আমি ছিলাম আমার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার মা প্রায়ই বলতেন, আল্লাহ যদি আমাকে একটি পুত্র দেন তবে তার হাতে আমি এসব ইসলাম দুশমনদের খতম করাবো। দুর্ভাগ্য যে, আমার কোন ভাই হয়নি। মায়ের সেই ইচ্ছা আমি পূরণ করতে না পারলে আমার বেঁচে থেকে কি লাভ? আমি স্ত্রী হিসেবে তোমার সঙ্গী হতে চাচ্ছি না। একজন নারী সৈনিক হিসেবে তোমার সাথে যেতে চাই। তুমি আমাকে নিতে না চাইলে আমি ঘোড়া চালাতে জানি, তীর নিক্ষেপে দক্ষ একথা তুমি জানো। তোমার নেয়ার অপেক্ষা না করে আমি নিজেই সেনাদের পিছু পিছু চলে যাবো। আমাকে একটা কিছু করতেই হবে ইয়াজদানী! আমাকে সেটা করতে দাও। নারী পুরুষের শক্তি। সে শক্তি নষ্ট করে ঘরে আবদ্ধ না রেখে একে সক্রিয় রাখো। হয়তো বা সময়ে কাজে লাগতে পারে।
অবশেষে আম্বরীও হিন্দুস্তানী কাফেলার সঙ্গী হলো। কাফেলার বিস্তৃতি ছিল দুই মাইলের চেয়ে দীর্ঘ। রসদপ্রত্রবাহী ঘোড়ার গাড়ীর দীর্ঘ সারির আগে সৈন্যরা, আর এর পিছনে পালকীতে মহিলারা।
দুর্ভাগ্য বশতঃ একই কাফেলার সহযাত্রী ছিল প্রাণঘাতি কতিপয় শত্রু। এই অজ্ঞাত পরিচয় শত্রু ছিল গযনী বাহিনীর কতিপয় সেলজুকী সদস্য। এরা দীর্ঘ দিন ধরে গযনী বাহিনীতে কর্মরত। কখনো তাদের কোন কাজে সন্দেহ করার মতো কিছু ঘটেনি। তাদের বিশ্বস্ততা ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু এবারের সফরের কিছু দিন আগে এদের বিশ্বস্ততায় চির ধরে। ভেতরে ভেতরে এরা সাংঘাতিক বেঈমান হয়ে ওঠে। কিন্তু এই ব্যাপারটি ধরা পড়ার মতো কোন কর্মকান্ড কারো চোখে পড়েনি।
প্রায় বছর খানিক আগে রজব ভাই নামের এক সেলজুকী কমাণ্ডার একজন সেলজুকী মেয়েকে বিয়ে করে। তার মতো আরেক সৈনিকও একই সময় আরেক সেলজুকী মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। এই দুজনের বিয়ের পর ধীরে ধীরে সেলজুকী সৈন্যরা একটি জায়গায় বসবাসের স্থান করে নেয়।
কেউ জানতো না, এই দুই সেলজুকী সৈনিকের কাছে স্ত্রী পরিচয়ে দুই তরুণীকে পুরস্কার স্বরূপ পাঠানো হয়েছে। এরা পছন্দ করে তাদেরকে বিয়ে করে নিয়ে আসেনি।
একবার কমান্ডার রজব ভাই ও তার এক স্বগোত্রীয় সঙ্গী এক সাথে তাদের পরিবার পরিজনের সাথে ছুটি কাটাতে বুখারার পাহাড়ী এলাকায় গেল। ছুটিতে যাওয়ার পর সেলজুকী গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকেরা এবং একজন দরবেশ লেবাসধারী ব্যক্তি তাদের সাথে সাক্ষাত করতে এলো। সাক্ষাতে নানা কথাবার্তার পর দরবেশ কমান্ডার রজব ভাই ও তার সঙ্গীর সামনে গোত্রপ্রেমের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে সেলজুকীদের বিরুদ্ধে গযনী বাহিনীর লড়াই ও সেলজুকীদের নির্মমভাবে হত্যা করার বিষয়টি এমন জ্বালাময়ী ও হৃদয়বিদারক ভাষায় বর্ণনা করলো যে, স্বগোত্রীয় ভাইদের করুন মৃত্যুতে তাদের চোখে পানি এসে গেল এবং হত্যাকারী গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের রক্ত টগবগিয়ে উঠলো। কমান্ডার রজব ক্ষোভে দুঃখে বললো, সে আর গযনী বাহিনীতে ফিরে যাবে না।
না, না। তোমার এমনটি করা উচিত হবে না। এটা হবে কাপুরুষতা বললো দরবেশ ব্যক্তি। তোমাকে সেলজুকী ভাইদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্যেই তোমার গযনী বাহিনীতে থাকা উচিত।
এবার গিয়ে মাহমূদকে আমরা খুন করে ফেলবো- উত্তেজিত কণ্ঠে বললো কমান্ডার রজব ভাই।
তাতে তেমন কোন লাভ হবে না– বললো একজন নেতৃস্থানীয় লোক। তোমাদের কি করতে হবে সেটি আমরা তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি। তোমাদের গযনী বাহিনীতে যতো সেলজুকী আছে, অতি গোপনে সবাইকে তোমাদের দলে ভেড়াবে। তারা যখন নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে ও তোমাদের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে উঠবে তখন তোমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদেরকে জানাবে।
তোমরা প্রশিক্ষিত যোদ্ধা। যুদ্ধের ব্যাপারে তোমরাই অভিজ্ঞ। হিন্দুস্তানের যুদ্ধের ময়দানে সুলতান মাহমুদকে ধোকা দিতে হবে, তার সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিতে হবে। সুলতান মাহমদু থাকলো কি মরলো তাতে কিছু যায় আসে না।
মাহমূদ আগামী কিছু দিনের মধ্যেই হিন্দুস্তানে অভিযান চালাবে। সেই অভিযানে নিশ্চয়ই তোমরা থাকবে। তোমরা তখন হিন্দু বাহিনীর সাথে মিলে গযনী বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণ করে নিঃশেষ করে দিতে পার।
কিন্তু হিন্দুস্তানে গিয়ে আমরা হিন্দুদের সাথে কি ভাবে যোগাযোগ করবো? আমরা তো কেউ হিন্দুস্তানের ভাষা জানি না! উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো রজব ভাই।
সেই ব্যবস্থা তোমাদের নাগালের মধ্যেই আছে– বললো দরবেশরূপী ব্যক্তি। গয়নীতেও এই কাজের বহু লোক রয়েছে। এরা হলো সেই সব হিন্দু, যাদেরকে প্রতিটি যুদ্ধের পর গযনী বাহিনী পাকড়াও করে গযনী নিয়ে এসেছে। এদের বাছাই করে মাহমূদ দুটি সেনা ইউনিট গঠন করেছে। তাছাড়া বিপুল সংখ্যক হিন্দু সরকারের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছে। গ্রেফতারকৃত হিন্দুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে গযনীর বিত্তশালীরা দাস হিসাবে কিনে নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছে।
আমরা তোমাদেরকে এমন কয়েকজন হিন্দুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো, যারা তোমাদের ব্যক্তিগত কর্মচারী কিংবা কোচওয়ান হিসেবে সেনাবাহিনীর সাথেই থাকবে। এরা মুসলিম পরিচয় ধারণ করবে। কিন্তু বাস্তবে তারা নিষ্ঠাবান হিন্দু। এরাই হিন্দুস্তানে সব প্রয়োজনে তোমাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। এরা হিন্দু সেনাদের সাথে তোমাদের যোগাযোগ করিয়ে দেবে ।
