হিন্দু নারীরা তাদের সখের অলংকারাদি পুরোহিতদের হাতে সপে দিয়েছিল, যুদ্ধ তহবিলের ঘাটতি কমাতে। হিন্দু পুরোহিত ঠাকুরেরা সমাজে প্রচার চালাচ্ছিল মুসলমানদের পরাজিত করতে জীবন-সম্পদ উৎস না করলে হিন্দু জাতি দেবদেবীদের অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাবে।
পুরোহিত ঠাকুররা যা বলে তা আসলে কতটুকু বাস্তব? সাধারণ হিন্দুরা এ ব্যাপারে কখনো প্রশ্ন তুনে । হিন্দুরা এ ব্যাপারটিও যাচাই করে দেখার প্রয়োজনবোধ করেনি সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তান আক্রমণের প্রথম দিনেই একদল হিন্দুর সামনে কয়েকটি মূর্তিকে টুকরো টুকরো করে বলেছিলেন– এই দেখো তোমাদের দেবতার অবস্থা! সত্যিই যদি এদের কোন শক্তি থাকে তাহলে এদের বলো, আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে। আমরা যে এদের অপমান করছি এজন্য আমাদের শাস্তি দিতে।
* * *
১০০১ সালে, প্রায় বিশ বছর আগে সুলতান মাহমুদ প্রথম হিন্দুস্তানে মূর্তি ভেঙেছিলেন। এরপর তিনি একে একে মথুরা থানেশ্বর মহাবন কন্নৌজের হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরগুলো ধ্বংস করে এগুলোর টুকরো রাস্তায় ফেলে উপর দিয়ে সেনাবাহিনীর ঘোড় চালিয়ে দেন। হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল এই মূর্তিরূপী দেবদেবীরাই ভারতের সুখ সমৃদ্ধির নিয়ামক।
এসব দেবদেবীদের মূর্তি না থাকলে কোন হিন্দুর অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু বিগত বিশ বছর ধরে একের পর এক মন্দির ও মূর্তি ধ্বংস করে, হরেকৃষ্ণ হরিদেব এবং দশহাত বিশিষ্ট সরস্বতীর ধ্বংসযজ্ঞের পরও এ পর্যন্ত কোন মুসলমানের কিছুই হলো না। দেবদেবীরা কোনই প্রতিকার কিংবা মুসলমানদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারলো না। এর পরও কুসংস্কার ও কল্পনাবিলাসী হিন্দু জাতিকে চরম ধোকাবাজ ঠাকুর ও পুরোহিতেরা অন্ধত্বের এমন গ্যাড়াকলে বেঁধে রাখলো যে, হিন্দুরা একটু জোরে বাতাস প্রবাহিত হলেও হাত জোড় করে ভজনা করতে শুরু করে। আর ভাবতে থাকে, এটাই বুঝি দেবদেবীদের ক্রোধ। এরা এমনই অন্ধ ছিল যে, এসব মূর্তির পূজা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে ঘরের সকল ধন-সম্পদ অকাতরে ঠাকুরদের হাতে তোলে দিয়েই ক্ষান্ত হতো না, নিজেদের কুমারী মেয়েদেরকে নরবলি দেয়ার জন্যে পুরোহিদের হাতে তোলে দিতো। আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে গযনীর মুসলমানদের প্রতি তৎকালীন ভারতের হিন্দুদের যে ক্ষোভ, হিংসা ও শত্রুতার মনোভাব ছিলো হিন্দুদের প্রতি মুসলমানদের তেমন হিংসাত্মক মনোভাব ছিলো না।
সুলতান মাহমুদের এবারের ভারত অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে সুলতান মাহমূদকে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্যে হিন্দুস্তানের সকল রাজা, মহারাজা এবং বিজিত এলাকার সকল হিন্দু প্রজা এক কাতারে শামিল হয়ে মুসলমানদের পরাজিত করতে ধন-জন এবং জীবন উৎসর্গ করার ঘোষণা দিলো। যে সব পুরুষ অশ্বচালনা, তীরন্দাজী, তরবারী চালনা ও বল্লম চালাতে জানতো তারা সবাই সেনাবাহিনীতে যোগ দিলো। অবস্থা এমন হলো যে, যুবতী মেয়েরা পর্যন্ত মুসলমানদের মোকাবেলায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্যে তৈরী হয়ে গেলো। মন্দিরের ঘণ্টা অনবরত বাজতে থাকলো এবং মন্দিরের শিংগা ভয়ংকর শব্দে চিৎকার করতে লাগলো।
