দু’জন লোক নদীর দিকে অগ্রসর হলো। আর দোশীন, অন্য মহিলা ও বাকী দু’জন পুরুষ ভিন্ন পথ ধরলো। আম্বরী তাড়াতাড়ি ঝোঁপের আড়াল থেকে উঠে দ্রুত তার তাঁবুতে এলো এবং তীর ধনুক এবং একটি খঞ্জর কোমরে গোঁজে তাঁবু থেকে দ্রুত পায়ে নদীর দিকে অগ্রসর হলো। সে তার কর্মচারীকেও তারবারী আর বর্শা নিয়ে তার সঙ্গী হতে বললো।
আম্বরী ছিল অনভিজ্ঞ। কিন্তু সে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিল। সে এটা বুঝতে পেরেছিল, সুলতান মাহমূদ জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছেন। কিন্তু কিভাবে এই চক্রান্ত সামাল দেয়া যাবে? এই অভিজ্ঞতা তার ছিল না। সুলতান মাহমূদের প্রতি তার এতোটাই শ্রদ্ধা ছিল যে, আবেগের তীব্রতায় সে তীর ধনুক ও খঞ্জর নিয়ে তার কর্মচারীকে সঙ্গী করে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। নদী খুব বেশী দূরে ছিল না। অতি আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ার কারণে তাকে কেউ অনুসরণ করছে কিনা সেই খেয়াল আম্বরীর ছিল না। কত তাড়াতাড়ি সে নদীর তীরে পৌঁছাতে পারবে এটাই ছিল তার লক্ষ্য। ঠিক সময়েই নদী তীরে পৌঁছে গেল আম্বরী।
সে নদী তীরে পৌঁছে দেখল, চক্রান্তকারী দু’জন নৌকায় উঠে পানিতে নৌকা ভাসিয়ে দিয়েছে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে নৌকা। চাঁদনী রাত। বেশী দূর যায়নি নৌকাটি। আম্বরী তাড়াতাড়ি কিছুটা ভাটির দিকে গিয়ে এক হাটু মাটিতে ঠেকিয়ে ধনুকে তীর ভরে ছুঁড়ে দিল। কাল বিলম্ব না করে বিদ্যুৎ বেগে আরেকটি তীর ছুড়লো আম্বরী। উভয় তীর লক্ষভেদ করলো। কিন্তু ততোক্ষণে ঘটে গেছে অন্য কাণ্ড।
তার পিছনে আসা কর্মচারীর কণ্ঠ চিড়ে বেরিয়ে এলো আর্তচিৎকার। শেষ তীরটা ধনুক থেকে বেরিয়ে যেতে না যেতেই পেছন দিকে তাকিয়ে আম্বরী দেখল, তার কর্মচারীর উপর দু’জন লোক আক্রমণ করেছে। এদের একজন আম্বরীর দিকে দৌড়াতে চাচ্ছে, আর আম্বরীর কর্মচারী বর্শা দিয়ে তাকে আটকাতে চাচ্ছে । কর্মচারী সর্বশক্তি দিয়ে দু’জনের মোকাবেলা করতে চাচ্ছিল। কিন্তু আক্রমণকারী দু’জন ছিল তরবারী ধারী। তাদের যৌথ আক্রমণে কর্মচারী আহত হয়ে গেল।
এক আক্রমণকারী ততোক্ষণে আম্বরীর উপর আক্রমণ করল। কিন্তু আঘাতটি ব্যর্থ হলো। আক্রমণকারী আবার আক্রমণ করলো। এটিও ব্যর্থ করে দিয়ে আম্বরী গলা ছেড়ে চিৎকার শুরু করে দিল। বলতে লাগল– আয়! তোরা নদীর দিকে আয়! একথা বলে সে উল্টো পায়ে পেছনের দিকে সরে গেল এবং চটজলদি একটি তীর ধনুকে ভরে নিল। আম্বরী চাচ্ছিল এদেরকে জীবিত ধরিয়ে দিতে।
ধনুক থেকে তীর বের করে ফেলো মেয়ে। আমরা তোমাকে ছেড়ে দেবো–আম্বরীকে শাসালো এক আক্রমণকারী। আম্বরী ছিলো পাকা তীরন্দাজ। সে ধনুক উপরে উঠিয়ে তীর ছুঁড়ে দিলো। আক্রমণকারী লাফিয়ে অন্য দিকে সরে গেল। কিন্তু তীর ততোক্ষণে তার উরু ভেদ করে বেরিয়ে গেছে।
