আমরা পরাজিত হলে আমাদের প্রাণ সম্পদের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসলাম। হিন্দু রাজারা গয়নী দখল করে নেবে। তোমরা জীবিত না থাকলে বিজয়ী না হলে গযনী দখল থেকে হিন্দুদের বাধা দেয়ার কেউ থাকবে না। তখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি হিন্দুরা দখল করে নেবে। আমাদের মা বোন কন্যারা হিন্দুদের বাদী দাসীতে পরিণত হবে। যে গযনী এখন ইসলামী সালতানাতের রাজধানী, হিন্দুরা সেটিকে মূর্তি পূজার রাজধানীতে রূপান্তরিত করবে। এদিকে হিন্দু শত্রু আর ওদিকে ইহুদী ও খৃস্টান শত্রু। ইহুদী ও খৃষ্টশক্তি মিলে আমাদের ক্ষমতালোভী আমীর উমারাদের বিভ্রান্ত করে ভেতরে ভেতরে আমাদের শক্তিকে ফোকলা করে রেখেছে। ফলে আমাদের চতুর্দিকে মুসলিম শাসন থাকলেও তারাও আমাদের ও ইসলামের ঘোরতর শত্রু।
হিন্দুরা যদি একবার গযনী পৌঁছে যেতে পারে তাহলে সকল কাফের বেঈমান মিলে কা’বা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আর এমনটি হলে আল্লাহর কাছে আমাদের সবাইকে অপরাধী সাব্যস্ত হতে হবে।
তাই বলছি বন্ধুরা! আজ তোমরা আল্লাহর নির্দেশে লড়াই করবে। আল্লাহর নাম নিয়ে লড়বে, আল্লাহর সাহায্য নিয়ে লড়বে। আল্লাহর রহমতের প্রতি শতভাগ ভরসা রেখে তোমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বাকী কাজ আল্লাহ করে দেবেন।
একথা বলার পর সুলতান সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে শুরু করলেন। কোন ইউনিট কোন দিকে থাকবে এবং কিভাবে কোন কৌশলে মোকাবেলা করবে তা কমান্ডারদের বুঝিয়ে দিলেন।
গযনী বাহিনীর অবস্থানের ডান দিকে ছিল যমুনা এবং বাম দিকে ছিল গঙ্গা নদী। দুই নদীর মাঝখানের বিস্তৃতি কোথাও বিশ মাইল কোথাও চল্লিশ মাইল। সুলতান মাহমূদ চাচ্ছিলেন রাজা গোবিন্দের সেনাদেরকে দু’ভাগে ভাগ করতে; কিন্তু দৃশ্যত এটা সম্ভবপর মনে হচ্ছিল না। তবুও তিনি তার পরিকল্পনা মতো সেনাদের দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়ে বললেন, প্রত্যেক কমান্ডার যেন তাদের অধীনস্ত প্রত্যেক সেনার কাছে তার এই বার্তা ও পয়গাম পৌঁছে দেয়।
* * *
এদিকে আম্বরী দোশীনের তাঁবুটি তখনই চিহ্নিত করে এলো। দোশীনের কার্যক্রমে আম্বরীর দৃঢ় বিশ্বাস হলো, সে শুধু তার স্বামীকেই ধোকা দিচ্ছে না, সুলতান মাহমূদের জন্যও মারাত্মক ধোকা হয়ে এসেছে। সেই রাতের প্রথম প্রহরে আম্বরীকে তার স্বামী উমর ইয়াজদানী শত্রুবাহিনীর বিপুলতা এবং সুলতানের উদ্বেগ ও তাঁর ভাষণ সম্পর্কে জানিয়ে দু’আ করতে বলে তখনই তাঁবু ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
