কি হয়েছে? অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করলো মারয়াম।
আমার মনে হয় চাঁদের উপর দিয়ে মেঘ ভেসে গেছে। এজন্য ছায়া পড়েছে-বললো একজন বিদেশী।
* * *
পরের দিনের ঘটনা। তখন সকাল বেলার সূর্য উঠে গেছে। মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে সব দিকে। পাহাড়ের সবুজ বৃক্ষ-লতায় ভোরের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। তিন দিকে দেয়ালের মতো পাহাড় ঘেরা একটি ফাঁকা জায়গা। মাঝখানটা সমতল। সমতলের ঠিক মাঝখানে পাশাপাশি তিনটি বড় গাছ। ভারি সুন্দর জায়গা। মাঝখানের গাছটির সাথে যেন পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মারয়াম। তার হাত পেছন মোড়া করে বাধা। আর তার পা ও শরীর একটি রশি দিয়ে গাছের সাথে পাচানো। তার ডান ও বাম পাশে মারয়ামের গত রাতের গল্পের সঙ্গী দুই বিদেশীও একইভাবে গাছের সাথে বাধা। তাদের সামনের ফাঁকা জায়গাটায় ইসরাঈল সেলজুকী পায়চারী করছে। আর তাদের সোজা সামনে দশ বারো গজ দূরে তিন জন তীরন্দাজ ধনুকে তীর ভরে তাদের প্রতি ধনুক তাক করে রেখেছে।
আমি জানতাম তোমরা ইহুদী, তোমরা মুলমানদেরকে পরস্পর যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে পটু। দুই বিদেশীর উদ্দেশ্যে বললো ইসরাঈল। কিন্তু আমি তা জেনেও কয়েকজন মেয়ে ও কয়েকজন পুরুষকে সুলতান মাহমূদের সৈন্যদের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্যে প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ দিয়ে ছিলাম। তোমরা সেই কাজে মনোযোগী না হয়ে অবশেষে আমাকেই হত্যার নীল নকশা করছে। অবশ্য আমাকে একজন বলেছিল, ইহুদীরা সাপের মতো। এরা নিজ প্রভুকেই ছোবল মেরে বসে। আর এই কাল নাগিনীটাকে দেখো, তার স্ত্রী মারয়ামের প্রতি ইশারা করে বললো ইসরাঈল। এক সাথে সে দু’জনের স্ত্রী হিসেবে কাজ করছে। বিদ্রুপের একটা হাসি দিয়ে মারয়ামের উদ্দেশ্যে বললো–তুমি রাজরানী হতে চাচ্ছিলে? একবারও চিন্তা করলে না, তুমি কার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছো?
আমি তোমাকে শেষ বারের মতো বলছি– সুলতান মাহমূদের ফাঁদে পা দিয়ো না। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো মারয়াম।
হ্যাঁ, যা বলার শেষ বারের মতো বলে ফেলল। আমিও তোমাকে শেষ বারের মতো বলে দিচ্ছি– তুমি আমাকে ধোকা দেয়ার পরও আমি তোগা খানের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখবো। সেই সাথে সুলতান মাহমুদের সাথেও আমার শত্রুতা বজায় থাকবে। একদিন মানুষ গযনী সালতানাতের কথা ভুলে যাবে। সেলজুকী সালতানাতই তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠবে।
ইসরাঈল বুক টান করে মাথা উঁচিয়ে উদ্যত কণ্ঠে বললো– আমি অবশ্যই সুলতান মাহমূদের কাছ থেকে একটা এলাকা নিয়ে নেবো এবং সেই এলাকাই হবে গযনীর সেনাবাহিনী, সুলতান মাহমূদ এবং গযনী সালতানাতের কবর রচনার উৎস।
