তোমরা বলছে, সুলতান মাহমূদ আমাদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটা এলাকা দিয়ে দিতে চায়- বললো ইসরাঈল। আচ্ছা! একথা কি সে সত্যিকার অর্থেই বলেছে? না তোমাদের প্রতি এই বলে তিরস্কার করেছে? একথা বলার সময় তার ভাবভঙ্গি কেমন ছিল? সে কি গর্ব অহংকারে আমাদের প্রতি তাচ্ছিল্য করে একথা বলেছে?
না সর্দার! জবাব দিল এক সেলজুকী। সে অহংকার নিয়ে একথা বলেনি। যদি তার মনে আমাদের প্রতি ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের ভাব থাকতো তাহলে একথা বলতো না। আপনি চাইলে সে আপনার সাক্ষাতে এখানেও চলে আসতে পারে।
এ থেকে বুঝা যাচ্ছে সেলজুকীরা এখন এমন শক্তি অর্জন করেছে যে, তারা যে কাউকে তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে পারে—বললো মারয়াম।
মারয়ামের কথা আগেই বলা হয়েছে। সুলতান মাহমূদের আজীবন শত্রু এলিক খানের ভাতিজী এই সুন্দরী তরুণীর চিন্তা ভাবনা ও মন মানসিকতা ছিল এলিক খানের মতোই ইসলাম বিরোধী। সে বিয়ের আগেই ইসরাঈলকে বলেছিল– সুলতান মাহমূদকে যে হত্যা করতে পারবে, তার জন্যে আমি জীবন যৌবন সব কিছু কুরবান করে দিতে প্রস্তুত। ইসরাঈল সেলজুকী সুলতান মাহমূদকে চক্রান্ত করে হত্যা করবে, এই প্রত্যাশায়ই এলিক খান মারয়ামকে ইসরাঈলের কাছে বিয়ে দেয় এবং মারয়ামও এই নেশায়ই ইসরাঈলকে বিয়ে করে যে, ইসরাঈল মাহমূদকে হত্যা করে গযনীর রাজা হবে। আর মারয়াম হবে রাজ রাণী।
কিন্তু মারয়াম এখন বুঝতে পারছিল, ইসরাঈল সেলজুকী সুলতান মাহমুদের প্রস্তাব নিয়ে কিছু একটা ভাবছে। একটি স্বাধীন এলাকা পেয়ে গেলে সে এখন সুলতান মাহমূদের সাথে বিবাদে জড়াতে চাচ্ছে না।
এক পর্যায়ে ইসরাঈল সেলজুকী গয়নী থেকে ফিরে আসা চার সেলজুকী ও অর্ধবয়স্ক দুই বিদেশী লোককে বিদায় দিয়ে দিল। তারা চলে গেলে তার কাছে থাকল শুধু স্ত্রী মারয়াম। এই সুযোগে স্বামীর উদ্দেশে মারয়াম বললো–
আমি একথা শুনতে চাই না যে, আপনি সুলতান মাহমূদের সাথে কোন বিষয় নিয়ে সমঝোতা করেছেন। আপনার রাজিত হওয়ার ব্যাপারটি ছিল একটা দুর্ঘটনা। এখন আপনার এমন শক্তি আছে যে, আপনার কাউকে ভয় করার দরকার নেই। আপনার গোত্রের লোকেরা ছাড়াও আলাফতোগীন আছে আপনার সাথে, তোগাখানও আপনার সহযোগী। এখন আপনার কারো টোপ গেলার দরকার নেই। আপনি ইচ্ছা করলেই যে কারো কাছ থেকে রাজত্ব ছিনিয়ে নিয়ে স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
শোন মারয়াম! আমি জানি, সুলতান মাহমূদকে তোমার ঘৃণা করার কারণ। তোমার রাজ রাণী হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সে প্রধান বাধা। আমি তোমার রাজরাণী হওয়ার স্বপ্ন ঠিকই পূরণ করে দেবো। কিন্তু সংঘাতে যাওয়ার আগে আমাদের একটা নিজস্ব ঠিকানা দরকার, যে ঠিকানাটিকে আমরা আমাদের দেশ বলতে পারবো। একটি দেশ হলে আমরা সেখানে নিয়মিত একটি সেনাবাহিনী গঠন করতে পারবো, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পারবো। সেখানে আমাদের একটা মজবুত দুর্গ থাকবে। এখন তো আমাদের অবস্থা এমন যে, আমাদেরকে কেউ তাড়া করলে আমাদের আত্মরক্ষার কোন জায়গা নেই। আমাদেরকে লোকেরা জংলী যাযাবর, ছিন্নমূল ইত্যাদি বলে ডাকে। এজন্য মাহমূদের কাছ থেকে কিছু একটা আদায় করার সুযোগ দাও আমাকে।
