বাইরে থেকে আওয়াজ এলো- ভেতরে কেউ আছে, না নেই?
আমি বললাম- নেই। তোমরা সামনে দৌড়াও।
মুহূর্তের মধ্যে আমার কানে এলো দৌড়ানোর শব্দ। এদিকে আমি যার গলা আটকে রেখে ছিলাম এমনভাবে তার গলায় চাপ দিলাম যে, সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে কয়েকটা ঝাঁকুনি দিয়ে নেতিয়ে পড়ল। মৃত্যু নিশ্চিত হলে আমি তাকে ফেলে দিয়ে দ্রুত তার শরীরের কাপড় খুলে মেয়েটিকে পরিয়ে দিলাম। তরুণীর চুলছিল খোলা? এলোমেলো। তা ছাড়া তার চেহারাও বেশ সুন্দর। আমি মেঝেতে হাত দিয়ে ধুলোবালি হাতে নিয়ে তার চেহারায় মাখলাম এবং কাপড় দিয়ে তার মাথা পেঁচিয়ে ফেললাম। আর মৃত পুরোহিতের গলার মালাটি তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে তার লেবাস সূরত সম্পূর্ণ বদলে ফেললাম।
এরপর তাকে নিয়ে সদর রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। আলোকিত প্রশস্ত রাস্তা দিয়েই আমি তাকে নিয়ে প্রধান মন্দিরের একটি পরিত্যক্ত জায়গায় চলে এলাম। এই জায়গাটিতে ময়লা ও শেওলা পরে সবুজ আঁঠার মতো হয়েছিল। আমি এই আঁঠালো ময়লা হাতে নিয়ে মেয়েটির চেহারায় ও চুলে মেখে তাকে পুরোদস্তুর সন্ন্যাসীনীর রূপ দিলাম।
এদিকে মন্দিরের ভেতরে বাইরে তরুণীর খোঁজে দৌড় ঝাঁপ শুরু হয়ে গেলো। পুরোহিত ও তাদের চেলারা এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছিল। আমাদের পাশ দিয়েও অনেকে ছুটাছুটি করেছিলো কিন্তু আমাদের প্রতি কেউ সন্দেহ করেনি এবং সন্যাসী বেশের তরুণীকে কেউ চিনতে পারেনি। এরপর আমি মেয়েটিকে মন্দিরের চৌহদ্দি থেকে বের করে শহরের কাছাকাছি একটি জঙ্গলে নিয়ে গেলাম।
মন্দির থেকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছলে মেয়েটি আমাকে জানালো, আর দু’এক দিনের মধ্যেই আমাকে বলি দেয়া হতো। মেয়েটি আমাকে আরো জানালো, তার বাবা কিছুতেই তার বলিদানে সম্মত ছিল না । কিন্তু রাজার একান্ত সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও পুরোহিতরা তাকেও হত্যার এবং তার উভয় মেয়েকেই তুলে নেয়ার হুমকী দেয়। সেই সাথে তাকে সরকারী চাকুরী থেকেও বরখাস্ত করে কঠিন শাস্তি দেয়ার হুমকী দেয়া হয়।
মেয়েটিকে নিয়ে রাতটি আমি জঙ্গলেই কাটালাম এবং দিনের বেলায় তাকে একটি নিরাপদ আস্তানায় রেখে সন্ধ্যার পর তার বাবার সাথে সাক্ষাত করলাম। সাক্ষাতে মেয়েটির বাবাকে জানালাম, তার মেয়ে এখন একটি নিরাপদ আস্তানায় আছে। লোকটি খুবই আতংকিত ছিল। সে আমাকে জানালো, ইতিমধ্যে তার ঘরে তল্লাশী চালানো হয়েছে। তাকে রাজার লোকেরা হুমকী দিয়ে গেছে। যদি তার মেয়েকে খোঁজে না পাওয়া যায় তাহলে তার অন্য মেয়েটিকে তুলে নেয়া হবে। সে আরো জানালো, আমার পক্ষে কোন অবস্থাতেই মেয়েটিকে ঘরে জায়গা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, পালিয়ে আসা মেয়েকে বাড়ীতে পেলে রাজার লোকেরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করবে।
লোকটি আমাকে দেখে খুবই অবাক হলো। কেননা, আমার লেবাস সূরত ছিল সন্ন্যাসীর। একজন সন্ন্যাসী কি করে মন্দিরে বলিদানের জন্যে আটক তরুণীকে পালানোর ব্যাপারে সহায়তা করতে পারে?