তোমার মতো উগ্র, মূর্খ উপজাতি লোকেরা শত্রুর জন্যে গর্ত খুঁড়ে নিজেরাই সেই গর্তে পতিত হয় বললো এক ইহুদী। শোন ইসরাঈল! তোমার নাম ইসরাঈল রাখা হয়েছে। তোমার গায়ে ইহুদী রক্ত রয়েছে বলে। এই ইহুদী রক্তের মান রাখার জন্যে আমি তোমাকে খুব মূল্যবান একটা কথা বলছি। মনোযোগ দিয়ে শোন।
তুমি ঠিকই বলেছো, আমরা দুজনই ইহুদী। কিন্তু আমরা দুজনই আমাদের পোষাক-আশাক মুসলমানদের মতো করে রেখেছি। আমরা তোমাদের ইসলাম সম্পর্কে এতোটুকু জানি, যা তোমাদের ইমাম ও আলেমরাও জানে না। আমরা তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করে দিতে পটু।
দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ আমরা তোমার হাতে বন্দি। ঘটনা যা ঘটেছে তাহলো, তোমার কোন লোক আমাদের গোপন কথাবার্তা শুনে ফেলেছিল। নয়তো যে চমৎকার কৌশল ও নৈপূন্যের সাথে আমরা তোমার স্ত্রীর হাতে তোমাকে খুন করাতে যাচ্ছিলাম তুমি এর প্রশংসা না করে পারবে না। এটাও দেখেছো, কিভাবে আমরা সুলতান মাহমূদের সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রায় ভাঙ্গন ধরিয়ে ছিলাম এবং মাহমূদের বিরুদ্ধে তোমাদের ক্ষেপিয়ে তুলতে সফল হয়েছিলাম।
শোন ইসরাঈল! শেষ কথা তোমাকে বলে দিচ্ছি? তুমি যতোই চেষ্টা করো কেন, সুলতমান মাহমূদকে তুমি পরাজিত কিংবা খুন কিছুই করত পারবে না। অচিরেই এক মারাত্মক পরিণতির শিকার হবে তুমি। কারণ মাহমূদ পাক্কা ঈমানদার লোক যাদের ঈমান দুর্বল তারা পাক্কা ঈমানদারদের মোকাবেলায় পরাজিত হতে বাধ্য। কার ঈমান পাকা আর কার ঈমান কাঁচা এ নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। আমাদের কাজ হলো, দুর্বল সবল সকল মুসলমানদেরকে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত রেখে মুসলিম শক্তি ও ঐক্যকে দুর্বল করে রাখা। সাধারণ সংঘর্ষে দুর্বল ঈমানদারদের পরা জত হতে হয়, কিন্তু আমরা তাদেরকেই বলি, তোমরাই পাক্কা ঈমানদার। লেগে থাকো বিজয় তোমাদেরই হবে।
অভিশপ্ত ইহুদী। দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো ইিসরাঈল। আমার সামনে মৃত্যু মুখে দাঁড়িয়েও আমাকে অপমান করছো? যাও, জাহান্নামে পাঠিয়ে দেব তোমাদেরকে। কথা শেষ করে দ্রুত এক দিকে সরে গেল ইসরাঈল এবং ধনুক তাক করে থাকা তিনজনকে ইঙ্গিত দিল। মুহূর্তের মধ্যে তিনটি তীর তিনজনের বুকে বিদ্ধ হলো।
আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো মারয়াম। ব্যথায় ঝাঁকিয়ে উঠলো ইহুদী দু’জন। কিন্তু কেউ বাঁচার জন্যে আকুতি করলো না। কারণ তারা জানে, খুনের চক্রান্তে জড়িত লোকদেরকে ইসরাঈলের মতো লোক কিছুতেই ক্ষমা করবে না। অতএব ক্ষমা ভিক্ষা অর্থহীন।
অতি লোভ আর মারয়ামের রাণী হওয়ার আকাঙ্খর এখানেই সমাপ্তি ঘটলো। সমাপ্তি ঘটলো মারয়াম অধ্যায়ের।