আম্বরী তখনো তার স্বামী উমরকে জানায়নি, এখানে এক সেলজুকী কমান্ডারের স্ত্রী হয়ে এসেছে এক খান তরুণী। আম্বরী দোশীনকে ভালো ভাবেই জানতো। জানতে দোশীনের মন মানসিকতা এবং স্বভাবচরিত্র। ফলে সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না দোশীন ও তার সেলজুকী স্বামী গযনী সরকারের প্রতি অনুগত। কারণ, দোশীন ছিল একজন মারাত্মক কূট স্বভাব ও দুশ্চরিত্রের প্রতিমূর্তি। তাই আম্বরী সেই সন্ধ্যার পর থেকেই দোশীনের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে লাগলো। আম্বরী তার কর্মচারীকেও বলে দিয়েছিল দোশীনের প্রতি কড়া নজর রাখতে এবং তার তৎপরতা সম্পর্কে সাথে সাথে তাকে জানাতে।
পরের রাতের ঘটনা। সন্ধ্যার পর আম্বরী তার তাঁবুতে একাকি বসে আছে। তার স্বামী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। এমন সময় আম্বরীর কর্মচারী তাঁবুতে ঢুকে তাকে জানালো, সে দোশীনকে নদীর দিকে যেতে দেখেছে এবং তার পিছু পিছু দুইজন কোচওয়ানও নদীর দিকেই যাচ্ছে।
একথা শোনার সাথে সাথে আম্বরী তার কর্মচারীর নির্দেশনা অনুযায়ী নদীর দিকে অগ্রসর হলো। আম্বরী মূল পথ ছেড়ে একটু দূর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। কিছুক্ষণ অগ্রসর হয়েই সে দেখতে পেলো, চারজন লোকের সাথে শুধু দোশীন একা নয় আরেকজন নারীও দাঁড়ানো। আম্বরী একটা ঝোঁপের আড়াল দিয়ে পা টিপে টিপে তাদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল এবং তাদের কথাবার্তা পরিষ্কার শুনতে পেলো। তাদের কথা থেকে আম্বরী বুঝতে পারলো, তাদের মধ্যে আসল কথা আগেই হয়ে গেছে। সে শুধু একজনকে বলতে শুনল–
নদীর তীরে নৌকা বাধা আছে, নিঃশব্দে নৌকা পর্যন্ত গিয়ে নৌকার রশি খুলে দেবে। তোমরা যে দিকে যাবে সেদিকেই এখন পানির স্রোত। কিছুক্ষণ ভেসে দূরে গিয়ে বৈঠা চালাবে। প্রহরীরা কিন্তু ওদিকেও যায়, সতর্ক থাকবে। ঘণ্টা খানিকের মধ্যে পৌঁছে যাবে তোমরা।
মহারাজা অশ্বারোহী সৈন্যদেরকে যেন আমাদের বামপাশে রাখে। তুমি তো আমাদের পথ দেখে এসেছে। এই পথের কথা ভালো ভাবে বুঝিয়ে দেবে। আমরা এপাশেই থাকবো। মহারাজাকে বলবে, এ পাশে আমাদের পক্ষ থেকে তার বাহিনীর উপর কোন আক্রমণ হবে না। তারা একেবারে গযনী বাহিনীর মাঝখানে চলে যেতে পারবে। সুযোগ পেলে আমরাই তীর মেরে সুলতানকে মেরে ফেলবো।
মহারাজাকে আমাদের বাম পাশের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছার পথ বুঝিয়ে দেবে। আর বলবে, আমাদের সেনারা তার সেনাদের উপর আক্রমণ করে পিছিয়ে আসবে, তারা যেন আমাদের পিছিয়ে আসার কারণে এগিয়ে না আসে। তাহলে কিন্তু সুলতানের ফাঁদে আটকে যাবে। আমাদের আক্রমণকারীরা পেছনে সরে আসলে তারাও যে পিছিয়ে যায়, নয়তো আমরা উভয় বাহুর আক্রমণের শিকার হবো। যাও, এখ, চলে যাও। তোমাদের পুরস্কারের বিষয়টাতো জানাই আছে। ঠিক ঠিক পেয়ে যাবে।
