নিজেকে ধোকায় ফেলো না বন্ধু! গযনী সেনাদের শক্তি নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে অনেক বেশী বললো তাদের অপর একজন।
ধুর, এসব বাজে কথা। একজন সেলজুকী গযনীর পাঁচজন সৈনিকের চেয়েও বেশী শক্তি রাখে। আমি তো আগেই বলেছি, শুধু সুলতানকে যদি খুন করে ফেলা যায়, দেখবে গোটা গযনী বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যাবে। গযনী বাহিনীর অবস্থা তখন এই ভিক্ষুকের মতোই হয়ে যাবে ।
একথা বলে লোকটি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভিক্ষুককে ডাকলো। এই ভিক্ষুক! তোমার সুলতানকে বলো না, যে ধনসম্পদ হিন্দুস্তান থেকে লুট করে এনেছে, এ থেকে তোমাকে কিছু দিয়ে দিক।
পাকা দাড়ি, ছেঁড়া ফাটা ধুলি মলিন কাপড় পরা লোকটি ছিল যথার্থ অর্থেই একজন ভিক্ষুকের প্রতীক। তার এক হাতে একটি পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া লাঠি, আর এক হাতে ভিক্ষার ঝুলি। ভিক্ষুক জনতা থেকে কিছুটা ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা এই চারজনের পাশেই দাঁড়িয়ে ভিক্ষার আশায় সমবেত জনতার দিকে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে ছিল। ডাক পেয়ে সে পৃথকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এই চার দর্শনার্থীর কাছে চলে এলো এবং বললো
আমি গয়নবী নই, একজন সেলজুকী। গযনীর লোকেরা সেলজুকী ফকীরদের ভিক্ষা দেয় না।
আরে তোমার দেহে সেলজুকী রক্ত থাকলে তুমি নদীতে ডুবে মরতে; কিন্তু ভিক্ষা করতে না–তিরস্কার মাখা কণ্ঠে বললো দর্শনার্থীদের একজন। যাও, চলে যাও এখান থেকে। ইসরাঈল সেলজুকীর ওখানে চলে যাও। সেখানে কোন ভিখারী নেই, সবাই রাজা।
আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম আপনারা সেলজুকী। এজন্যই আপনাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলাম।
কিন্তু আমরা তোমাকে ভিক্ষা দেবো না। তোমার এই বদ অভ্যাসকে আমরা সমর্থন করতে পারি না বললো এক সেলজুকী।
এরপর ভিক্ষুক ও চার সেলজুকী দর্শনার্থীর মধ্যে আর কথা এগুলো না । সেনাবাহিনী সেই জায়গা অতিক্রম করার পর দর্শনার্থীরাও যে যার মতো করে চলে গেলো। এরাও জায়গা ত্যাগ করে শহরের পথ ধরলো। কিন্তু ভিক্ষুক তাদের পিছু ছাড়লো না। নিরাপদ দূরত্বে থেকে এই চার সেলজুকীর গতিবিধির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখলো।
* * *
রাজধানীতে ফিরে সুলতান মাহমূদ ঘরে না গিয়ে তার দফতরেই খাবার খেলেন। খাবার খেতে খেতেই তিনি তার অবর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী উজিরের কাছ থেকে জেনে নিলেন গযনীর সার্বিক অবস্থা।
উজির সুলতানকে জানালেন– অবস্থা ভালো নয়। সেলজুকীরা আমাদের জন্যে মারাত্মক বিপদ হয়ে উঠছে। ইসরাঈল সেলজুকী বিরাট শক্তি সঞ্চয় করেছে। বুখারা ও আশেপাশের সব লোক তার সঙ্গী হয়ে গেছে। ইসরাঈল সেলজুকীর মধ্যে মানুষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা আছে। সে বুখারার ক্ষমতালোভী নেতাদেরকে তার পক্ষে নিয়ে এসেছে। সে গোটা সেলজুকী জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করে গাদ্দার আলাফতোগীনকে সাথে নিয়ে গযনী আক্রমণের চক্রান্ত করছে।
শুধু এখানেই নয়, সেলজুকী সমস্যা তো এবার আমার সঙ্গেই গিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে কমান্ডার উমর ইয়াজদানীর স্ত্রীর অসম সাহসিকতার কারণে আমরা বেঁচে গেছি। যুদ্ধের আগের রাতে এরা রাজা গোবিন্দকে আমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সেনাদের অবস্থান জানানোর জন্যে রওয়ানা হয়ে গিয়েছিল। পরিচয় গোপনকারী দুই কোচওয়ানের ধরা পড়ার ব্যাপারটি সবিস্তারে উজিরকে জানালেন সুলতান।
সেলজুকীরা গয়নীতেই আপনাকে হত্যা করার অপচেষ্টা করছে। আজ চারজন সেলজুকীকে আমাদের গোয়েন্দারা গ্রেফতার করেছে- সুলতানকে জানালেন উজির ।
এরা কি স্বীকার করেছে আমাকে খুন করার জন্যে এসেছিল? কোথায় এরা?
