এই ভয়াবহ চক্রান্তের কথা জানার সাথে সাথে সুলতান দোশীন ও তার সহযোগী তরুণীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন এবং সকল সেলজুকী সৈন্যকে একত্রিত করে তাদের কাছ থেকে সব অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নিলেন। সেলজুকীদের সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে তাদেরকে নজরবন্দি ঘোষণা করে তাদের জন্য পাহারাদার নিয়োগ করলেন। ভয়ঙ্কর চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর আর কোন সেলজুকীর উপর আস্থা রাখা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করলেন সুলতান।
মহারাজা গোবিন্দের বিশাল সৈন্যবহর দেখে সুলতান মাহমূদ খুবই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি কিভাবে সামলানো যাবে এই চিন্তায় তিনি ছিলেন পেরেশান। এর মধ্যে নিজ সেনাদের মধ্যে আত্মঘাতি ভয়ঙ্কর চক্রান্তের বিষয়টি তাকে দারুন উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিল। বাহ্য দৃষ্টিতে কোন উপায় অন্তর না দেখে তিনি নফল নামাযে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে একান্ত মনে খুব কান্নাকাটি করলেন।
সারা রাত কখনো নামাযে কখনো হাতে কুরআন শরীফ নিয়ে আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করলেন সুলতান।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, শেষ রাতে তার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি দেখা গেলো। তিনি তখনই এক দূতকে ডেকে রাজা গোবিন্দের কাছে পয়গাম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। মনে হলো, সংকট থেকে উত্তোরণের কোন সহজ পথ পেয়ে গেছেন তিনি। তিনি রাজা গোবিন্দের উদ্দেশ্যে লিখলেন– ইসলাম সত্য ধর্ম, আর পৌত্তলিকতা সম্পূর্ণ মানুষের তৈরি অবাস্তব ধর্ম। ইসলাম গ্রহণ করলে আপনি শান্তি ও নিরাপত্তা পাবেন। যদি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, তাহলে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, আপনি আপনার সেনাবাহিনী ও আপনার রাজধানীর উপর কেমন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসবে।
আপনি যদি নেতিবাচক জবাব দেন, তাহলে সাথে সাথেই আমার সৈন্যরা আপনার উপর আক্রমণ করেবে। আর আপনার রাজধানী অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে রাজধানী অবরোধের আয়োজন হয়ে গেছে। আমার সৈন্যরা হয়তো সেখানে পৌঁছে গেছে। আশা করি, আপনি আমার সৈন্যদের হাতে আপনার সেনাদের গণহত্যার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করবেন এবং কালাঞ্জরের মন্দির ও শহরকে ধ্বংসের হাত থেকে হেফাযত করবেন।
এই পয়গাম দিয়ে সুলতান রাজা গোবিন্দের কাছে দূত পাঠালেন। মহারাজা গোবিন্দ ইসলাম গ্রহণ করলেন না বটে, কিন্তু সুলতানের দূতকে সসম্মানে ফেরত পাঠালেন। তিনি সুলতানের সাথে মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সুলতানের সেনা শিবিরের দিকে অগ্রবর্তী সেনাদল পাঠিয়ে দিলেন।
সুলতান মাহমুদের গোয়েন্দা ইউনিট সাথে সাথে খবর দিয়ে দিলো, রাজা গোবিন্দের অগ্রবর্তী সেনারা গযনী বাহিনীর দিকে রওয়ানা করেছে। সুলতান প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন গোবিন্দের অগ্রবর্তী বাহিনীর উপর এমন আক্রমণ করেন যে, তার গোটা বাহিনীর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধান সেনাপতি আলতাঈ যুদ্ধের ময়দানেই জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন। কোন অবস্থায় কি ব্যবস্থা নিতে হয় এ ব্যাপারে তিনি ইতিহাস বিখ্যাত ছিলেন। অগ্রীম খবর পাওয়া মাত্রই তিনি দুটি অশ্বারোহী ইউনিটকে ডানে বামে পাঠিয়ে দিলেন এবং তাদের কমান্ড নিজের হাতে রাখলেন।
মহারাজা গোবিন্দের অগ্রবর্তী সেনারা যখন তাদের মুখোমুখি এলো, তখন আলতাঈর নির্দেশে উভয় পাশের সৈন্যরা হিন্দু সেনাদের উপর উভয় দিক থেকে আক্রমণ করলো। আলতাঈ নিজে সেনাদের আক্রমণ পরিচালনা করলেন। ফলে মহারাজা গোবিন্দের অগ্রবর্তী বাহিনীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ল। অধিকাংশই নিহত হলো। আর যারা প্রাণে বেঁচে পালাতে সক্ষম হলো, তার গোটা সেনাবাহিনীর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে দিল।
সেদিন আর কোন লড়াই হলো না। রাতের বেলায় সুলতান মাহমূদ আবারো আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে লাগলেন। সুলতানের আশংকা ছিল, মহারাজা গোবিন্দের সৈন্যরা রাতে নিশ্চয়ই আক্রমণ করবে। কিন্তু রাতে আর কোন আক্রমণের ঘটনা ঘটলো না। নিরাপদেই রাত পোহাল। সুলতান যখন ফজরের নামায শেষ করলেন, তখন প্রধান সেনাপতি তাকে জানালেন মহারাজা গোবিন্দের সেনাবাহিনীকে রাতের বেলায় কোথাও চলে যেতে দেখেছে। আমাদের গোয়েন্দারা।
এটা নিশ্চয়ই থোকা। এতো বিশাল বাহিনী মোকাবেলা না করে পালিয়ে যেতে পারে না। রাজা গোবিন্দ আমাদেরকে সামনে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। সে আশা করছে, আমরা সামনে চলে গেলে আমাদেরকে উভয় দিক থেকে ঘিরে ফেলবে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, আসলে রাতের অন্ধকারে মহারাজা গোবিন্দের সেনাদের স্থানান্তর গয়নী বাহিনীর মোকাবেলার জন্য ছিল না। পালানোর উদ্দেশ্যে তারা রাতেই পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছিল। দিনের বেলায় গোবিন্দের অগ্রবর্তী বাহিনীর শোচনীয় অবস্থা দেখে রাত হতে না হতেই তার মনে হতে লাগলো, এতো দিন গযনী বাহিনীর দুর্ধর্ষতা সম্পর্কে তিনি যা শুনেছেন তাই ঠিক। তিনি গযনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নিজের ও রাজ্যের নিশ্চিত ধ্বংস ডেকে এনেছেন। তার মধ্যে দেখা দিল মারাত্মক আতংক। ফলে তিনি কাল বিলম্ব না করে রাতের মধ্যেই তার সেনাদেরকে শিবির ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।
এটি ছিল সুলতান মাহমুদের দুআর বরকত। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও আত্মনিবেদনের ফল। আল্লাহ তার দু’আর বরকতেই প্রবল শক্তির অধিকারী হিন্দু রাজার মনে আতংক সৃষ্টি করে দিলেন। এই হিন্দুরাজা এতোটাই আতংকিত হলেন যে, তিনি মোকাবেলা না করে রাতের অন্ধকারে রণাঙ্গণ ত্যাগ করলেন।