আমি তাকে বললাম, আসলে আমি সন্ন্যাসী নই। তবে আমার আসল পরিচয় তাকে তখনো জানাইনি। আমি তাকে বললাম, আপনি যদি অন্য মেয়েটিকে নিয়েও শংকাবোধ করেন তাহলে তাকেও আমি নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি।
লোকটি পড়ে গেল দোদুল্যমান অবস্থায়। একদিকে তার দুই সন্তানের জীবন, অপর দিকে তার নিজের অস্তিত্ব। এক পর্যায়ে সে বললো, আমরা সবাই যদি এখান থেকে চলে যেতে চাই তবে তুমি কোথায় নিয়ে যাবে?
আমি বললাম, আমি ইচ্ছা করলে আপনাদেরকে কনৌজ দুর্গে পৌঁছে দিতে পারি।
এক পর্যায়ে লোকটি তার অপর মেয়ে ও স্ত্রীসহ কনৌজ চলে যেতে রাজি হলো। সে ছিল একজন উচ্চ পদস্থ রাজ কর্মচারী। ফলে কনৌজ যাওয়ার জন্যে একটি ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা সে করে ফেললো। পরে আমি তার দুই মেয়েকেই সন্ন্যাসীর বেশে সাজিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে সওয়ার হয়ে শহরের বাইরের জঙ্গল থেকে রওয়ানা হলাম। আর মেয়েদের বাবা পৃথক ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আমাদের অনুসরণ করলো।
সাধারণত হিন্দুদের স্বভাব হলো, বিপদে পড়লে তারা তাদের স্ত্রী-কন্যাদের ফেলে নিজেদের জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু এই লোকটি ছিল ব্যতিক্রম। সে তার মেয়ে দুটোকে প্রাণাধিক ভালোবাসতো। মেয়েদের জীবন রক্ষার্থে সে তার নিজের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
পথিমধ্যে একবার বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় বিরতির আগেই আমরা রাজা গোন্ডার এলাকা অতিক্রম করতে সক্ষম হলাম। তখন মেয়েদের বাবাও আমাদের সাথে মিলিত হলো এবং আমাকে বললো, আমার মেয়ে দুটোর জীবন বাঁচানোর জন্যে সে আমাকে পুরস্কৃত করতে চায়। এজন্য সে তার বাড়ী থেকে প্রচুর সোনা দানা নিয়ে এসেছে। আমি তাকে জানালাম, আমার এসবের দরকার নেই এবং সোনা দানার প্রতি আমার কোন আগ্রহও নেই। কারণ, আমি মুসলমান। আমি কালাঞ্জরে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিলাম রাজা গোবিন্দের অবস্থা ও তার যুদ্ধ প্রস্তুতির ব্যাপারে তথ্য সগ্রহ করার জন্য। এটিই আমার মূল কর্তব্য।
একথা শোনে লোকটি খুশী হয়ে বললো, আরে মহারাজার সব খবরতো তোমাকে আমিই দিতে পারি। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ রাজ কর্মচারী ছিলাম আমি। মহারাজা ও রাজপ্রাসাদের সব অভ্যন্তরীণ বিষয় আমার নখদর্পণে। রাজমহলের সদর অন্দর সব খবরই আমি জানি। আমি তোমাকে সবই বলতে পারবো। সে জানালো–
