সেলজুকীদের পারস্পরিক কথাবার্তা এবং তার সাথে সেলজুকীদের কথাবার্তার বিস্তারিত সুলতানকে শোনালো গোয়েন্দা।
সব শুনে সুলতান অভিযুক্ত সেলজুকীদের উদ্দেশ্যে বললেন –তোমরা কি তোমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার কাছে কিছু বলবে? আমি শুনতে পেলাম, তোমরা আমাকে হত্যা করতে এসেছিলে?
না সুলতান! আমরা আপনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আসিনি– বললো এক সেলজুকী। অবশ্য আমাদের একজন আপনাকে হত্যা করার কথা বলেছিল। কিন্তু হত্যার উদ্দেশ্য তার ছিল না। ধরা পড়ে যাওয়ার পর আমরা সবই বলে দিয়েছি। আমাদের উপর এতো জুলুম করার দরকার ছিল না। আমরা কিন্তু ধরা পড়ার সাথে সাথেই পরিস্কার করে সব বলে দিয়েছি। আমরা সেলজুকী। সেলজুকীরা মিথ্যা বলে না। আমরা আপনাকে শত্রু মনে করি। আপনি চালাকি করে একবার
আমাদের বহু লোককে হত্যা করেছেন।
আমরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছি। আমরা সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবো। আমরা হিন্দুস্তানের মূর্তিপূজক নই, মুসলমান। কিন্তু মুসলমান হলেও আমাদের কোন দেশ নেই, রাজ্য নেই। আল্লাহর যমীনে এমন কোন জায়গা নেই, যাকে আমরা আমাদের দেশ বলতে পারি। আমরা দীর্ঘ দিন ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা চাই আমাদের একটা দেশ হোক। এই দেশের জন্যই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যেখানে সেলজুকীরাই হবে বাদশা। একটা সেলজুকী রাষ্ট্র হবে।
তোমাদের কথা হয়তো ঠিক। কিন্তু তোমাদের রাষ্ট্র গঠনের জন্যে আমার সালতানাতের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি কেন? যে কোন দুর্বল একটা রাজ্য দখল করে নিলেই পারো।
দুর্বলের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেয়া বীরত্বের ব্যাপার নয়। আপনি আমাদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী। আমরা চাচ্ছি আপনার অধীনস্থ কোন রাজ্যে আমাদের রাষ্ট্র গঠন করতে। বিশ্বাস করুন, আপনাকে হত্যা করার কোন ইচ্ছা আমাদের আদৌ ছিল না। আমরা চাচ্ছিলাম, আপনার সামরিক শক্তি দুর্বল করে দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে আপনাকে পরাজিত করতে।
ধন্যবাদ তোমাদেরকে। আমার কাছে ভালো লাগছে যে, মৃত্যুমুখেও তোমরা বীরের মতো অকপটে তা-ই বলছো, যে কথা তোমরা বিশ্বাস করো এবং মনে পোষণ করো– বললেন সুলতান। আমিও তোমাদের সাথে বীর জাতির নেতার মতোই আচরণ করবো। আমার বিরুদ্ধে এবং মুসলিম সালতানাতের বিরুদ্ধে অন্যায় চক্রান্তকারী হলেও আমি তোমাদের হত্যা করবো না এবং জেলে ঢোকাবো না। তোমাদেরকে আমি শাহী মেহমানের মতোই মর্যাদা দেবো। সুলতান একজন প্রহরীকে ডেকে বললেন– এদের বেড়ী খুলে দাও।
ডান্ডা-বেড়ী খুলতে খুলতে সুলতান বললেন, গমনী বাহিনী সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি?