অপর আক্রমণকারী আম্বরীর কর্মচারীকে হত্যা করার চেষ্টা করছিল। আম্বরী আরেকটি তীর ওই হামলাকারীকে লক্ষ্য করে ছুড়লো । তারও পায়ে আঘাত হানলো তীর।
তীরবিদ্ধ হওয়ার পর উভয় আক্রমণকারী দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করলো; কিন্তু কেউই বেশী দূর এগুতে পারলো না। আম্বরী গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে দিল। আম্বরীর চিৎকার শুনে প্রহরীরা দৌড়ে এলো। আম্বরী প্রহরীদের জানালো– দু’জন চক্রান্তকারীকে সে তীরবিদ্ধ করেছে। এরা তীরবিদ্ধ হয়ে পালিয়ে যেতে চাচ্ছে। আর দু’জন হিন্দু গোয়েন্দাকে সে তীরবিদ্ধ করেছে। এরা নৌকায় চড়ে শত্রু বাহিনীর কাছে খবর নিয়ে যাচ্ছে। একটা নৌকা ভেসে যাচ্ছে, এর মধ্যে তীরবিদ্ধ দুই লোক রয়েছে। এরা গযনী বাহিনীতে হিন্দুদের চর হয়ে কাজ করে। এক প্রহরী একথা শুনে উচ্চস্বরে চিৎকার করলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছে গেল কয়েকজন অশ্বারোহী। তাদেরকে বলা হলো, নদীতে ভাসমান নৌকায় তীরবিদ্ধ শত্রু সেনা আছে, এদেরকে পাকড়াও করো।
নির্দেশ পাওয়া মাত্র কয়েকজন সৈনিক নদীর ভাটির দিকে দৌড়াল এবং দু’জন পানিতে নেমে নৌকায় উঠে সেটিকে তীরে এনে দুই আহতকে নদী তীরে তুলে আনলো। অপর দিকে পলায়নপর তীরবিদ্ধ দুই আক্রমণকারীকেও ধরে ফেললো প্রহরীরা। কিন্তু প্রহরীরা এদেরকে দেখে অবাক হলো। এরা যে তাদেরই সেনাবাহিনীর দু’জন কমান্ডার।
গ্রেফতার করা সবাইকে সাথে সাথে প্রধান সেনাপতি আলতাঈর কাছে নিয়ে গেল প্রহরীরা। যে দু’জন নৌকা করে হিন্দুদের খবর পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল, এরা ছিল পরিচয় গোপনকারী হিন্দু। এরা দুই সেলজুকী কমান্ডারের কর্মচারী পরিচয়ে গযনী বাহিনীর সাথে এসেছিল।
তীরবিদ্ধ দুই কমান্ডার ছিল সেলজুকী কমান্ডার রজব ভাই আর কমান্ডার ফরিদ আফিন্দি। নৌকায় আরোহী দুই হিন্দুর শরীর থেকে তীর খোলে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু কমান্ডার দু’জনকে দেখে সুলতান নির্দেশ দিলেন, যতক্ষণ না এরা সত্য কথা বলবে, ততোক্ষণ এদের শরীর থেকে তীর খুলবে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই হিন্দু মুখ খুললো এবং বললো–আমরা আসলে হিন্দু। এই দুই সেলজুকী কমান্ডার আমাদেরকে পরিচয় গোপন করে সাথে এনেছে। এখন আমাদেরকে মহারাজা গোবিন্দের কাছে গযনী বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পর্কে খবর নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
গ্রেফতারকৃত দুই সেলজুকী কমান্ডারও স্বীকার করলো– তারা ইসরাঈল সেলজুকীর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছিল। সুলতান একথা শুনে রাগে ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। বললেন- আল্লাহ যদি আমাদেরকে গযনী ফিরিয়ে নেয়, তাহলে সবার আগে ইসরাঈল সেলজুকী এবং আলাফতোগীনকে শায়েস্তা করবো।
