সুলতানের গোয়েন্দারা খবর দিলো, শত্রুবাহিনী শিবির ত্যাগ করে চলে গেছে। তিনি বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্যে এবং পরিস্থিতি যাচাই করার জন্যে দু’টি সেনা ইউনিটকে সাথে নিয়ে রাজা গোবিন্দের শিবির পর্যন্ত অগ্রসর হলেন। সত্যিই অবাক করা দৃশ্য। ছাউনী তাঁবু যথারীতি রয়েগেছে; কিন্তু গোটা শিবির ফাঁকা। কোথাও একজন পাহারাদার পর্যন্ত নেই। সুলতান এটিকে ফাঁদ মনে করে অনাকাঙ্খিত আক্রমণ প্রতিহতের জন্যে সেনাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলেন; কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোন দিক থেকে শত্রুপক্ষের কোন আক্রমণের আলামত দেখা গেলো না।
এক পর্যায়ে সুলতানের কাছে খবর এলো, মহারাজা গোবিন্দের সৈন্যরা কালাঞ্জরের পথে রাজধানীতে ফিরে যাচ্ছে। সুলতান পিছু ধাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে নিজেই গোবিন্দের সৈন্যদের ধাওয়া করার জন্যে বিদ্যুৎ বেগে অগ্রসর হয়ে শত্রু সেনাদের একেবারে কাছে চলে গেলেন। এটি ছিল একটি অতি দুঃসাহসী কাণ্ড। অবস্থা আঁচ করে প্রধান সেনাপতি আলতাঈ আরো চারটি সেনা ইউনিট নিয়ে দ্রুত সুলতানের সাথে যোগ দিলেন, যাতে কোন অনাআঙ্খিত পরিস্থিতি না ঘটে। অবশ্য তেমন কিছু ঘটেনি। বরং গোবিন্দের সৈন্যরা গযনী বাহিনীর তাড়া খেয়ে মালপত্র, হাতি ঘোড়া ত্যাগ করে যে যার মতো জীবন নিয়ে পালিয়ে গেলো।
কোন ঐতিহাসিকই মহারাজা গোবিন্দের মোকাবেলা না করে রাতের অন্ধকারে রণাঙ্গন ত্যাগ করার কারণ বলেননি। ঐতিহাসিক স্মিথ ও উথবী লিখেছেন– আসলে মহারাজা গোবিন্দ গয়নী বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে যাননি। তার মধ্যে একটা অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলেন। এটা দেখে তার সেনাকর্মকর্তারা আতংকিত হয়ে পড়ে এবং গযনী বাহিনী পিছু ধাওয়া করলে তারা হাতি ঘোড়া রসদপত্র ফেলেই জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়।
অবস্থা এমন হয় যে, সুলতান যখন পিছু ধাওয়া ত্যাগ করে শিবিরে ফিরে আসতে থাকেন, তখন রাজার ছয়শ’ জঙ্গি হাতির মধ্যে পাঁচশ আশিটি হাতিই ছিল তার সেনাদের দখলে। বিনা যুদ্ধে এই অস্বাভাবিক বিজয়ের পর সুলতানের অবস্থাও এমন হলো যে, তিনি হিন্দুস্তানে নিয়মিত সরকার গঠন না করেই গযনী ফিরে আসেন। ফিরে আসার ব্যাপারে কোন কোন ঐতিহাসিক লিখেছেন– সুলতানের কাছে খবর পৌঁছে যে, সেলজুকীরা বিপুল শক্তি সঞ্চয় করেছে। যে কোন দিন তারা গযনী আক্রমণ করতে পারে। এ খবর শুনে সুলতান হিন্দুস্তানে সরকার প্রতিষ্ঠা না করেই গযনী ফিরে আসেন।
৫.৩ স্লোগানেই কেল্লা জয়
