* * *
এরপর কেটে গেল কয়েক মাস। হঠাৎ এক দিন হিন্দুস্তান থেকে গযনী বাহিনীর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সুলতানের কাছে খবর নিয়ে এলো। এই খবর পাঠিয়েছেন কনৌজে নিয়োজিত গভর্ণর সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকী।
গোয়েন্দা সুলতানকে জানালো, কনৌজের গভর্ণর গোয়ালিয়র ও কালাঞ্জরে বহু গোয়েন্দা নিয়োজিত করেছিলো যখন কালাঞ্জরে মহারাজা গোবিন্দ পালিয়ে গেলেন। বিশেষ করে আমি রাজা গোবিন্দের রাজধানী কালাঞ্জরে পৌঁছার সাথে সাথেই ঋষীর বেশ ধরে সেখানে পৌঁছি। আমি গিয়ে মন্দিরের পুরোহিতদের আস্তানায় ঠাই নিই।
তখন গোটা রাজধানী ছিল ভয় আতংকে কম্পমান। লোকদের মধ্যে এতোটাই আতংক ছড়িয়ে পড়ে ছিল যে, কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস করতো না। মন্দিরের শিংগা ও ঘণ্টাগুলো অবিরত ঘণ্টা বাজিয়ে এই আতংককে আরো ভয়াবহ করে তুলেছিল। আমি দেখিনি, আমাকে জানানো হয়েছে, রাজা গোবিন্দ রাজধানীতে পৌঁছে দুই দিন মন্দিরে ছিলেন। রাজ প্রাসাদে তাকে দেখা যায়নি। কিন্তু দু’ দিন পর রাজার অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যায়। তিনি পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরে পান এবং কেন এমনটি হলো এর কারণ উদঘাটন করতে শুরু করেন।
একদিন ঋষির বেশে আমি শহরের একটি গলি দিয়ে হাটছিলাম। একটি বাড়ির আঙিনায় এক যুবতী মহিলাকে মাটিতে পড়ে কাঁদতে দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম- মা! কাদছো কেন?
সে দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- তুমি সন্যাসী সেজেছো? আমার বাচ্চাকে ফিরিয়ে দাও। তার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, মন্দিরের পুরোহিতরা রাজার এই অবস্থা দেখে পরামর্শ দিয়েছে, তিনটি পাঁচ ছয় মাসের শিশু বলি দিতে হবে।
যেই কথা সেই কাজ। রাজার নির্দেশে শহরে খোঁজ খবর নিয়ে তিন মায়ের কোল খালি করে তিনটি শিশুকে নিয়ে বলি দিয়ে তাদের রক্ত দিয়ে রাজাকে গোসল করানো হয়।
আহা! মহিলাটি কেঁদে কেঁদে আমাকে বলছিল, আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটিকে যারা খুন করেছে, তাদের একদিন না একদিন শাস্তি হবেই হবে।
সেই গোয়েন্দা বললো- আমি বেশীর ভাগ সময় মন্দিরেই কাটিয়েছি। পুরোহিতদের সাথে আমার বেশ সখ্যতা গড়ে উঠলো। ফলে আমার পক্ষে রাজ মহলের অভ্যন্তরীণ খবরাখবরও জানার সুযোগ হয়েছিল। সুলতান!
