হ্যাঁ, আপনি?
গযনবী। আমি গযনী বাহিনীর একজন কমান্ডার। একটি হরিণকে তাড়া করে অনেক দূরে এসে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনার ঘোড়াকে চিতা বাঘে তাড়া করতে দেখে আমি এ পর্যন্ত এসে গেলাম।
আপনি কি জানেন? আপনার সীমান্ত থেকে আপনি অন্য রাজ্যের কতখানি ভেতরে চলে এসেছেন? মুচকি হেসে বললো তরুণী। আপনি এখন আমাদের সীমান্তের পাঁচ মাইল ভেতরে। আপনি আর আমি কিন্তু পরস্পর শত্রু।
হ্যাঁ শত্রু বটে, কিন্তু প্রধান শত্রু এলিকখান মারা গেছে। জীবিত অবস্থায়ই আমরা তার শক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছিলাম। আপনি খানদের কোন অংশের মেয়ে?
আমি শাহী খান্দানের মেয়ে। এলিকখান আমার চাচা ছিলেন। আমার নাম আম্বরী।
আচ্ছা, আপনি তাহলে শাহজাদী।
হ্যাঁ, শাহী বংশের মেয়ে বলেই আমরা একে অন্যের শত্রু।
একজন অপরিচিত তরুণীকে কোন কড়া কথা বলতে আমার ইচ্ছে করছে । তবে না বলেও পারছি না। শাহজাদী আম্বরী! আপনার বয়স তেমন হয়নি। এই বয়সে কে শত্রু কে বন্ধু, কার রাজনৈতিক কর্মকান্ড ঠিক, কারটি বেঠিক তা নির্ণয় করার মতো জ্ঞান আপনার হয়নি। আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি, সুলতান মাহমূদের প্রতি আপনাদের যে হিংসা ও শত্রুতা তা মন থেকে দূর করে দিন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে একথা শিক্ষা দিন যে, দু’জন মুসলমান একে অন্যের শত্রু হতে পারে না।
আমাকে আপনি শত্রু পক্ষের লোক মনে করবেন না কমান্ডার। আপনার এই উপদেশেরও আমার প্রয়োজন নেই। আপনি কি জানেন? সুলতান মাহমূদকে শত্রু জ্ঞান করি না বলে আমার খান্দানের লোকেরা আমাকে পাগল মনে করে। সত্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করি এবং ন্যায়পরায়ণ সত্যপন্থি সুলতান মাহমূদকে শ্রদ্ধা করি বলেই হয়তো আজ বাঘের আক্রমণ থেকে আমাকে বাঁচানোর জন্য এক শত্রু সেনা কমান্ডারকে আল্লাহ তাআলা সীমান্তের পাঁচ মাইল ভেতরে পাঠিয়ে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। হ্যায় আল্লাহ! আপনি না এলে এতোক্ষণে চিতাবাঘ আমাকে চিড়ে খেয়ে ফেলতো।
আমি আপনার শত্রুপক্ষের লোক। শত্রুপক্ষের লোক হওয়ার পরও আপনাদের সীমানায় অবৈধভাবে প্রবেশ করেছি। এখন আমার ব্যাপারে আপনার। সিদ্ধান্ত কি হবে? আমি কি আপনার বন্দি?
না, না। আপনি বন্দি হবেন কেন? আপনি আমার কাছে সম্মানিত অতিথি। বললো আম্বরী। আপনার যদি তাড়া থাকে তবে এখন চলে যেতে পারেন। আমাকে এক্ষুণি বাড়ি ফিরতে হবে। কারণ বাড়ি থেকে বেরিয়েছি অনেক্ষণ হয়েছে। বাড়ির লোকজন হয়তো আমাকে খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়েছে।
আম্বরী ও ইয়াজদানী একে অন্যের দিকে তাকাল। তাদের মধ্যে পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হলো। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে উভয়েই মুচকি হাসলো। এরপর ঘোড়ার দিক ঘুরিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে ইয়াজদানী বললো– খোদা হাফেয, শাহজাদী! ইয়াজদানীর ঘোড়া চলতে শুরু করেছিল। ঠিক সেই সময়ে ডেকে উঠলো আম্বরী।
দাঁড়ান! আগামীকাল কি আপনি এখানে আসতে পারবেন? আমি আগামী কাল এখানে আসবো।
আমাকে পাকড়াও করতে কতোজন লোক আসবে? জানতে চাইলো ইয়াজদানী।
একথা শুনে আম্বরীর মুখ থেকে হাসি উবে গেল। মলীন হয়ে গেল তার চেহারা।
আমার প্রতি এমন সন্দেহ করতে পারলেন আপনি? উদাস কণ্ঠে বললো আম্বরী। অবশ্য আমার পক্ষে আপনাকে নিশ্চয়তা দেয়ার কোন উপায় নেই। আমি আপনাকে ধোঁকা দেবো না একথা কিভাবে বুঝবো? তবে একথা জেনে রাখুন, আপনি চাইলে আমি আপনার চৌকিতেও হানা দিতে পারি ।
দুঃখিত, আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি একথা বলিনি। যাক, আমি কথা দিলাম, আগামীকাল আপনার জন্যে এখানে আসবো।
ইয়াজদানী আর কালক্ষেপণ না করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো। ঠায় দাঁড়িয়ে ইয়াজদানীর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলো আম্বরী।
ঝুঁকি নিলো ইয়াজদানী। পরদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আম্বরীকে যেখানে পেয়েছিল সেখানে এলো। আম্বরী আগে এসেই দাঁড়িয়ে ছিল। কুশল বিনিময়ের পর নিজ নিজ শখ, রুচি, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথাই অগ্রাধিকার পেলো। দীর্ঘ আলোচনায় তারা একে অন্যের আদর্শিক জীবনাদর্শে এতোটাই মুগ্ধ হলো যে, দুজনে মিলে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। এভাবে সীমান্ত পেরিয়ে শত্রু রাজ্যের ভেতরে গিয়ে আম্বরীর সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাত করতে লাগলো ইয়াজদানী ।
সপ্তম দিনের সাক্ষাতে ইয়াজদানী লক্ষ করলো, আম্বরীর মধ্যে আগের মতো এতোটা উৎফুল্ল ভাব নেই। তার চেহারা মলিন এবং বিব্রত। কিছুক্ষণ নীরব থেকে এক পর্যায়ে আম্বরী নিজে থেকেই বললো–
তোমার প্রতি ভালোবাসার টান আমাকে আজো এখানে নিয়ে এসেছে। অথচ এখন আমাদের উভয়ের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। গতকাল আমাকে রাজমহলের এক সেবিকা বলেছে, প্রতি দিন দীর্ঘ সময়ের জন্যে বাড়ির বাইরে থাকার ব্যাপারটি আমার প্রতি রাজমহলের সবার মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। তাই আজ থেকে আমার পেছনে গুপ্তচর লাগিয়ে দেয়া হতে পারে। এমন হলে কিন্তু আমাদের কারোরই প্রাণ বাঁচবে না। অবশ্য নিজের জীবনের ভ্রূক্ষেপ করি না আমি। কিন্তু তোমাকে নিয়েই আমার চিন্তা। একটু সতর্ক থেকো।
কেউ যদি আমাদের দেখে ফেলে তবে আমি আর রাজমহলে ফিরে যাবো না। যদি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, তোমার সাথেই চলে যাবো। তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে প্রস্তুত?
প্রতি দিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত্রু রাজ্যের ভেতরে এসে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করি কি ঠাট্টা করতে? কি মনে করো তুমি? দৃঢ় কণ্ঠে বললো ইয়াজদানী।