দৃশ্যত গযনীর সৈন্যদের ব্যাপারে সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু রাজপুতদের মধ্যে ততটা আতংক ছিলো না।
রাজপুতেরা হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুদের ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং গযনী বাহিনীকে ঠেকাতে জীবন বিলিয়ে দেয়াটাকে অতি স্বাভাবিক ব্যাপার মনে করতো। রাজপুতনা হিন্দুদের মধ্যে তখন বিরাজ করছিলো জীবন দেয়ার উন্মাদনা। এই যুদ্ধ উন্মাদ স্বেচ্ছাসেবীরা গযনী বাহিনীর সামনে পাহাড়ের মতো প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালো।
তিন মহারাজার সম্মিলিত বাহিনীতে ছিল এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার পদাতিক সেনা, ছত্রিশ হাজার অশ্বারোহী এবং ছয়শ বিয়াল্লিশটি জঙ্গি হাতি।
পেশোয়র অতিক্রম করার পর থেকেই সুলতান মাহমুদের কাছে নিয়মিত খবর আসছিল হিন্দুদের যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে। গোয়েন্দারা জানিয়ে দিয়েছিল গযনী বাহিনীর তুলনায় শত্রু বাহিনীর সংখ্যা তিনগুণেরও বেশী। আরো খবর আসছিল হিন্দু সেনারা কোথায় কোথায় অবস্থান নিয়েছে।
সুলতান মাহমূদ তার সেনাদল নিয়ে চন্নাব নদী পার হচ্ছিলেন। ঠিক এই সময় খবর এলো, রাড়ীতে লক্ষণপালের সেনারা মুসলমান কর্মকর্তা ও কমাণ্ডারদের বন্দি করে রেখেছে। কনৌজ দুর্গও অবরুদ্ধ হওয়ার আশংকা আছে।
ঠিক এর পর পরই খবর এলো, কনৌজ অবরোধের সম্ভাবনা নেই। কারণ, মহারাজা অৰ্জুনও মহারাজা গোবিন্দ বিপুল জনশক্তির বলে খোলা ময়দানেই গযনী বাহিনীর মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। এক গোয়েন্দাকে সুলতান জিজ্ঞেস করলেন, লাহোরের সৈন্যরা কোথায় আছে?
যমুনার তীরবর্তী কোন ঘন জঙ্গলে–জবাব দিল গোয়েন্দা। লাহোরের সৈন্যরা ঠিক কোথায় তাঁবু ফেলেছে তা জানা সম্ভব হয়নি সুলতান! তবে জানার চেষ্টা অব্যাহত আছে। লাহোরের সেনাদের বিষয়টিই বেশী ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এরা কোন দিক থেকে কিভাবে হামলা করবে এখনো বোঝা যাচ্ছে না।
ঠিকই বলেছো তুমি–গোয়েন্দাকে বললেন সুলতান। এদের বিষয়টি আমাকে খুব ভাবনায় ফেলেছে। আমি এদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই।
তৎকালীন কয়েকটি ইতিহাসগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে ইংরেজ ঐতিহাসিক স্মিত লিখেছেন– রাড়ীতে গযনীর কর্মকর্তারা বন্দি হয়েছে– এ খবর পাওয়ার পর পাঁচটি নদী পাড়ি দিয়ে দুই দিনের মধ্যে সুলতান মাহমূদ রাড়ী এলাকায় পৌঁছে গেলেন এবং কোন বিশ্রাম না নিয়েই রাড়ী আক্রমণ করলেন। আক্রমণের সাথে সাথে সুলতানের কাছে খবর এলো, মুসলিম সৈন্য ও কর্মকর্তাদেরকে হিন্দুরা হত্যা করেছে। একথা শুনে সুলতান রাড়ীকে সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তাই ঘটলো। রাড়ীতে যে হিন্দুবাহিনী ছিলো এদের পক্ষে প্রাথমিক আক্রমণ সামলানোও সম্ভব হলো না। রাড়ীকে এভাবে ধ্বংস করে দেয়া হলো যে, সেখানে সকল বাড়ি ঘর ভেঙে ফেলা হলো। মন্দিরগুলোকে সম্পূর্ণ ভেঙে চুড়ে ধ্বংসাবশেষও নদীতে নিক্ষেপ করা হলো।
