শিক্ষণীয় ব্যাপার হলো, কোন নারী যদি কোন পুরুষের মধ্যকার পৌরুষ ও হিংস্রাতাকে উস্কে দিতে চায় তা সহজেই পারে। কেননা, একজন পুরুষের পৌরুষ, সাহস ও শক্তিকে যখন কোন নারী প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় তখন পুরুষ মাত্রই সেটিকে অপমানজনক মনে করে এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠে। সেলজুকীদের ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটলো। খুব সহজেই ইহুদীদের ক্রীড়নক দুই সুন্দরী তরুণী তাদের রূপ সৌন্দর্য ও বাক চাতুর্যের ফাঁদে ফেলে সেলজুকীদের গযনী বাহিনীর জন্যে আত্মঘাতি যোদ্ধায় পরিণত করলো ।
১০২০ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্ম মৌসুমে সুলতান মাহমূদ যখন পুনর্বার হিন্দুস্তান অভিযানে রওয়ানা হলেন, তার সেনাবাহিনী পরিচয়েই তার কাফেলার অংশ হয়ে গেলো গযনী বাহিনীর চরম শত্রু সেলজুকী কুচক্রী। এদের সহযোগী হিসেবে আত্মপরিচয় গোপনকারী কয়েকজন হিন্দুও রওয়ানা হলো কোচওয়ান ও কমান্ডারদের একান্ত সেবকের বেশ ধারণ করে।
এসব হিন্দু ছিল গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী গোড়া হিন্দু পরিবারের লোক। এদেরকে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেয়া হলো, কখন তাদেরকে কি ভূমিকা পালন করতে হবে।
গযনীর সৈন্যরা যখন হিন্দুস্তানের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করল, তখন এই হিন্দুদের অবস্থা হলো অনেকটা পানি থেকে তুলে নেয়া মাছকে পানীতে পুনর্বার ছেড়ে দেয়ার মতো। হিন্দুস্তানের মাটি মানুষের গন্ধে এরা যেন প্রাণ ফিরে পেলো। তাদের দেমাগ তখন আরো বেশী সক্রিয় ও সতর্ক হয়ে গেলো এবং নিজেদেরকে তারা হিন্দুত্ববাদ রক্ষার অতন্ত্র প্রহরী ভাবতে শুরু করলো। যে কোন মূল্যে সেলজুকীদের দিয়ে সুলতান মাহমুদকে ধ্বংস করার বিষয়ে তারা হয়ে উঠলো ঘরের শত্রুবিভীষণ।
* * *
এদিকে হিন্দুস্তানের অবস্থা খুব দ্রুত গযনী সরকারের প্রতিকূলে চলে যাচ্ছিল। রাড়ীতে মহারাজা রাজ্যপাল এক বিভ্রান্ত তরুণীর হাতে নির্মমভাবে খুন হয়। এই খুনের নেপথ্য শক্তি ছিল তিন হিন্দু রাজার চক্রান্ত। রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণপাল ছিল অন্যান্য হিন্দু রাজাদের সহযোগী। কিন্তু রাড়ীর হিন্দু সৈন্যরা ছিল গযনী সরকারের নিয়োগকৃত কমান্ডারদের আজ্ঞাবহ। তাদের পূর্বানুমতি ছাড়া রাড়ীতে রাজ্যপালের এবং তার সেনাদের কোন কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না। সর্বক্ষেত্রেই রাজ্যপালের প্রশাসনকে গয়নীর কমান্ডারদের কাছে জবাবদেহি করতে হতো। ফলে লক্ষণপালের পক্ষে হাত পা নাড়ানো ছাড়া কার্যত কোন কিছু ঘটানোর সুযোগ ছিল না।
