এ ব্যাপারে আর বেশী চিন্তা ভাবনার সুযোগ পেলোনা ওরা। উভয়ের কানে ভেসে এলো অশ্বখুড়ের আওয়াজ।
হয়তো আমাকে অনুসন্ধানকারী লোকেরা এসে গেছে–বললো আম্বরী।
ওই যে দেখো- দূরে ধাবমান তিনজন অশ্বারোহীর দিকে ইঙ্গিত করে আম্বরীর উদ্দেশে বললো ইয়াজদানী। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এরা এলিকখানের রাজকীয় বাহিনীর সৈন্য। তিন অশ্বারোহীকে এদিকে আসতে দেখে দ্রুত উভয়েই নিজ নিজ ঘোড়ায় সওয়ার হলো । ততোক্ষণে অনুসন্ধানী দল তাদের দেখে ফেলেছে এবং পাকড়াও করতে ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াজদানীকে দ্রুত ঘোড়া হাঁকানোর জন্যে তাড়া দিল আম্বরী। ধাবমান ঘোড়া থেকে তিনটি তীর ছুটে এসে দু’টি আম্বরীর ঘোড়াকে আঘাত করলো। ঘোড়াটি হঠাৎ হেষারব করে লাফিয়ে উঠলো।
পিছন ফিরে ইয়াজদানী দেখলো, আম্বরীর ধরা পড়া নিশ্চিত। সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আম্বরীর ঘোড়ার পাশে নিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে আম্বরীকে বললো তার ঘোড়ার উপর চলে আসতে। দক্ষ অশ্বারোহীর মতো আম্বরী ধাবমান অবস্থায়ই লাফ দিয়ে ইয়াজদানীর সামনে তার ঘোড়ায় চড়ে বসলো এবং নিজের ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিল। ততোক্ষণে পিছু ধাওয়াকারীদের দূরত্ব কমে গেছে।
ইয়াজদানী একহাতে আম্বরীকে ধরে অপর হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াকে এমন তীব্র গতিতে একে বেঁকে চালাতে লাগলো যে, পিছু ধাওয়াকারীদের সাথে তার দূরত্ব মুহূর্তের মধ্যে অনেকটা বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর একটি পাহাড়ের টিলা এসে গেল। ইয়াজদানী দ্রুত তার ঘোড়াটিকে পাহাড়ের ওপারে নিয়ে গেল। সেই সাথে সীমান্ত পেরিয় এলো ইয়াজদানী ।
ইয়াজদানী আম্বরীকে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে নিজের ভূখণ্ডে চলে আসার পর আর পিছু ধাওয়া করলো না খান সেনারা। তারা নিজ গন্তব্যে ফিরে গেল। ভাগ্যক্রমে গযনী সুলতানের এক শুভাকাঙ্খী গযনী বাহিনীর এক কমান্ডারের জীবন সঙ্গীনী হয়ে ইসলামের সেবা করার সুযোগ পেয়ে গেল। যা ছিল তার আশৈশব লালিত স্বপ্ন।
* * *
উমর ইয়াজদানী আর আম্বরীর বিয়ের ব্যাপারটি ছিল বছর খানিক পূর্বের ঘটনা। এই ঘটনার এক বছর পর সুলতান মাহমূদ পুনর্বার হিন্দুস্তান অভিযানে বের হলেন। এবার তার ইচ্ছা হিন্দুস্তানের কুচক্রী হিন্দু রাজাদের কোমর ভেঙে দিয়ে হিন্দুস্তানে পরিপূর্ণ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য তিনি সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক থেকে অফিসার পর্যন্ত সবাইকে অনুমতি দিয়েছিলেন তারা ইচ্ছা করলে এই অভিযানে তাদের স্ত্রী সন্তানদের সাথে নিয়ে যেতে পারে। তিনি হিন্দুস্তানে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করে সেখানে স্থায়ীভাবে কিছু সৈন্য রাখার জন্যে এই অনুমতি দিয়েছিলেন। এবার তার প্রধান টার্গেট ছিল লাহোর। অবশ্য অন্যান্য হিন্দু রাজাদেরও শক্তি