দোশীন! আমি ভুল করছি না তো? মহিলাকে চিনতে পেরে বললো আম্বরী।
আরে! আম্বরী না? কার সাথে যুদ্ধে এসেছো? ও! ওই লোকটার সাথে এসেছে মনে হয়, যার সাথে পালিয়ে এসেছিলে? বললো দোশীন।
তুমিও হয়তো পালিয়েই এসেছো? কোন খান মেয়েকে গয়নী সৈনিকের সাথে দেখলে আসলে আশ্চর্যই লাগে–বললো আম্বরী।
আচ্ছা! তোমার স্বামী কে? দোশীনকে জিজ্ঞেস করলো আম্বরী।
কমান্ডার রজব ভাই? সে সেনাবাহিনীর কমান্ডার জান না?
এভাবে বলছো কেন? রজব সেলজুকী বলো না। আমি তাকে চিনি। তার সাথেই এসেছো তাহলে? বললো আম্বরী।
আমি অন্য কারো সাথে আসিনি। এসেছি স্বামীর সাথে বললো দোশীন।
হেসে ফেললো আম্বরী। বললো, আমি চিনি রজবকে। তুমি যার সাথে কথা বলছিলে সে রজব ছিল না। আজ কোন কমান্ডারের এ সময়ে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমার স্বামীও কমান্ডার। আমি জানি তাদের কারো পক্ষে এই মুহূর্তে এদিকে আসা সম্ভব নয়।
দোশীন! যাই করো না কেন বুঝে শুনে করো। সেনাবাহিনীর সাথে থাকতে হলে নিয়ত ঠিক রাখতে চেষ্টা করো।
একথা শুনে দোশীন আম্বরীকে জড়িয়ে ধরে হেসে বললো –তুমি ঠিকই বলেছো আম্বরী। লোকটি আসলে রজব ছিল না। তার এক বন্ধু তার খবর নিয়ে এসেছিল। তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো? আমি গযনী সালতানাতের অনুগত ও বিশ্বস্ত। যদি গযনী সালতানাতের অনুগতই না হতাম তাহলে এখানে আসতাম না। আমাকে নিজের মতোই মনে করো। আমি গয়নী বাহিনীর নিরাপত্তা ও বিজয়ের জন্যে সব সময়ে দু’আ করি– একথা বলে আম্বরীকে একটি হাসি উপহার দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল দোশীন। আম্বরী সেখানেই দাঁড়িয়ে ব্যাপারটি নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল।
মহারাজা গোবিন্দের সেনাদের অবস্থা জানার জন্য সুলতান মাহমূদ নিজেই এগিয়ে গেলেন। প্রধান সেনাপতি আলতাঈও তার সঙ্গে ছিলেন। সুলতান ঘোড়া থেকে নেমে একটি উঁচু গাছে চড়লেন। মহারাজা গোবিন্দের সেনা বাহিনী দেখে তার চক্ষু ছানাবড়া। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক গারদীজী, ইবনুল আসির ও কারখী লিখেছেন– সুলতান মাহমূদ যখন মহারাজা গোবিন্দের সেনাবাহিনী দেখলেন, তখন তার উদ্বেগ আড়াল করতে পারলেন না। যতদূর দৃষ্টি গেলো সবখানে ছড়িয়ে ছিল সেনা শিবির, হাতি, ঘোড়া। জায়গায় জায়গায় খন্দক খুঁড়ে রাখা হয়েছিল। ঐতিহাসিক আবুল কাসেম ফারিশতাও একথা সমর্থন করেছেন।
ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সুলতান মাহমূদ গোবিন্দের বিপুল সেনা সমাবেশ দেখে প্রধান সেনাপতিকে বললেন, নিজের দেশ ছেড়ে এতদূর আসাটা উচিত হয়নি। আমাদের জন্য কোন সেনাসাহায্য বা রসদপত্র সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। পিছু হটারও কোন ব্যবস্থা নেই। শত্রু বাহিনী তো আমাদেরকে কনৌজের দুর্গ পর্যন্তও পৌঁছতে দেবে না। আমাদের দুর্গ বন্দি হয়েই লড়াই করা উচিত।
আমি এই প্রথম সুলতানের কণ্ঠে পিছু হটার কথা শুনলাম– বলে মন্তব্য করেছিলেন আলতাঈ। এরপর সুলতানের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, শত্রু বাহিনীর জনশক্তি বিপুল। কিন্তু আমাদের পিছু হটার চিন্তা ত্যাগ করা উচিত সুলতান!
তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু ঠিক এই পরিমাণ সৈন্য গোয়ালিয়রেরও রয়েছে। ওরাও যদি এখানে এসে পড়ে তাহলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে? একথা বলতে বলতে নীরব হয়ে গেলেন সুলতান। কিছুক্ষণ এভাবে থেকে মৃদু মাথা ঝাড়া দিয়ে বললেন, তওবা তওবা! আল্লাহ আমাকে মাফ করুন! আল্লাহ আমাকে মাফ করুন! হায়! আমি আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ মহান। তিনিই জয় পরাজয়ের মালিক।
বিপদের সময় সুলতান যা করতেন, গাছ থেকে নেমে এবারও তাই করলেন। কিবলামুখী হয়ে দু’রাকাত নামায পড়লেন। তার সাথে যারা ছিল তারাও নামায পড়লো। তারপর সুলতান শিবিরে ফিরে এলেন।
মহারাজা গোবিন্দের সৈন্যদের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার পদাতিক, ছয়ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী, এবং ছয়শো চল্লিশটি জঙ্গি হাতি ছিল। সে ছিল তার রাজধানী থেকে মাত্র এক দিনের দুরত্বে। তার রাজ্যের ছোট বড় সকল ধরনের লোকই যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে শরীক ছিল। গোটা হিন্দু জাতি ছিল ঐক্যবদ্ধ। এদিকে সুলতান মাহমূদের আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। সুলতান মাহমূদ শিবিরে গিয়ে সকল কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডারসহ সেনাকর্মকর্তাদের একত্রিত করলেন। তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, কোন দিন রণাঙ্গনে তোমরা আমাকে হতাশ করনি। খুব কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তোমরা শত্রুদের পরাজিত করেছে। দুই গুণ, তিন গুণ জনশক্তির অধিকারী শত্রু বাহিনীকেও তোমরা হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আজ তোমাদের সামনে পাহাড় দাঁড়ানো। তোমাদের একজনকে আমি বারোজনের সাথে মোকাবেলা করার নির্দেশ দিতে পারি না। তোমাদেরকে বিশাল হাতির সাথে মোকাবেলা করতে বলতে পারি না।
আমি তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, তোমরা এখানে একটা পবিত্র আকাখা নিয়ে এসেছে। আমি তোমাদের শুধু একথা বলে দিতে চাই, শত্রু বাহিনী যতো প্রবলই হোক না কেন আমাদের পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার কোন জায়গা নেই। পরাজিত হলে আমাদের অধিকাংশই নিহত হবো। আর যারা বেঁচে থাকবে তারা হবে হিন্দুদের কয়েদী। হিন্দুরা গযনীর যে কোন বন্দির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিটি পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে। তাদের দেবদেবীদের অপমান ও লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নেবে।