কিন্তু সবসময় মুসলিম আধিপত্য খর্ব করে নিজেদের হারানো গৌরব ও জৌলুস ফিরে পাওয়ার চিন্তায় বিভোর থাকতো লক্ষণপাল।
চক্রান্তমূলকভাবে মহারাজা রাজ্যপাল নিহিত হওয়ার পর চক্রান্ত উন্মোচন করতে রাড়ীতে নিয়োজিত গমনী বাহিনীর লোকেরা চক্রান্তে জড়িত সন্দেহভাজনদের ধরপাকড় শুরু করলে এই ধরপাকড় বিদ্রোহে রূপ নিলো। কিন্তু ব্যাপক আকারের বিদ্রোহ দমনের মতো জনবল গযনী বাহিনীর হাতে ছিল না। কারণ, রাড়ীকে গযনীর নিয়ন্ত্রনণে রাখার জন্যে মাত্র কয়েকজন সেনা কমান্ডার এবং কর্মকর্তা ছিল।
রাজ্যপাল নিহতের পর ধরপাকড় শুরু হলে লক্ষণপাল তার পক্ষের সেনাদের অতি গোপনে প্রস্তুত করে ফেলে এবং রাতের বেলায় তার নিয়ন্ত্রিত সেনাদের দিয়ে গযনীর কর্মকর্তা ও সেনা কমান্ডারদের গ্রেফতার করে রাড়ীকে স্বাধীন ঘোষণা করে লক্ষণপাল নিজেকে স্বাধীন রাজা ঘোষণা করে। রাড়ীতে নিয়োজিত গযনীর সকল কমান্ডার কর্মকর্তা লক্ষণপালের সেনাদের হাতে গ্রেফতার হলেও কোনভাবে একজন সেনা কমান্ডার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সে দ্রুত কনৌজের দিকে পালাতে থাকে। কিন্তু কনৌজের পথে পূর্ব থেকেই হিন্দু সৈন্যরা অবস্থান নিয়েছিল। ফলে এই কমান্ডারও ধরা পড়ে। কনৌজ ও রাড়ীর মধ্যখানে যে সৈন্যরা অবস্থান নিয়েছিলো এরা ছিল তিন রাজ্যের সম্মিলিত সৈন্য।
কালাঞ্জরের রাজা গোবিন্দ, গোয়ালিয়রের রাজা অৰ্জুন, লাহোরের রাজা তরলোচনপালের সৈন্যরা ছাড়াও কনৌজের পরাজিত সৈন্যরাও তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। তা ছাড়া রাড়ীর কিছু সৈন্যও এদের সঙ্গে ছিল। মূলত একটি সম্মিলিত বাহিনী ও গণফৌজ তৈরী হয়েছিল গযনীর বিরুদ্ধে। তিন ক্ষমতাধর হিন্দু রাজার সৈন্যরা ছাড়াও বিপুল সংখ্যক যোদ্ধা ছিল স্বেচ্ছা সেবক হিসাবে। এরা হিন্দুত্ববাদ রক্ষা ও ক্রমবর্ধমান গযনী সালতানাতের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কোন ঐতিহাসিক এদের প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখ করতে পারেননি। শুধু এতটুকু বলেছেন, স্বেচ্ছাসেবীদের সংখ্যা ছিল সম্মিলিত তিন বাহিনীর সংখ্যার চেয়েও বেশি।
যে জাতির দেবালয় গুঁড়িয়ে দিয়ে দেবদেবীদের মূর্তিগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে রাস্তায় মিশিয়ে দিয়েছে গযনী বাহিনী, যে জাতির সবচেয়ে পবিত্র স্থান মথুরার হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মন্দির ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে মুসলমান সৈন্যরা, সেই জাতি স্বভাবতই মুসলমানদের ব্যাপারে নির্বিকার থাকার কথা নয়। নির্বিকার ছিল না তারা। মুসলমানদের হাতে পরাজিত হিঃ রাজা মহারাজা এবং এলাকার ছোট বড় প্রতিটি হিন্দু ভেতরে ভেতরে মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্যে তৈরী হচ্ছিল।
