আসল যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি। সুলতানের কাছে অনবরত রাজা গোবিন্দ ও রাজা অর্জুনের সেনাদের খবরাখবর আসছিল। সুলতান মাহমুদ ভাবছিলেন কিভাবে এদের মোকাবেলা করবেন। এক সাথে উভয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বেন,
দুই বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করবেন।
সুলতান যখন এমন চিন্তায় বিভোর তখন প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ সুলতানের উদ্দেশ্যে বললেন– সম্মানিত সুলতান! লাহোরের সেনাদের অবস্থান জানা যায়নি। আশংকা কিন্তু এদের থেকেই বেশী। হতে পারে এরা পেছন থেকে আমাদের উপর হামলা করবে।
সুলতান মাহমূদও প্রধান সেনাপতির মধ্যে যখন এসব কথা হচ্ছিল, তখন হঠাৎ গযনী সেনাদের মধ্যে শোরগোল দেখা দিল। সুলতান মাহমূদ দ্রুত তাঁবু থেকে বেরিয়ে নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে বললেন, দ্রুত গিয়ে শোরগোলের কারণ জেনে এসো।
নিরাপত্তারক্ষীরা ঘুরে এসে যে খবর দিলো তাতে বেশ অবাক হলেন সুলতান। নিরাপত্তারক্ষীরা জানালো, চার কমান্ডার ও চার সৈনিক চামড়ার থলের মধ্যে হাওয়া ভরে এগুলোতে ভর করে নদী পারাপারের জন্যে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে এবং নদী পেরিয়ে গেছে।
সুলতান ও প্রধান সেনাপতি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এই আট সেনা হয়তো পালিয়ে গেছে এবং এরা গিয়ে শত্রু বাহিনীতে যোগ দিবে। এদেরকে পিছু ধাওয়ার ব্যাপারটি সহজ ছিলো না। তবুও কয়েকজন সাহসী যোদ্ধাকে নির্দেশ দেয়া হলো, তারাও যেনো পানির থলের মধ্যে হাওয়া ভরে নদী পেরিয়ে ওদেরকে পাকড়াও করতে চেষ্টা করে। যদি সাহায্যের দরকার হয় তবে যেনো সংকেত দেয়। যাতে আরো সহযোগী পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়।
একে তো শীতের মওসুম, তদুপরী রাতের অন্ধকার। সেই সাথে বরফ শীতল ঠাণ্ডা পানি। রাতের অন্ধকারে ঠাণ্ডা পানিতে সাঁতার কাটা সহজ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা করে বারো তেরোজন সৈনিক স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে পানির থলিতে হাওয়া ভরে ততোক্ষণে নদীতে নেমে পড়েছে। শীত মওসুম হওয়ার কারণে নদীতে পানি কম ছিল এবং শ্রোতের তীব্রতাও বেশী ছিল না। দশ বারোজনের কাফেলা যখন নদীতে নেমে গেলো, তখন নদীর তীরে আবারো শোরগোল শোনা গেল। সেই সাথে নদীর ওপারে দেখা গেল আগুনের কুণ্ডলী। দেখে মনে হলো কোন বসতীতে আগুন লেগেছে।
অবস্থা দেখে প্রধান সেনাপতি নদীর তীরবর্তী লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, যারা প্রথমে নদী পার হয়েছে এরা কারা? তাকে তাদের নাম পরিচয় জানানো হলো। শুনে প্রধান সেনাপতি বললেন– মুহতারাম সুলতান! যারা প্রথমে নদী পার হয়েছে এরা পালিয়ে যাওয়ার লোক নয়। এদেরকে আমি ভালোভাবেই জানি, খুবই আবেগপ্রবণ। নিশ্চয়ই এরা শত্রুপক্ষের কোন তাঁবুতে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়েছে। আমাকে অনুমতি দিন, আমি দু’টি ইউনিট নিয়ে ওপাড়ে চলে যাই।
কিন্তু যাওয়ার আগে তো জানা দরকার ওখানে কারা আছে এবং কি অবস্থায় আছে? বললেন সুলতান। সেনা ইউনিট তুমি প্রস্তুত রাখতে পারো, যে কোন সময় কাজে লাগতে পারে।
এদিকে নদীর ওপাড়ের শোরগোল ক্রমশ বাড়তে থাকলো। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থলটি ছিল প্রায় তিন মাইল দূরে। সেখানকার শোরগোলের আওয়াজ কিছুটা এখানেও শোনা যাচ্ছিল। কারণ, রাতের পরিবেশ ছিল অনেকটাই শান্ত।
এভাবে কিছুটা সময় কাটার পর এক অশ্বারোহীকে নদীর পানি চিড়ে এ পাড়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেলো। লোকটি যখন এপাড়ে উঠে এলো তখন দেখা গেলো গযনী বাহিনীর যে চারজন নদী পেরিয়ে গিয়েছিল সে তাদেরই একজন। লোকটি ঘোড়ার পিঠের উপর বসে নদী পার হলো। লোকটি নদীর মাঝখানে থাকতেই চিৎকার করে বলছিল, সুলতান কোথায়? প্রধান সেনাপতি কোথায়? সবাই হামলার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও। আগত এই সৈনিকের চিৎকারে ছিল চরম উত্তেজনা।
তীরে দাঁড়ানো লোকেরা সেই সৈনিককে থামিয়ে দিল। সুলতান ও প্রধান সেনাপতি আগে থেকেই নদীর তীরে ছিলেন। সৈনিককে যখন সুলতানের সামনে হাজির করা হলো, তখন জানা গেল, সে গযনী বাহিনীর একজন কমান্ডার। সে সুলতানকে যা জানলো, তা কিছুতেই সুলতানের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না।
আগন্তুক কমান্ডার জানালো গযনী বাহিনীর এক গোয়েন্দা সন্ধার পর এসে তাকে খবর দেয়, নদীর ওপাড় থেকে মাইল তিনেক দূরে লাহোরের সৈন্যরা তাঁবু ফেলেছে এবং তারা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। একথা শুনে সে তার সঙ্গী আরো তিন কমাণ্ডারকে সাথে নিয়ে ওপাড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের এই পরিকল্পনার কথা শোনে আবেগপ্রবণ আরো কিছু সৈনিকও তাদের সহগামী হলো। সবাই মিলে পানির থলের মধ্যে বাতাস ভরে নদী পেরিয়ে শত্রুবাহিনীর তাঁবুতে চলে গেল। সংবাদবাহী গোয়েন্দাকে তারা গাইড হিসেবে সাথেই নিয়ে গেল। তারা সবাই শত্রুবাহিনীর তাঁবুতে গিয়ে ঝটিকা আক্রমণ চালালো।
আবেগ ও উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা এই কমান্ডার অতি সংক্ষেপে তাদের অভিযানের কথা জানিয়ে সুলতানকে বললো, বেশী কিছু চিন্তা করার দরকার নেই সুলতান! আপনি সৈন্যদের নিয়ে চলুন, শত্রুকে পরাজিত করার এটাই মোক্ষম সময়।
একথা শুনে আগে থেকেই দু’টি সেনা ইউনিটকে নিয়ে প্রস্তুত থাকা প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈকে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিলেন সুলতান। কমান্ডারের নির্দেশে আলতাঈর সহযাত্রী সৈন্যদের সংখ্যা বাড়ানো হলো। সহযোগী হলো আরো দু’টি অশ্বারোহী ইউনিট।
