মহারাজা গোবিন্দ রণাঙ্গন থেকে মারাত্মক এক আতংক নিয়ে ফিরে এলেন। কিন্তু এই ভয়ের কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তুমি যেহেতু হিন্দুস্তানে থাক, তাই তুমি হয়তো জানো, আমাদের সাধু সন্ন্যাসী ও যোগী ঠাকুররা এমন কিছু বিষয় জানে, তারা ইচ্ছা করলে যে কারো মাথা খারাপ করে দিতে পারে।
কিছু কিছু যোগী হিমালয়ের শৃঙ্গে চলে যায়। সেখানকার বরফ কখনো গলে । সেখানে তারা উলঙ্গ অবস্থায় থেকে সাধনা করে। এরা এমন শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয় যে, দূরে থেকেও তারা যে কারো উপর যাদুর খেলা চালাতে পারে।
আসলে মহারাজা গোবিন্দ এতোটা হীনবল ছিলেন না যে, তিনি তিনগুণ সৈন্য থাকার পরও গযনী বাহিনীর মোকাবেলা না করেই রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসবেন। কিন্তু তারপরও যখন মহারাজা পালিয়ে গেলেন, তখন কালাঞ্জরে এতোটাই আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল যে, লোকজন বাড়ীঘর ছেড়ে শহর থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। তখন বাতাসে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, মানুষ খেকো গযনীর সেনারা এ দিকে ধেয়ে আসছে।
এ অবস্থায় এক যোগী বললো, মহারাজাকে কেউ যাদু করেছে। সে যাদুর প্রভাব মুক্ত করার কাজে লেগে গেল। তিনটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বলি দিয়ে সেই রক্ত পানির সাথে মিশিয়ে মহারাজাকে গোসল করানো হলো।
এক পর্যায়ে যাদুর প্রভাব কেটে গেল। মহারাজা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেল। জানা গেল, রাজারই এক রাণী তার ছেলেকে রাজার স্থলাভিষিক্ত করার জন্যে এই যাদু করিয়েছিল। কারণ রাজা সেই রাণীর পুত্রকে তার স্থলাভিষিক্ত না করে অন্য রাণীর পুত্রকে স্থলাভিষিক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে রাণী প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে রাজার উপর যাদু চালায়।
রাণীর যাদুর ব্যাপারটি জানতে পেরে রাজা গোবিন্দ অভিযুক্ত রাণীও তার ছেলের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। রাণী মৃত্যুদণ্ডের কথা শুনে রাজার কাছে আবেদন করে, অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তাকে মৃত্যু দণ্ড দিলেও তার নিরপরাধ পুত্রকে যেন রাজা ক্ষমা করে দেন। রাজা শর্ত দিলেন, যে যোগী এই যাদু করেছে তার পরিচয় বললে তোমার আবেদন মঞ্জুর করা হবে। রাণী বললো, যে সন্ন্যাসী এখন আপনাকে সুস্থ করেছে সেই সন্ন্যাসীই যাদু করেছিল। বিষয়টি জানার পর রাজা তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। রাজা এই রাণীর সাথে তার পুত্রকেও হত্যা করে এবং সেই যোগী সন্ন্যাসীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এর পর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাজাকে বললো- আপনার আশু বিপদ মুক্তির জন্য একটি কুমারী তরুণীকে বলিদান করতে হবে। তারা তরুণীর গুণাবলী বললো, এবং আমার ছোট মেয়েকে নির্বাচন করলো।
অবশ্য আমি আমার মেয়েকে নির্বাচন করার কারণ বুঝতে পেরেছিলাম। পণ্ডিতেরা একবার আমার বড় মেয়েকেও বলি দেয়ার প্রস্তাব করেছিলো। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।
তুমি মুসলিম। তোমরা তো বুঝবে না দেবতাদের অসন্তুষ্ট করলে আমাদের সবকিছুই বরবাদ হয়ে যায়। পণ্ডিতেরা যদি কোন কারণে ক্ষুব্ধ হয় তাহলে আমাদের মাথার উপর আসমান ভেঙে পড়ে। কারণ পুরোহিত আর পণ্ডিতদের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি আর চাওয়া পাওয়াই আমাদের ধর্মের মূলভিত্তি।
মাননীয় সুলতান! এরপর লোকটি আমাকে জানালো, মাথা ঠিক হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে রাজা গোবিন্দ সকল সৈন্যদের একত্রিত করে তাদের বলল, আমার উপর এক যোগী যাদু করেছিল। যাদুর প্রভাবে আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না। আমরা রণাঙ্গণ ছেড়ে আসায় মুসলমানরা হয়তো আনন্দে আত্মহারা যে, তারা বিনা যুদ্ধে বিশাল এক জয় পেয়ে গেছে। এবার আমি নতুন করে গয়নী বাহিনীকে যুদ্ধের আহ্বান করবো। দেখবে? বিজয়ের নেশায় এবার তারা পঙ্গপালের মতো উড়ে আসবে। আর তোমরা ওদের ধরে ধরে বলি দেবে। তোমাদের ঘোড়া ও গরুর গাড়ী ও ঠেলাগাড়ির সামনে দলে দলে ওদের জুড়ে দেবে। ওরা তোমাদের গাড়িগুলোকে গলির মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে যাবে। হরি হরিদেব আমাকে ইশারা দিয়েছেন, এবার গয়নীর মুসলমানরা এখানে ধ্বংস হতেই আসবে।
রাজা গোবিন্দ অসুস্থতা থেকে ওঠে এমন জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিল যে, তার সেনাদের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ উন্মাদনা দেখা দিল। শুধু সৈন্যরাই নয় সাধারন জনতাও সৈন্যদের সাথে এসে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো।
এরপর রাজা গোবিন্দ গোয়ালিয়রে রাজা অর্জুনের কাছে চলে গেল। কয়েক দিন সেখানে কাটিয়ে এসে বলল, গোয়ালিয়রের সৈন্যদের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছেন তিনি। গোয়ালিয়র থেকে ফিরে সে লাহোর গেলেন। কিন্তু মহারাজা তরলোচনপাল তাকে হতাশ করল। তরলোচন তাকে সামরিক সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানালো। তবে তাকে বহু সংখ্যক সৈন্য যুদ্ধ সরঞ্জাম, অর্থ সম্পদ দিয়ে বিদায় করল। সেই সাথে আরো আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিল।
সুলতানে আলি মাকাম! সেই হিন্দু কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছে, লাহোরের সৈন্যরা গঙ্গা যমুনার মিলনস্থলে পৌঁছে গেছে। তাদের গন্তব্য কালাঞ্জর।
মহারাজা গোবিন্দ বলেছেন, এবার তিনি মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে গোটা হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে পড়বেন এবং হিন্দুস্তানের মাটিতে কোন মসজিদের অস্তিত্ব রাখবেন না এবং কোন মুসলমানকে বেঁচে থাকার সুযোগ দেবেন না।