জী হ্যাঁ, তারা যে মন্দ ইচ্ছায় এসেছিল তা তাদের কাছ থেকে বের করা হয়েছে। কাছেই আছে। আপনি চাইলে তাদের এখানে হাজির করা হবে।
ধৃত চারজনকে সুলতানের সামনে হাজির করা হলো। তাদের পায়ে বেড়ী, মাথা দোলছিল। তাদের কেউই ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছিল না। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তাদের উপর যথেষ্ট দখল গেছে। উজীর একজনের নাম উচ্চারণ করে প্রহরীকে বললেন– অমুককে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।
একটু পরে সুলতানের কক্ষে প্রবেশ করল একজন ভিক্ষুক। তার পরনে ছেঁড়া ফাটা ধুলোমলিন কাপড়। মাথায় উষ্ণু খুফু লম্বা চুল, দীর্ঘ চুল আর ময়লা মিলে অনেকটাই জটের রূপ নিয়েছে। তার হাতে লাঠি আর কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি।
সম্মানিত সুলতান! এই লোক হলো সেই ভিক্ষুক, যে এদের কথা কাছে থেকে শুনেছে এবং এদের গতিবিধির উপর দৃষ্টি রেখে এদের আস্তানা থেকে সময় মতোএদেরকে ধরিয়ে দিয়েছে। এরা যার বাড়ীতে ছিল সেখানকার তল্লাশী নিয়ে জানা গেছে, লোকটি সন্দেহজনক। এই ভিক্ষুক আসলে গোয়েন্দা বিভাগের একজন দক্ষ কর্মকর্তা।
আমরা যখন দেখলাম আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্যে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে, তখন ভীড়ের মধ্যে গোয়েন্দাদের ছড়িয়ে দিয়েছিলাম, যাতে কোন নাশকতা কিংবা অনাকাঙ্খিত ঘটনার উদ্ভব না ঘটতে পারে। এই গোয়েন্দা আপনাকে জানাবে কিভাবে সে এদের পাকড়াও করেছে। ভিক্ষুক বেশধারী গোয়েন্দা কর্মকর্তা সুলতানকে জানালো–
মাননীয় সুলতান! আমি দেখলাম, আপনার অভূতপূর্ব বিজয়ে লোকজন আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফালাফি করছে। আনন্দে নাচছে, গাইছে, শ্লোগান দিচ্ছে এবং এলোপাথাড়ী হয়ে ছুটাছুটি করছে, ধাক্কাধাক্কি করছে। কিন্তু এরা চারজন জটলা থেকে কিছুটা দূরে নির্বিকার দাঁড়ানো। দেখে মনে হচ্ছিল, তারা জটিল কিছু ভাবছে এবং এই বিজয় উল্লাসে তারা মোটেও খুশি হতে পারছে না। বরং মানুষের এই উল্লাসে তারা বিরক্ত। আমি তখন ধীরে ধীরে তাদের কাছে গিয়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে চেষ্টা করলাম।
