আমরা তাদেরকে এই পরিমাণ ধন-সম্পদ দেবো, যা তারা জীবনে পাবে তো দূরের কথা কল্পনাও করতে পারে না। তাদের সবচেয়ে বেশী প্রাপ্তি হব, তারা গোলামীর জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের জন্ম ভূমিতে ফিরে যেতে পারবে। যুদ্ধের ময়দানে তোমরা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে যে, গোটা গযনী বাহিনী হিন্দুদের সহজ আক্রমণের শিকার হয়ে যায়।
তোমরা মাহমূদের যুদ্ধ কৌশল জানো– বললো আরেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। মাহমূদের আক্রমণ কৌশল অনেক জায়গা নিয়ে হয়ে থাকে। সম্মুখভাগে সে খুবই সামান্য সৈন্য রাখে। অধিকাংশ সৈন্যকে ডানে বামে ছড়িয়ে দিয়ে শত্রুপক্ষকে ডানে বামে এবং পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। মাহমূদ শত্রুপক্ষকে এগিয়ে আসতে বাধ্য করে। তার গেরিলা যোদ্ধারা রাতের বেলায়ও ৪ শত্রুপক্ষকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না।
এবার মাহমূদের যুদ্ধ কৌশলের প্রতি তোমরা সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। তার পরিকল্পনার কথা আগেই হিন্দুদের জানিয়ে দেবে। মাহমূদ যদি কোথাও ফাঁদ তৈরী করে তবে তা যথা সময়ে তোমরা হিন্দু বাহিনীকে জানিয়ে দেবে। তোমরা তো আগেই জানতে পারবে, এবার যে সেনাপতি তার সাথে যাচ্ছে, সে কতটুকু ঝানু ও অভিজ্ঞ।
তোমরা হয়তো জানো, আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ সুলতান মাহমূদের ডান হাত। ইতিহাসে আলতাঈর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ভবিষ্যতে মানুষ যখন মাহমূদের নাম উচ্চারণ করবে পাশাপাশি সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈর নামও স্মরণ করবে। যুদ্ধের ময়দানে যদি সুযোগ পাও, তাহলে আলতাঈকে খুন করে ফেলবে। হত্যার ক্ষেত্রে দূর থেকে তীর ব্যবহার করবে, তবে কিছুতেই যাতে ধরা না পড়ো। ধরা পড়লে কিন্তু আমাদের সব পরিকল্পনা ধুলিস্যাঁত হয়ে যাবে।
এজন্যই আমরা সুলতান মাহমূদের হত্যার ব্যাপারে কোন কথা বলি না –বললো দরবেশরূপী ব্যক্তি। কারণ, তাকে আমরা গযনী থেকে হাজারো মাইল দূরে হিন্দুস্তানের ভেতরে হিন্দুদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে চাই। আমরা চাই, গযনী বাহিনীর শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাক এবং বেঁচে থাকা গযনীর সকল সৈন্য হিন্দুদের হাতে বন্দি হোক আর চরম পরাজয়ের গ্লানী নিয়ে মাহমূদ হিন্দুদের হাতে গ্রেফতার হয়ে লাঞ্চনার শিকার হোক। তোমরা কি জানো, এমনটি ঘটাতে পারলে এরপর গযনীর রাজত্বের অধিকারী হবে। সেলজুকীরা? তোমরা কি অনুভব করতে পারো না, সেলজুকী একটি বিরাট শক্তি? দেখবে, বুখারা থেকে হিন্দুস্তান পর্যন্ত গোটা অঞ্চল সেলজুকী রাজত্বের আওতায় চলে আসবে। গভীর আবেগ ও উচ্ছ্বাসে বললো দরবেশ।
সেলজুকী রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তোমরাই হবে সেনাপতি ও ডেপুটি সেনাপতি– বললো আরেকজন। আমরা এমন দু’জন মেয়েকে তোমাদের স্ত্রী হিসেবে দিচ্ছি, এ ধরনের মেয়ে সাধারণত রাজা বাদশাদের ঘরে শোভা পায়। তা ছাড়া তোমাদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে বিপুল ধন-সম্পদ।
