যে চারজন কমান্ডার অভিযানে গিয়েছিল এরা ছিল রাতের ঝটিকা আক্রমণে পারদর্শী। তরলোচনপালের শিবিরের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে গিয়ে তারা প্রথমে দু’জন প্রহরীকে হত্যা করল। এরপর একটি তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দিল। সাথে সাথে আগুন জ্বলে উঠলো। তারা দ্রুত কিছু কাপড়ের টুকরোতে আগুন ধরিয়ে সারিবদ্ধভাবে তৈরী তাঁবুগুলোর দিকে নিক্ষেপ করতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে এক সঙ্গে অনেকগুলো তাঁবুতে জ্বলে উঠলো আগুন। অপর দিকে দু’জন সেনা অতি সংগোপনে অনেকগুলো ঘোড়ার রশি খুলে দিল। কয়েকটি ঘোড়াকে খঞ্জর দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করল। বন্ধনমুক্ত ও আহত ঘোড়াগুলো আতংকিত হয়ে দিগবিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করলো এবং তীব্র হ্রেষারব করে অপর ঘোড়াগুলোর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে দিল।
গযনীর ঝটিকা আক্রমণকারীরা যখন আক্রমণ করেছিলো তখন লাহোরের সেনারা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল। অগ্নি সংযোগের ব্যাপারটি দুর্ঘটনা না শত্রু বাহিনীর আক্রমণ তা বুঝতে তাদের অনেক সময় লেগে গেল। ততোক্ষণে গোটা শিবিরেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। লাহোর বাহিনীর তাঁবু ছিল খুব ঘন। একটির সাথে একটি লাগানো। দুপাশে পাহাড় আর মাঝখানে একটি সংকীর্ণ সমতল জায়গায় গাদাগাদি করে কয়েক হাজার তাঁবু খাঁটিয়ে ছিল তারা। ফলে দ্রুত একটির আগুন আরেকটিতে ছড়িয়ে পড়ল। ঘটনাক্রমে ঠিক সেই সময় তীব্র বাতাস বয়ে যাওয়ায় আগুন আরো ছড়িয়ে পড়েছিল।
সাফল্যের সাথে লাহোর শিবিরে অগ্নিসংযোগ করে গযনী বাহিনীর মরণজয়ী যোদ্ধারা পাশের পাহাড়ের উপড়ে উঠে গেল এবং দৌড় ঝাঁপরত হিন্দু সেনাদের উপর এলোপাথাড়ী তীর ছুঁড়তে লাগলো। তীর ধনুক তারা নিজেদের সাথে নিয়ে গিয়েছিল।
এই সময় একজন কমান্ডারের মাথায় এলো, আমরা যদি আমাদের সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে এই অবস্থায় এদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। একথা সে তার সাথীদের জানিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নেমে এলোপাথাড়ী ঘুরতে থাকা যে ঘোড়াগুলো দূরে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অগ্নিকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছিল এমন একটি ঘোড়াকে ধরে সেটির পিঠে চড়ে নদীর তীরের দিকে ঘোড়া ছুটাল। এই কমান্ডারই নদী পেরিয়ে এসে প্রধান সেনাপতি ও সুলতানকে খবর দেয়। সুলতান প্রধান সেনাপতিকে চারটি অশ্বারোহী ইউনিটকে নিয়ে আক্রমণ করার নির্দেশ দেন।
* * *
কালাঞ্জরের রাজা গোবিন্দ তার সেনাদের নিয়ে কালাঞ্জর ছেড়ে আসার খবর সুলতান মাহমুদের কাছে পৌঁছে যায়। সুলতান এ খবর পেয়ে তার সেনাদেরকেও অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। সুলতান কনৌজ থেকে কালাঞ্জরের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি খবর পেলেন গোবিন্দের সেনাবাহিনী যমুনা নদী পেরিয়ে এসেছে। সুলতান মাহমুদের সৈন্যরা পথিমধ্যে মাত্র দু’টি বিরতি দিয়ে এলাহাবাদ নামক স্থানের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন। তাদের অবস্থান থেকে এলাহাবাদ খুব বেশি দূরে ছিল না। এদিকে রাজা গোবিন্দের সেনাদের অবস্থান মাত্র তিন চার মাইল দূরে ছিল।
এই সময় সুলতান মাহমুদের সেনাদের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা সেই চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্তের চাল দিতে শুরু করল। চক্রান্তের মূল হোতা ছিল দুই সেলজুকী কমান্ডারের আত্মপরিচয় গোপনকারী স্ত্রী। এরা এই অভিযানে আসার শুরু থেকেই অন্যান্য মহিলাদের থেকে দূরে দূরে থাকতো। কেউ তাদের ব্যাপারে যাতে টের না পায় তাই এ ব্যবস্থা করেছিল তারা। এলাহাবাদ এলাকায় এসে যাত্রা বিরতি করলে এরা সক্রিয় হয়ে উঠে।
এক রাতে আম্বরী পায়চারী করতে করতে তার তাঁবু থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছিল। হঠাৎ তার কানে মানুষের ফিসফিসানির আওয়াজ ভেসে এলো। কেন জানি আম্বরীর মনের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধলো । সে ব্যাপারটি বোঝার জন্য পা টিপে টিপে অতি সন্তর্পণে সেই ফিসফিসানির দিকে অগ্রসর হলো। কিছুটা অগ্রসর হলে সে শুনতে পেলো একজন মহিলার অনুচ্চ আওয়াজ। খুবই সতর্কভাবে কথা বলছে। কি বলছে তা পরিষ্কার শুনতে পেল আম্বরী। চাঁদনী রাত। বাইরে কিছুটা আলো আধারী অবস্থা। আম্বরী শুনতে পেল–
আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না। লাহোরের সৈন্যরা তো ধোকায় পড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে বলছিল এক মহিলা। তোমরা বলছে, মহারাজা গোবিন্দের সৈন্যরা আসছে। তাই যদি সত্যি হয় তবে কোচওয়ান দু’জনকে পাঠিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা কর। যোগাযোগ হয়ে গেলে পরবর্তী কাজ লড়াই শুরু হলে করা যাবে।
আমি কিন্তু সকলকেই সতর্ক করে দিয়েছি। আমাদের কি করতে হবে তাও বলে দিয়েছি–বললো এক পুরুষ।
তুমি কাজের লোক। এজন্যই তো আমি তোমাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসি। আমি তো তোমারই। ও তো শুধু নামের স্বামী আসল স্বামী তুমি। বললো সেই নারী।
এসময় কারো পায়ের শব্দ শোনে পুরুষটি একটু দূরে সরে গেল। আম্বরীও তার জায়গা থেকে কয়েক কদম পিছিয়ে এলো। কিন্তু নারীটিকে চেনার জন্য সে কোন দিকে যায় সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখল আম্বরী। যে দিকে মহিলাদের তাঁবু ছিল সেদিকেই মহিলাটি আসছিল। নিজেকে আড়াল করার জন্যে আম্বরী একটি ঝোঁপের আড়ালে বসে পড়ল। মহিলা যখন কাছাকাছি এলো, তখন আম্বরী বসা থেকে এমনভাবে দাঁড়াল যাতে মনে হয়, সে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে এসেছিল। মহিলাকে দেখে আম্বরী হতবাক!
