সেলজুকী গোত্রের জীবন ধারণের প্রধান উপায় ছিল পশুচারণ। এক পর্যায়ে এরা অন্যান্য লোকদের পশু ছিনতাই এবং লোকজনের কাফেলায় ডাকাতি ও লুটতরাজ করতে শুরু করে। এরা খুবই সঙ্গবদ্ধ হয়ে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় থাকতো। তাই কেউ এদের মোকাবেলার চিন্তা করতো না। পরবর্তীতে এরা সুন্দরী মেয়েদেরও অপহরণ করতে থাকে। কিন্তু মেয়েদের অপহরণ করে এরা তাদের উপর কোন জুলুম করতো না। বরং পরম যত্নে তাদের নেতাদের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতো। ফলে অপহৃত মেয়েরা তাদের এখানে পরম সুখেই কালাতিপাত করতো।
সেলজুকীরা উপজাতি হলেও তাদের জীবন-যাপন, চলা ফেরা এমন আকর্ষণীয় ছিল যে, অন্যান্য গোত্রের উপজাতি লোকেরাও সেলজুকীদের সাথে মিশতে থাকে এবং নিজেদের সেলজুকী পরিচয় দিতে থাকে। দেখতে দেখতে ষাট সত্তর বছরে এই সেলজুকী গোত্রের পরিধি বিরাট আকার ধারণ করে। ইতোমধ্যে আরো ভিন্ন গোত্রের লোক এসে সেলজুকী গোত্রে যোগ দেয়, মূল। গোত্রের লোকদেরও সন্তান সন্ততি বেড়ে লোক সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সেলজুকীরা লড়াকু ও দুঃসাহসী হওয়ার কারণে ছোট ও দুর্বল রাজ্যের শাসকরা তাদেরকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লাগিয়ে দিতো। কারণ সেলজুকীরা রীতিমতো একটি সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তাদের গোত্রে ছিল অনেক যুদ্ধ পারদর্শী সক্ষম যুবক।
তুর্কি ও সামানীদের মধ্যে বিরোধ ছিল দীর্ঘ দিনের। সামানী শাসকরা এক পর্যায়ে সেলজুকীদেরকে তুর্কিদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে ব্যবহার করে। এরপর সুলতান মাহমূদের কাছে পরাজিত আলাফতোগীন গযনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে সেলজুকীদের সাথে একটি সামরিক চুক্তি করে। এই সামরিক চুক্তির প্রধান কারণ ছিল লকুমান সেলজুকীর মৃত্যুর পর গোত্রের নেতা হয় তার ছেলে ইসরাঈল সেলজুকী। ইসরাঈল সেলজুকী সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসে শোচনীয় পরাজয়ের শিকার হয়।
সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তান থেকে লড়াই ছাড়াই বিজয়ী বেশে ফিরে আসার পর তার উজীর তাকে জানালেন, ইসরাঈল সেলজুকী এখন গযনীর জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। এখনই এই আপদ দমন না করলে আমাদের বহু মূল্য দিতে হতে পারে। সেলজুকী হুমকির প্রমাণ সুলতান গযনীতে পা দিয়ে নিজের চোখেই দেখলেন। কিন্তু নিজের প্রাণঘাতি দুশনদের প্রতি খড়গহস্ত না হয়ে তিনি পরম ধৈর্যধারণ করে ধৃত চার সেলজুকীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে ইসরাঈল সেলজুকীর কাছে মৈত্রী পয়গাম পাঠালেন।
যে ব্যক্তি আপনাকে হত্যার চক্রান্তে লিপ্ত, যে আপনার সালতানাতের জন্যে বিরাট হুকমী হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার সাথে আপনি সৌজন্য সাক্ষাতের প্রস্তাব করলেন সুলতান! সুলতানের পয়গাম শুনে অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন উজীর।
হ্যাঁ, আমি তাকে দোস্ত বানাতে চেষ্টা করবো। ইসরাঈল সেলজুকী নামের মুসলমান হলেও নিজেকে তো সে মুসলমান বলে দাবী করে। কোন মুসলমানের # রক্ত ঝরাতে চাই না আমি। নিজ ভূমি থেকে বহু দূরের দেশ হিন্দুস্তানের পেটের ৪ মধ্যে আমি চলে যাওয়ার মতো দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করি। সেখানকার ৪, মাটি, বাতাস, তরু-লতা পর্যন্ত আমার শত্রু। এটা যেমন এক ধরনের দুঃসাহস, ও নিজের চিহ্নিত শত্রুদের অপরাধ ক্ষমা করে তাদের কাছে বন্ধুত্বের প্রস্তাব করাও ও এক ধরনের দুঃসাহস।
অবশ্য এটা আমার ও আমার সঙ্গীদের জন্যে চরম দুঃখের বিষয় যে, আমাকে একই সাথে দুটি শক্তির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এক দিকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজিত হিন্দুস্তানের বিস্তৃত এলাকা, যা মুসলমানদের কাছ থেকে হিন্দুরা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। দারুল ইসলামকে হিন্দুরা দারুল কুফরে পরিণত করেছে, আমি বিন কাসিমের সেই বিজিত এলাকাকে পুনরুদ্ধার করে সেখানে ইসলামের পুনর্জাগরণ করতে চাই এবং ক্রমবর্ধমান পৌত্তলিক অপশক্তির কোমর ভেঙে দিতে চাই।
কারণ, হিন্দু শক্তিকে খতম করতে না পারলে এরা শুধু হিন্দুস্তানের মুসলমানদের জন্যই নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। অপর দিকে আছে ইহুদী খৃস্টান অপশক্তি। এই দুই অপশক্তির দ্বারা আমরা বেষ্টিত। আমরা কেন, যে কোন সময় মুসলমানরাই এই দুই অপশক্তির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়বে কিংবা তাদের ফাঁদে পা দেবে, মুসলমানরা আত্মকলহে জড়িয়ে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।
আর স্বজাতিও স্বধর্মের ক্ষমতা লোভীরা তো আমার জঘন্য শক্র। ক্ষমতার মোহ আর রাজত্বের লালসা এদেরকে আমার বিরুদ্ধে লাগিয়ে রেখেছে।
ইসরাঈল সেলজুকী বাস্তবেই একটা সামরিক শক্তি হয়ে উঠেছে। আমি ইচ্ছা করলে এই শক্তি শেষ করে দিতে পারি। বেঈমানরা তাই চায়। কিন্তু আমি কাফের বেঈমানদের আকাঙ্খা পূরণ করতে চাই না। আমি ইসরাঈল সেলজুকীকে আর শর্ত মানাতে চেষ্টা করবো। প্রয়োজনে আমি একটা এলাকা তাকে দিয়ে দেবো।
* * *
এই ঘটনার বিশ বাইশ দিন পর পাহাড়ের পাদদেশের একটি মনোরম জায়গায় ইসরাঈল সেলজুকী বসেছিল। তার পাশে স্ত্রী মারয়াম এবং অর্ধ বয়স্ক দু’জন লোক। তা ছাড়া যে চার সেলজুকী গযনীতে সুলতান মাহমূদকে হত্যা ষড়যন্ত্রে গ্রেফতার হয়েছিল তারাও ছিল। তারা সেলজুকী নেতা ইসরাঈলকে তাদের গ্রেফতার ও মুক্তি পাওয়ার ঘটনা সবিস্তারে জানালো। তারা এও জানালো, সুলতান মাহমূদ তাদের কি বলে মুক্তি দিয়েছেন এবং ইসরাঈলের কাছে কি পয়গাম পৌঁছাতে বলেছেন।