প্রথমত কমান্ডার রজব ভাই ও তার সঙ্গীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ উস্কে দেয়া হলো। এরপর গয়নী সেনাদের হাতে সেলজুকীদের নিহত হওয়ার ঘটনাটিকে চরম নৃশংস কাহিনী বানিয়ে তাদেরকে গমনী বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হলো। সেই সাথে তাদের সামনে হাজির করা হলো দু’জন অপরূপ সুন্দরী যুবতী।
উপজাতি সেলজুকী বংশের কোন যুবকের পক্ষে এমন শিক্ষিত ও অভিজাত মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়টি কল্পনা করার সাধ্যও ছিলো না। সুন্দরী দুই যুবতাঁকে দেখে রজব ও তার সঙ্গীর চোখ ছানাবরা। তাদের সামনে এমন অর্থসম্পদ রাখা হলো যে এতো বিপুল সোনা দানা একত্রিত করার কথা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। সেই সাথে বিশাল সালতানাতে সেলজুকীদের সেনাপতি ও ডেপুটি সেনাপতি হওয়ার বিষয়টি কমাণ্ডার হিসেবে তাদের কাছে এতোটাই লোভনীয় ছিল যে, বিষয়টি তারা কেবল স্বপ্নে ভাবতে পারতো, কিন্তু কোন দিন বাস্তবে রূপলাভ করার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু সেলজুকী সালতানাত হলে এমন অধরা স্বপ্নই তাদের হাতের মুঠোয় ধরা দেবে এই ভাবনায় তারা উৎসাহী হয়ে উঠলো।
এর পরের ঘটনা খুবই দ্রুত ঘটতে শুরু করলো। ছুটি সংক্ষিপ্ত করে সুন্দরী স্ত্রী সাথে নিয়ে কমান্ডার রজব ভাই ও তার সঙ্গী কমান্ডার ফরীদ সেলজুকী গযনী সেনাবাহিনীতে ফিরে এলো। অল্পদিনের মধ্যেই তারা কর্মরত সেলজুকীদেরকে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে সুকৌশলে ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্ষম হলো। আসলে সেলজুকীদেরকে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার পেছনে কমান্ডার রজব ও ফরীদের চেয়ে তাদের স্ত্রী পরিচয়দানকারী ইহুদীদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুই সুন্দরীর ভূমিকাই ছিলো বেশী।
রজব ও ফরীদের স্ত্রী বাছাই করে করে একেক জন সেলজুকী সৈনিককে তাদের খালি ঘরে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসতো এবং তাদের রূপ সৌন্দর্যের ঝলক দেখিয়ে, নগদ সোনা দানা, ক্ষমতা ও জায়গা জমির লোভ দেখিয়ে সহজেই তাদের ফাঁদে আটকাতে সক্ষম হতো। দুই সুন্দরী সেলজুকী সৈন্যদের ডেকে সেলজুকীদের উপর, গযনী বাহিনীর জুলুম, অত্যাচার, গযনী বাহিনীর হাতে সেলজুকীদের নিহত হওয়ার ব্যাপারটি আবেগ, মমতা ও কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে উপস্থাপন করে প্রতিটি সেলজুকী সৈনিকের মনে জাতীয়তাবোধ উস্কে দিতে সক্ষম হয়। ফলে সেলজুক সৈনিকদের ইসলামী চেতনা বিলীন হয়ে সেখানে জন্ম নেয় প্রতিশোধ প্রতিহিংসা স্বজাতি হত্যা, বঞ্চনার প্রতিশোধ স্পৃহা আর স্বাধীন সেলজুকী সালতানাত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রতিটি সেলজুকীর রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়।