ইসরাঈল সেলজুকীর কথার মর্ম বুঝতে পেরেছিল মারয়াম। কিন্তু তাদের কাছে বসা বিদেশী দুই লোক চাচ্ছিল না মারয়াম ইসরাঈলের কথার মর্ম উপলব্ধি করুক।
রাতের বেলা এই বিদেশী দু’জন লোক একটি দেয়ালের মতো জায়গার আড়ালে বসেছিল। তাদের কাছে ছিল ইসরাঈলের স্ত্রী মারয়াম। মারয়াম দুই বিদেশীকে বলছিল, সুলতান মাহমূদকে হত্যা করার শর্তে আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সে গয়নী শাসকের ফাঁদে পা দেবে। সে আমাকে বলেছে, তাকে যেনো আমি মাহমূদের কাছ থেকে একটা অঞ্চল হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ দেই। কিন্তু তার নিয়তের ব্যাপারেই এখন আমার সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, সে মাহমূদের কেনা গোলামে পরিণত হবে।
ইসরাঈল ছাড়া তোমার দৃষ্টিতে নেতৃত্ব দানের মতো এই গোত্রে কি দ্বিতীয় কেউ আছে? মারয়ামকে জিজ্ঞেস করল একজন।
হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। আর সে হলো তোগাখান। দরকার হলে তাকে আমি বিয়ে করে নেবো।
আরে! সে আমার জন্যে এতাটাই পাগল যে, যখন শুনলো আমি ইসরাঈলকে বিয়ে করেছি তখন বিষ খেয়ে মরে যেতে চাচ্ছিল। একথা জানতে পেরে আমি তার সাথে সাক্ষাত করি। তখন তার অনেকটা পাগলের মতো অবস্থা। অথচ সে ছিল তার বাবার একমাত্র স্থলাভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য। কিছু দিন পরেই তার বাবা মারা গেল। সে হলো তার বাবার স্থলাভিষিক্ত। কিন্তু তার মাথা ঠিক ছিল না। তার এই অবস্থা হোক সেটি আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। ফলে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করার জন্যে আমি ইসরাঈল সেলজুকীর স্ত্রী হওয়ার পরও চুরি করে তোগা খানের সাথে সাক্ষাত করেছি । তাকে সঙ্গ দিয়েছি।
গোপনে গোপনে তার সাথেও আমার স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা আজ পর্যন্ত চালু আছে। এখন আমার মনে হচ্ছে ইসরাঈলের মৃত্যুই হবে আমাদের জন্যে উপকারী। তোগাখানই আমাদের আশা পূরণের যোগ্য ব্যক্তি।
এরা তিনজন চাঁদনী রাতের আলো আধারীর মধ্যে যে জায়গাটায় বসে কথা বলছিল, হঠাৎ সেই জায়গায় একটা ছায়ার মতো দেখা গেল এবং ধীরে ধীরে ছায়াটি দূরে সরে গেল। বিদেশী দু’জনই সেই ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে গেল। তারা দেখতে পেল, আকাশের যেখানে চাঁদটা ভাসছে এর নীচ দিয়ে একটা ছায়ার মতো কি জানি সরে যাচ্ছে।
