম্পূর্ণ ভাবান্তরহীন।
তিনি হিন্দুস্তানের রীতি অনুযায়ী আমাকে দামী কাপড়, রৌপ্য ও দুটি ঘোড়া উপহার দিতে বললেন।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুল জওযী অনুরূপ ঘটনা লিখে আরো যোগ করেছেন, সুলতান মাহমুদের কাছে এমন কনিষ্ঠ আঙুলের বহু অংশ সংরক্ষিত ছিলো। কারণ হিন্দুস্তানের বহু রাজা মহারাজা তার কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে অবশেষে তাদেরই রীতি অনুযায়ী বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুল কেটে দিয়েছিলেন।
* * *
সুলতান মাহমূদ গোয়ালিয়রের রাজা অর্জুনকে তার বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করলেন এবং আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়ে কালাঞ্জরের দিকে রওয়ানা হলেন। কালাঞ্জর দুর্গের আয়তন ছিল বিশাল। বলা হয়ে থাকে প্রায় লাখ খানেক লোক, বিশ হাজার গবাদি পশু এবং পাঁচশ হাতি সেখানে থাকতো। সুলতান মাহমুদের কাছে এই বিশাল এলাকাকে আক্ষরিক অর্থে অবরোধ করার মতো বিপুল সংখ্যক সৈন্যের অভাব থাকায় তিনি দুর্গে প্রবেশের সবগুলো প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিয়ে কার্যত দুর্গবাসীকে অবরুদ্ধ করলেন। আসলে কালাঞ্জরের দুর্গকে সাধারণ দুর্গ না বলে মজবুত প্রাচীর ঘেরা একটি মহানগর বলাই সঙ্গত।
সুলতান মাহমূদ অবরোধ আরোপ করার পর মহারাজা গোবিন্দের কাছে পয়গাম পাঠালেন। পয়গামবাহী গযনী বাহিনীর বিশেষ ধরনের পোষাকে সজ্জিত হয়ে প্রধান ফটকের কাছে গিয়ে উচ্চ আওয়াজে রাজার উদ্দেশে বললো, ‘গযনীর সুলতানের পক্ষ থেকে কালাঞ্জরের রাজা গোবিন্দকে হুশিয়ার করা হচ্ছে। গযনী বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করলে কাউকে জীবিত রাখবে না। নিজ প্রজাদের গণহত্যা না করিয়ে রাজা ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন নয়তো আমাদের শর্ত মেনে নিয়ে পরাজয় স্বীকার করে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও কর আদায় করে আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারেন।’
কয়েক দিন এভাবেই চলে গেল। রাজা গোবিন্দ বশ্যতা স্বীকার করে নিতে চাচ্ছিলেন না কিন্তু গযনীর সৈন্যরা যখন আক্রমণ শুরু করলো, তখন কয়েকদিনের মধ্যে তার মনোবল ভেঙে গেল। দুর্গের হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির জন্ম দিল। ফলে ইসলাম গ্রহণে সম্মত না হয়ে রাজা গোবিন্দ মৈত্রী চুক্তির জন্য পয়গাম পাঠালেন এবং ক্ষতিপূরণ ও বার্ষিক চাঁদা দেয়ার অঙ্গীকার করে একটি আপোস চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। বশ্যতা স্বীকারের প্রমাণস্বরূপ রাজা গোবিন্দও আঙুলের অগ্রভাগ কেটে সুলতানের কাছে পাঠালেন।
কিন্তু গোবিন্দ গযনী সুলতানের সাথে একটি নির্মম রসিকতাও করলেন। তিনি তিনশ হাতি উপহার হিসেবে দেয়ার কথা বলে সেগুলোকে দুর্গের বাইরে মাহুত ছাড়াই ছেড়ে দিয়ে সুলতানের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনার সৈন্যরা যদি সত্যিকার অর্থে সাহসী হয়ে থাকে তাহলে এগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে বলুন। সুলতান এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন।