নিঃশেষ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু লাহোরের ক্ষমতাসীন নতুন রাজা তরলোচনপাল বেশী বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। খবর এসেছে, রাজা তরলোচনপাল তার সেনাবাহিনী কনৌজ ও মথুরার মধ্যবর্তী কোন অজ্ঞাত জায়গায় নিয়ে গেছে এবং সে অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে সে অন্য হিন্দু রাজাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানার শক্তি সঞ্চয় করছে।
সুলতানের অনুমতি পেয়ে অনেক সৈনিক, কমান্ডার ও সেনাপতি তাদের স্ত্রী সন্তানদের সাথে নিয়ে রওয়ানা হলো। তখন ইয়াজদানী ছিল কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে। সীমান্তের চৌকি থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল । উমর ইয়াজদানীকে হিন্দুস্তান রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে শুনে তার স্ত্রী আম্বরীও সাথে যাওয়ার জন্যে বায়না ধরলো। ইয়াজদানী কিছুতেই আম্বরীকে সাথে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল না। কিন্তু আম্বরীর সবিনয় অনুরোধ ও উপযুপরী তাগাদা আর জেদের কাছে হার মেনে আম্বরীকে সাথে নিতে রাজি হলো ইয়াজদানী
আম্বরীর এই সফরে যাওয়ার বায়না ধরার মধ্যে যতোটা না স্বামীর সঙ্গ লাভের আকাঙ্ক্ষা ছিল তার চেয়ে বেশী ছিল জিহাদে অংশ গ্রহণের আবেগ। আম্বরী প্রায়ই ইয়াজদানীকে বলতো আল্লাহর প্রতি আমার খুব অভিমান হয়, আমাকে কেন নারী করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছে? নয়তো আমি তোমাদের মতো তরবারী হাতে নিয়ে বেঈমান দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে ধন্য হতে পারতাম। নারী হয়েও আমার আত্মা সব সময় জিহাদের ময়দানে ঘুরে বেড়ায়।
ওই কাফেরদেকেই তুমি শুধু দুশমন মনে করছো? এদের চেয়ে আরো ভয়ংকর দুশমন নিজ ধর্মের লেবাসধারীরা। কারণ কাফেরদেরকে সবাই চিনে। জানে যে এরা দুশমন। কিন্তু মুসলমান বেঈমানদের অনেকেই চিনে না। এরা মুসলিম পরিচয়ে দৃশ্যত সুহৃদ হয়ে পাশে থাকে, কিন্তু সুযোগ মতো পিঠে খঞ্জর বসিয়ে দিয়ে বলে আমি আঘাত করিনি। আমি তো তোমার ভাই! এ ব্যাপারটি তুমি ভালোই জানো। কারণ, খান্দানী ভাবেই তুমি ঈমান বিক্রেতা গোষ্ঠীর মেয়ে। কিন্তু আমি ভেবে অবাক হই, এমন খান্দানের হয়েও তুমি বেঈমানদের বিরুদ্ধে এতোটা ক্ষোভ কিভাবে পোষণ করো? বললো ইয়াজদানী।
শোন! আমার মা ছিলেন খাঁটি ঈমানদার গোষ্ঠীর মেয়ে। আমার বাবা ছিলেন খান রাজবংশের ছেলে। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমার মাকে জোর করে বিয়ে করেছিলেন। আমার মা জীবনেও খানদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করতে পারেননি। আমার জন্মের পর আমি যখন কিছুটা বুঝতে শিখেছি, তখনই আমার মা আমাকে বলতেন, মুসলমানদের লেবাসধারী এই এলিকখান গোষ্ঠী ইসলামের ভয়ংকর শত্রু। শৈশব থেকে মা আমাকে সুলতান মাহমুদের নানা গল্প শোনাতেন। সেই শৈশব থেকেই আমি সুলতান মাহমূদকে আমার আদর্শ বলে মনে করি এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করি।