আবেদীন! একথা ভুলে যাও, আমি কোন গযনীর সুলতান বা আদৌ সুলতান কি না। তুমি আমাকে সেই সব না বলা কথা শোনাও, যা কোন বন্ধু একান্ত বন্ধুকে শুনিয়ে থাকে।
জী সুলতান! আমি বলছিলাম, হিন্দুদের মন্দিরের রহস্যজনক, জটিল ও প্রতারণাপূর্ণ কর্মকাণ্ড দেখলে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। হিন্দু ধর্মে নারীর প্রভাব যথেষ্ট।
অন্ধকার গুহার মধ্যে চামচিকারা যেভাবে ঝাঁকে ঝাকে থাকে ওখানকার পথে ঘাটে এভাবেই গিজগিজ করে যুবতী নারীরা। একদিন আমি একটি বাড়ীর অন্ধকার আঙিনা পেরিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার সাথে একটি মেয়ের ধাক্কা লাগল। কাঁদছিল। আমাকে পেয়ে সে অনুরোধ করতে লাগল, দয়া করে এখান থেকে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। আমি আজীবন আপনার দাসী হয়ে থাকবো। আমি মরতে চাই না। রাজার জন্যে আমি জীবন বিলিয়ে দিতে চাই না।
সে ছিল তরুণী। ভয়ে কাঁপছিল সে। আমাকে জড়িয়ে ধরলো। জীবন বাঁচানোর জন্যে আমাকে হাতে পায়ে ধরে অনুনয় বিনয় করতে লাগল। তার কথা শুনে আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না, এই তরুণী কারো না কারো কুমারী কন্যা। মন্দিরের পুরোহিতরা তাকে বলী দেয়ার জন্যে তুলে নিয়ে এসেছে।
আমাকে ক্ষমা করবেন সুলতান! তরুণীর অনুরোধে আমি আমার কর্তব্য ভুলে গেলাম। মূলত আমার সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল রাজা গোবিন্দের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু একটা নিরপরাধ মানুষের জীবন এভাবে নষ্ট হতে দেখে আমার মধ্যে মানবিক দায়বোধ সৃষ্টি হলো। আমি মেয়েটিকে যথাসম্ভব আশ্বস্ত করতে বললাম- ঠিক আছে, তুমি শান্ত হও। দেখি তোমার জন্য আমি কি করতে পারি।
আমি মনে মনে আল্লাহর কাছে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহ! মানুষের জন্যে এখানে মানুষকে জবাই করা হয়। আমি এই অনর্থক জবাই হওয়া থেকে তোমার এক নগন্য বান্দিকে বাঁচাতে চাই, এর বদৌলতে তুমি আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য সফল করে দাও।
অন্ধকার আঙিনায় হঠাৎ আমি একটু আশার আলো দেখতে পেলাম। মেয়েটি আমাকে তাগাদা দিচ্ছিল আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন। যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে যান। তাড়াতাড়ি করুন। আমি মন্দিরের বদ্ধ কক্ষ থেকে পালিয়ে এসেছি। মন্দিরের পুরোহিতরা হয়তো আমাকে খুঁজছে।
মেয়েটি তখন থরথর করে কাঁপছিল।
এমন সময় আমার কানে কারো দৌড়ানোর শব্দ ভেসে এলো। আমি মেয়েটিকে বললাম- তোমাকে নিয়ে তো আমি বিপদে পড়বো। মনকে শক্ত করে এখন কান্না থামাও। এরপর মেয়েটিকে এক হাতে ধরে তাকে নিয়ে একটি দেয়ালের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে একটি পরিত্যক্ত ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
আমরা ঘরের ভেতরে ঢুকতেই বাইরে থেকে কানে ভেসে এলো, এ ঘরে ঢুকে দেখো। এতো অল্প সময়ের মধ্যে যাবে কোথায়?
সন্ন্যাসীর পোষাকের ভেতরে আমি খঞ্জর লুকিয়ে রেখেছিলাম। সেটি বের করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। বাইরে হয়তো দু’জন লোক ছিল। ভাঙ্গা দেয়াল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল একজন। আমি তখন দরজাবিহীন খালি জায়গাটায় দেয়ালের আড়ালে ওৎপেতে রইলাম। লোকটি ঘরের দরজায় এসেই হাঁক দিল। কে এখানে? ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে লোকটিকে ভূতের মতো একটা ছায়া মনে হচ্ছিল। আমি তাকে খঞ্জরের আঘাত না করে এক ঝাঁপটায় তার ঘাড় পেঁচিয়ে ধরলাম এবং আমার বাহুতে আটকে ফেললাম। তার পক্ষে কোন কথা বলা সম্ভব হলো না।