খুব শক্তিশালী বাহিনী–বললো এক সেলজুকী। আমাদের ধারণা ছিল হিন্দুস্তান থেকে আপনার সৈন্যরা দুর্বল ও রণক্লান্ত হয়ে গযনী ফিরবে। কিন্তু যা দেখলাম, নতুন হাতি, ঘোড়া, সাজ সরঞ্জাম নিয়ে আপনার বাহিনী আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে।
তোমাদের নেতা ইসরাঈল সেলজুকী কি আমাদের সাথে এখনও যুদ্ধ করবে? জানতে চাইলেন সুলতান।
এ কথার জবাব সেই দিতে পারবে, আমরা এর জবাব দিতে পারবো না। আমাদের কাছে আমাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে পারেন– বললো এক সেলজুকী।
না, আমি আর কিছুই তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করবো না বললেন সুলতান। আমি তোমাদের কয়েকটি কথা বলে দিতে চাই। ফিরে গিয়ে তোমরা তোমাদের নেতা ইসরাঈল সেলজুকীকে আমার সালাম দিয়ে বলবে আমি তোমাদেরকে পাহাড়ের উপত্যকা ছেড়ে ঝিঝান নদীর তীরবর্তী বিশাল এলাকায় বসবাস করতে দেবো এবং সেখানে তোমরা নিজের মতো করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে। তাকে বলবে, একই ধর্মের অনুসারী দু’টি জনগোষ্ঠী যদি একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাতে উভয় গোষ্ঠীই দুর্বল হয়ে পড়বে শক্তিশালী হবে ইহুদী নাসারা গোষ্ঠী। যারা আদিকাল থেকেই মুসলমানদের শত্রু। ইহুদী খৃষ্টানরা আমার যেমন শত্রু তোমাদেরও বন্ধু নয়। সুযোগ পেলে তারা আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেবে।
তাকে আরো বলবে, জন্ম মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তদ্রূপ জয় পরাজয়ও আল্লাহ হাতে। তোমরা আমার সেনাদের মধ্যে তোমাদের চর ঢুকিয়ে দিয়ে হিন্দু রাজাদেরকে আমার যুদ্ধ কৌশল ও সেনাদের স্থানের খবর দিয়ে আমাকে পরাজিত করতে চেয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের বন্ধুগোষ্ঠী এলিকখানী এক তরুণীর দ্বারাই তোমাদের সকল চক্রান্ত্র ফাঁস করে দিয়েছেন। তোমরা যদি বাহাদুর জাতিই হবে তাহলে নারী দিয়ে এই চক্রান্ত করতে গেলে কেন? যুদ্ধতে পুরুষের কাজ। হিন্দুদের সাথে মৈত্রী করে তোমরা আমাকে থোকা দিতে চাচ্ছিলে। কিন্তু তোমরা কি জানো না, কোন কিছুই প্রকৃত মুসলমানের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তোমাদের নেতাকে বলবে, সে যার হাতে আমাকে পরাজিত করার চক্রান্ত করেছিল, সে আমাকে এতোটাই ভয় পেয়ে গেছে যে, লড়াই করা ছাড়াই হাতি ঘোড়া ফেলে রণাঙ্গণ থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেছে। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তোমাদেরকেও বলবো, আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে পেশ করো।
ইসরাঈলকে বলবে, সে যেনো নির্দ্বিধায় আমার সাথে সাক্ষাত করে। সে যদি না আসতে চায়, তবে আমাকে ডাকলে আমি তার কাছে চলে যাবো। আমার এই কথাগুলো হুবহু তাকে বলবে। যাও, তোমরা মুক্ত।
এই গল্পেই আমরা আগে বলে এসেছি বুখারা ও সমরকন্দের পাহাড়ী এলাকায় ঈঝ নামের একটি উপজাতি বসবাস করতো। এদের কোন নির্দিষ্ট এলাকা ছিল না। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে এরা। ঈঝ গোত্রের এক নেতার নাম ছিল লুকমান। লোকটি ছিল যেমন সাহসী তেমনই বুদ্ধিমান ও সুপুরুষ। সে নিজেকে সেলজুকী বলতো। লুকমান ঈ উপজাতিদের মধ্যে ধীরে ধীরে এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, সে নিজের পছন্দের নামে একটি স্বতন্ত্র গোত্র করে, গোত্রের নাম দেয় সেলজুকী। ঈঝ গোত্রের অধিকাংশ লোক লুকমানের নেতৃত্ব মেনে নেয় এবং নিজেদেরকে সেলজুকী বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। সেলজুকী গোত্র ছিল স্বাধীন। তারা কোন নিয়মতান্ত্রিক শাসকের অধীনে ছিল না। গোত্রপতিই ছিল তাদের শাসক।
