সবাইকে নিয়ে নদী পার হলেন প্রধান সেনাপতি। আগত কমান্ডার তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আলতাঈ যখন চারটি ইউনিট নিয়ে তবু পল্লীর দিকে অগ্রসর হলেন, তখন অধিকাংশ তাঁবুতে আগুন জ্বলছে। গোটা শিবির জুড়ে চলছে দৌড় ঝাঁপ আর চেঁচামেচি। আগুন দেখে আতংকিত হয়ে ঘোড়াগুলো এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছে।
অবস্থা দেখে প্রধান সেনাপতি আলতাঈ তার অশ্বারোহী ইউনিটকে গোটা তাঁবু ঘিরে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। শত্রুবাহিনীর অবস্থা তখন খুবই বেসামাল। তাদের আত্মরক্ষার জন্যে পালানো ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না। লাহোরের সৈন্যরা যে যার মতো করে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কোন উট ঘোড়াই তাদের নাগালের মধ্যে ছিল না। ফলে দৌড়ে পালাতে গিয়ে লাহোরের সৈন্যরা গয়নী সেনাদের ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হতে লাগল। যারা প্রতিরোধের চেষ্টা করলো তারা কাটা পড়ল, আর যাদের সামনে পালানো ও প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থাই ছিল না, তারা কোন কিছুর আড়ালে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করতে লাগল।
লাহোরের সৈন্যরা যেহেতু পলায়নপর ছিল এজন্য দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করছিল। আর এদের ধাওয়া করছিল গযনীর সৈন্যরা। কিন্তু রাতের অন্ধকারে একেকজন সৈন্যের পিছু ধাওয়া করে বেশী দূর অগ্রসর হওয়া ঠিক হবে না বলে আলতাঈ সবাইকে সতর্ক করে দিলেন। সংবাদবাহী সৈন্যদের বললেন, সবাইকে বলে দাও, তারা যেন কারো পিছু ধাওয়া না করে। তাঁবুর আশপাশে থেকে লড়াই করে। এভাবেই কেটে গেল রাত ।
সকাল বেলায় সূর্য উঠার পর দেখা গেল তাঁবু এলাকার ভয়াবহ দৃশ্য। জায়গায় জায়গায় অর্ধদগ্ধ সৈনিক, নিহতদের স্তূপ আর আহতদের কাতরানোর করুণ অবস্থা। অনেক হিন্দু সৈনিক ভয় ও আতংকে হত বিহ্বল হয়ে ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে আং মরার মতো পড়েছিল। পালানোর সাহস পাচ্ছিল না। ভোরের আলোয় এরা মুসলিম সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লো। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সেনাপতি আলতাঈ নিশ্চিত জানতে পারলেন, এরাই হলো সেই লাহোরের সেনাবাহিনী। রাতের বেলায় মহারাজা তরলোচনপালও এদের সাথেই ছিল। কিন্তু মুসলমানদের আক্রমণ টের পেয়ে সেনাপতি ও তরলোচনপাল পালিয়ে যায়।
আগের দিন বিকেলেই লাহোরের এই সেনারা এখানে এসেছিল। এদের নিয়েই বেশী চিন্তিত ছিলেন সুলতান। অবশ্য ধৃত কোন হিন্দু সৈনিক তাদের এখানে নিয়ে আসার কোন কারণ বলতে পারেনি। তবে সৈনিকরা কিছু বলতে না পারলেও গযনী বাহিনীর এতো কাছাকাছি অবস্থান নেয়া থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছিল, সুলতান মাহমূদ যদি কারো সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তেন তাহলে তরলোচনপাল পেছন দিক থেকে গযনী বাহিনীকে আক্রমণ করতো।
রাজা তরলোচনপাল ও তার ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তাদের কাউকে তাঁবুতে পাওয়া যায়নি। লাহোর বাহিনীর কর্মকর্তারা শুধু পালিয়ে যায়নি, ছেড়ে গেছে সকল সেনা আসবাবপত্র, ঘোড়ার গাড়ি। সবই আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। এবং সৈন্যরা হয় কাটা পড়েছে নয়তো ধরা পড়েছে কিংবা আহত হয়েছে। ফলে লাহোর বাহিনীর পক্ষ থেকে আর কোনপ্রকার আক্রমণের আশংকা রইলো না।
এক ইংরেজ ঐতিহাসিক তৎকালের মুসলিম ঐতিহাসিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, তরলোচনপাল রামগঙ্গা নামের একটি খরস্রোতা নদীর ওপাড়ে অবস্থান নিয়ে ছিলো।
এটি ছিল সুলতানের আট সৈনিকের একটি যুগান্তকারী বীরত্বপূর্ণ ঘটনা। মাত্র আটজন যোদ্ধা প্রায় বিশ হাজার সৈন্যের শিবিরে অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলো। যা ছিল বিশাল এক তাঁবুপল্লী। সুলতান মাহমূদ এই আট যোদ্ধাকে পরদিনই বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করলেন। কারণ, এই আটজনের ঝটিকা আক্রমনের পেছনে কোন উধ্বর্তন সেনা কর্মকর্তার নির্দেশনা ছিলো না। তারা স্বউদ্যোগেই এমনটি করেছিল। ঝটিকা আক্রমনের বিস্তারিত বর্ণনা সেই সময়কার ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে এভাবে লেখা হয়েছে–
কমান্ডাররা বললো, সুলতান প্রায়ই লাহোরের সৈন্যদের ব্যাপারটি আলোচনা করতেন। লাহোর বাহিনীকে তিনি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছিলেন। তা ছাড়া রাড়ীতে হিন্দুরা গযনীর সেনা কমান্ডার ও কর্মকর্তাদের হত্যা করেছে। এ নিয়ে সুলতান খুবই বিচলিত ছিলেন। রাজা তরলোচনপালের প্রতি সুলতান ছিলেন খুবই রাগান্বিত। মৈত্রী চুক্তি থাকার পরও সে অন্য হিন্দু রাজাদের গযনীর বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছে এবং পেছন দিক থেকে গযনী বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্যে তার সেনাদেরকে লুকিয়ে রেখেছে।
ঘটনাক্রমে সেই দিন সন্ধ্যায় গযনীর এক গোয়েন্দা নদী পার হয়ে এপাড়ে উঠছিল। সে সময় এক কমান্ডার নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছিল। কমান্ডার ছিল গোয়েন্দার পরিচিত। ফলে বন্ধুকে পেয়ে সে আনন্দ চিত্তেই বলে দিল বহু প্রত্যাশিত একটি কাজ আমি করে এসেছি। দীর্ঘ দিন অনুসন্ধানের পর আজ আমি লাহোরের সেনা শিবির দেখে এসেছি।
একথা শুনে কমান্ডার আবেগে উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সে কথাটি তার তিন সহকর্মী কমান্ডারকে জানালো। তারাও মনের মধ্যে বিরাট উত্তেজনা অনুভব করলো এবং অভিযানের জন্যে তৈরী হয়ে গেল। বিষয়টি এদের পাশে থাকা চার সৈনিক শুনে তারাও সহযাত্রী হতে উৎসাহী হলো। ফলে তৈরী হয়ে গেল আটজনের কাফেলা। কোন উপায় না পেয়ে উধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে পানির থলের মধ্যে বাতাস ভরে তাতে ভর করে নদী পেরিয়ে গেল তারা। এরাই সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দাকে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে উজ্জীবিত করলো। ফলে সেই কমান্ডার ও সেনারা একাকার হয়ে সুলতানের কাছে খবর না পৌঁছিয়েই ঝটিকা অভিযানে বেরিয়ে পড়লো।
