আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজা গোবিন্দ কি ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছে, না যা বলছে তা তার করার সামর্থ আছে?
সে বললো, তা করার সামর্থ তার আছে। সে এতোটাই শক্তি অর্জন করেছে যে, রাজা অর্জুনকে সাথে নিয়ে সে লাহোরও দখল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কনৌজ, রাড়ী, মহাবন, মথুরা, নগরকোট, মুলতান ও বেড়ায় যে সামান্য সংখ্যক গযনীর সৈন্য রয়েছে তাদেরকে দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়া হবে। তোমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। এখন তার প্রস্তুতি খুব ব্যাপক। এই অঞ্চলের প্রতিটি নারীও এখন যুদ্ধে শরীক হতে প্রস্তুত।
* * *
এই গোয়েন্দার নাম আবেদনী। গোয়েন্দা আবেদীন সুলতান মাহমূদকে জানালো, সেই হিন্দু রাজ কর্মকর্তাকে তার দুই মেয়েসহ কনৌজ পৌঁছে দেয়া হলো এবং কনৌজে তার সাথে খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করা হলো। সে গভর্নর ও সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকীকে বহু সোনা দানা উপহার দিয়ে বললো, আমি শুধু এতটুকুই আপনার কাছে আশা করি যেন আমার মেয়েদের কেউ হয়রানী না করে। সেনাপতি তার সোনাদানা কিছুই গ্রহণ করেননি। তিনি তার পরিবার নিয়ে সম্মানজনকভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন।
কিছুদিন কনৌজে থাকার পর সে মুসলমানদের আচার-আচরণ ও জীবনাচার দেখে এতোটাই মুগ্ধ হলো যে, কনৌজ দুর্গের প্রধান ইমামের নিকট গিয়ে সে তার দুই মেয়েসহ ইসলামে দীক্ষা নিল।
গোয়েন্দা আবেদীন সুলতানকে জানালো, সম্মানিত সুলতান! আমরা সেই হিন্দুর সব কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু তার কথা যাচাই করার জন্য আমরা সেইসব জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সে যা বলেছিল তার সবই সত্য।
গোয়ালিয়রে আমাদের যে ব্যক্তি দায়িত্বপালন করছে, সে জানিয়েছে গোয়ালিয়রে জোরদার যুদ্ধপ্রস্তুতি চলছে। সে আরো জানিয়েছে, হিন্দুরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের প্রথম টার্গেট হবে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প করে থাকা গযনী বাহিনীর সৈন্যরা। এরপর হিন্দুস্তানে বসবাসকারী ছেলে বুড়ো, শিশু মহিলা নির্বিশেষে সকল মুসলমান হবে তাদের পরবর্তী টার্গেট। এরপর সারা হিন্দুস্তানের সৈন্যরা গযনীর দিকে অভিযান চালাবে। গোয়েন্দা আরো জানালো, হিন্দুদের মধ্যে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। মন্দিরগুলোতে পণ্ডিতেরা মুসলমান হত্যাকে পূণ্যের কাজ বলে প্রচার করছে।
তুমি কি বলতে পারো, তাদের যুদ্ধপ্রস্তুতি কোন পর্যায়ে আছে? জানতে চাইলেন সুলতান।
অবশ্যই বলতে পারি সুলতান! বললো গোয়েন্দা আবেদীন। হিন্দু রাজাদের যুদ্ধপ্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে গেছে। যে সব লোক সেনাবাহিনীতে নতুন যোগ দিয়েছে তারা ততোটা গড়ে উঠতে পারেনি। তবে তারা অশ্বারোহণ, তরবারী চালনা ও তীরন্দাজী জানে। কিন্তু নিয়মিত সেনাদের মতো তারা রণাঙ্গনে মুখোমুখী যুদ্ধের উপযোগী হয়নি। এখনো তাদের প্রশিক্ষণ চলছে।
সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকী ও অন্যান্য ক্যাম্পে থাকা কমান্ডারগণ আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে দ্রুত সেনাভিযানের জন্য অনুরোধ করি। তাহলে হিন্দুদের প্রস্তুতি পর্বেই আমরা কাবু করে ফেলতে পারবো। ওখানকার মুসলমানরা আতংকে আছে, হিন্দুরা না আবার মুসলিম হত্যায় মেতে ওঠে। আমাদের সেনারা তো লড়াই করে প্রাণ দিবে যেহেতু তারা শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত কিন্তু নিরপরাধ একজন মুসলমানের উপর আঘাত এলেও তা হবে আমাদের জন্যে অসহ্যকর।
মাননীয় সুলতান! সাধারণ মুসলমান ও মসজিদগুলোকে আমাদের অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। হিন্দুরা যদি আক্রমণ করে তাহলে মুসলমান মেয়েদেরকে প্রথম সুযোগেই অপহরণ করবে। এমনটি ঘটলে কেয়ামত পর্যন্ত লোকেরা আমাদের ঘৃণাভরে স্মরণ করবে এবং অভিশাপ দেবে।
হ্যাঁ, বুঝেছি। এবার লাহোরে আমাদেরকে অবশ্যই হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং খুব দ্রুত অভিযান চালাতে হবে- বললেন সুলতান।
* * *
সুলতান মাহমূদ তখনই সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের ডেকে ভারতের অবস্থা জানিয়ে দ্রুত সেনাভিযানের প্রস্তুতি নিতে বললেন। এও বললেন, অভিযান হবে খুব দ্রুত এবং সফরে খুব কম যাত্রা বিরতি দেয়া হবে। চলার মধ্যেই আমাদেরকে খাওয়া দাওয়া সেরে নিতে হবে। আমাদের প্রথম টার্গেট হবে কালা র দুর্গ। আমরা প্রথমেই কালাঞ্জর দুর্গ অবরোধ করবো। অবরোধ আরোপের পর সৈন্যরা কিছুটা বিশ্রাম সেরে নিতে পারবে। সুলতান সেনাপতিদেরকে যাত্রাপথ ও যাত্রা বিরতির জায়গাগুলো ভৌগোলিক মানচিত্রের সাহায্যে দেখিয়ে দিলেন।
সুলতান মাহমূদ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের দিক নির্দেশনা দিয়ে শেষ করতেই ইসরাঈল সেলজুকীর পয়গামবাহী দূত এসে হাজির। ইসরাঈল সেলজুকীর পয়গামবাহী মৌখিক পয়গামে জানালো, সেলজুকী নেতা বলেছে সুলতান যদি আমাদের সামরিক শক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমাদেরকে রাষ্ট্রগঠনের জন্যে জায়গা দিতে রাজী হয়ে থাকেন, তাহলে আমি তার জমি গ্রহণ করতে রাজি।
আর যদি তিনি তার সামরিক শক্তির গর্বে গর্বিত হয়ে থাকেন এবং আমাকে ভিখারী মনে করে ভিক্ষা হিসাবে এই প্রস্তাব দিয়ে থাকনে, তাহলে আমি তার এই প্রস্তাব মানতে রাজি নই। আমি আমার জাতির জন্যে একটি ভূখণ্ড অর্জন করার ক্ষমতা রাখি। আমাকে পরিষ্কার করে বলতে হবে, সুলতান কেন আমার প্রতি এই অনুগ্রহ দেখাচ্ছেন? সুলতানকে মনে রাখতে হবে, গয়নী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার মতো সৈন্যবল আমার আছে।