সুলতান মাহমূদ যখন মহারাজা গোবিন্দকে পরাস্ত করে গযনী ফিরে আসেন, তখন তার সাথে ছিল যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ হিসাবে প্রায় ছয়শ জঙ্গি হাতি, আড়াই হাজার ঘোড়া আর সাত হাজার হিন্দু বন্দি। গযনীর অধিবাসীরা বিজয়ী সুলতান ও সেনাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে ঘর ছেড়ে অনেক পথ এগিয়ে গিয়ে ছিল। উল্লসিত জনতার তাকবীর ও স্লোগানে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছিল। রণ ক্লান্ত দীর্ঘ সফরে শ্রান্ত সৈনিকদের চেহারাও জনতার উল্লাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। বন্দিদের দীর্ঘ সারি যখন জনতাকে অতিক্রম করছিল তখন জনতার গগন বিদারী শ্লোগানে যমীন কাঁপতে লাগল।
মুগ্ধ আনন্দিত জনতা হিন্দু বন্দিদের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের তিরস্কার করছিল। কেউ কেউ বলছিল– গযনীতে তোমরা আসল খোদার দেখা পাবে। এসব খোদাকে প্রণাম করবে, তাহলে তোমরা মাফ পেয়ে যাবে। কিন্তু গযনীবাসীর এসব তিরস্কার ছিল ফারসী ভাষায়। হিন্দুরা ফারসী বুঝতো না। ফলে জনতার উল্লাস ধ্বনি ও অঙ্গভঙ্গি দেখে বন্দি হিন্দুদের কেউ কেউ অবাক বিস্ময়ে তাকাচ্ছিল, আবার কেউ পরাজিতের শুষ্ক হাসি হাসছিল আবার কারো চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু।
দর্শকদের মধ্যে চারজন লোক কিছুটা ভিন্নভাবে দাঁড়িয়ে তাদের সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী সুলতানকে গভীর ভাবে দেখছিল। তাদের কণ্ঠে কোন শ্লোগান ছিল ন। তারা ছিল সম্পূর্ণ নীরব ও গম্ভীর।
সুলতান যখন তাদের অতিক্রম করলেন তখন তারা গযনী সেনাদের তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখছিল। মহারাজা গোবিন্দ মোকাবেলা না করার কারণে গযনী বাহিনীর কোন সৈনিকের প্রাণহানি ঘটেনি। ফলে মনে হচ্ছিল, গযনী থেকে যে পরিমাণ সৈন্য গিয়েছিল, ফিরে আসছিল তার চেয়েও বেশী। অবশ্য সুলতান মাহমুদ কনৌজ ও লাহোরে কিছু সৈন্য রেখে এসেছিলেন। ওই দু’টি এলাকার শাসকরা তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল।
লড়াই না করেই ফিরে এসেছে সুলতান। দেখা যাচ্ছে ব্যাপক লুটপাট করে এসেছে– বললো নীরব দর্শক চারজনের একজন।
লড়াই না করলে যুদ্ধ বন্দি এলো কোত্থেকে? এতোগুলো হাতি ঘোড়া আর যুদ্ধ সরঞ্জামই বা কোথায় পেতো? বললো অপর একজন।
এতো লোকের মধ্যে আমি যদি সুলতানকে তীর ছুঁড়ে জনতার ভিড়ের মধ্যে বিশে যাই তাহলে আমাকে কেউ ধরতে পারবে না। সুলতানের লোভী জীবন এখানেই সাঙ্গ হয়ে যাবে– বললো এদেরই আরেক সঙ্গী ।
আরে রাখো! শুধু শুধু একা সুলতানকে হত্যা করলে তার রাজ্য আমাদের দখলে এসে যাবে না। তার যুবক একটি ছেলে আছে। সেও বাবার মতোই যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী। সুলতানকে হত্যা করে কিছু অর্জন হবে না আমাদের। বললো এদেরই আরেকজন।
খুন খারাবীর কথা রাখো। আমাদেরকে সুলতানের সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখার জন্য পাঠানো হয়েছে। হিন্দুস্তান থেকে কি পরিমাণ সৈন্য নিয়ে ফিরে এসেছে, তাদের অবস্থা কি, তাই জানা আমাদের কাজ। কারণ ইসরাঈল সেলজুকী ধোকায় পড়ে একবার পরাজিত হয়েছে, আমাদের অনেক লোক নিহত হয়েছে। এমন ভুল সে আর করতে চায় না। বললো– চারজনের দল নেতা।
