সুলতানের এই নির্দেশের পর সীমান্ত চৌকিগুলোর শক্তি বাড়ানো হলো। টহল জোরদার করা হলো এবং সীমান্তের বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত গযনী সৈন্যদের টহলের নির্দেশ দেয়া হলো।
উমর ইয়াজদানী ছিল গযনী বাহিনীর একজন কমান্ডার। তিনটি সীমান্ত চৌকির দায়িত্ব ছিল তার উপর। উকেসাস ইয়াজদানীর কর্মক্ষেত্র। উকেসাস নদীর একেবারে তীরবর্তী একটি চৌকিতে থাকতো উমর ইয়াজদানী। উমর ইয়াজদানীর অধীনস্ত সেনাদের জন্যে সবসময় নদীর তীরে বাধা থাকতো একাধিক নৌকা। নৌকা করেও তারা ওপারের অবস্থা পর্যবেক্ষণে বের হতো। কমান্ডার হিসেবে ইয়াজদানী প্রায়ই একাকী ‘টহল দলের অবস্থা দেখার জন্যে বেরিয়ে পড়তো। যাচাই করতো টহল সেনারা ঠিকমতো কর্তব্য পালন করছে কি না।
একদিন টহল সেনাদের পর্যবেক্ষণে বের হয়ে উমর ইয়াজদানী দূর থেকে লক্ষ করলো, তার টহলদল ঠিক মতোই টহল দিচ্ছে। অশ্বারোহী টহলদল অবিরাম ঘোড়া হাঁকিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। উমর দেখলো, তার দৃষ্টিসীমার বাইরে ওরা গহীন অরণ্যে চলে গেছে। এটাই ছিল স্বাভাবিক। উমর তার অধীনস্থদের কাজে আশ্বস্ত হয়ে উল্টো দিকে ঘোড়া হাকাল।
উমর ছিল কমান্ডার। তার কাছে তীর ধনুক রাখার দরকার ছিল না। কিন্তু উমর এসবের ধার ধারে না। ঘর থেকে বের হলে তীর ধনুক, তরবারী তার সাথে থাকবেই। এগুলোকে একজন সৈনিকের সার্বক্ষণিক পোষাক মনে করে উমর। অফিসার ও সিপাহীর ভিন্নতায় বিশ্বাসী নয় উমর ইয়াজদানী।
সীমান্তের এই এলাকাটি ছিল শিকারে জন্যে উপযুক্ত জায়গা। এখানে দল বেঁধে হরিণ, খরগোশ, বনগরু বিচরণ করতো। উমর ইয়াজদানী হরিণ শিকারেও ছিল পটু। প্রায়ই একাকিই শিকার করে নিয়ে আসতো হরিণ খরগোশ ইত্যাদি।
সে দিন টহল সেনাদের গতিবিধি দেখে উল্টো দিকে রওয়ানা হতেই সামান্য দূরে তার চোখ পড়লো কয়েকটি হরিণের উপর। হরিণকে শিকার করতে হলে পেছন দিয়ে কিছুটা পথ ঘুরে অগ্রসর হয়ে আক্রমণ করতে হয়। কিন্তু হরিণগুলো হঠাৎ সেখান থেকে আরো দুরে সরে যেতে লাগল। উমর ইয়াজদানীর মনোযোগ নিবদ্ধ ছিলো হরিণের প্রতি। তার খেয়াল ছিলো না হরিণ তাড়া করে সে সীমানা থেকে কতোটুকু দূরে চলে এসেছে।
এক পর্যায়ে তার চোখে পড়লো পাহাড়ী এলাকা। হঠাৎ হরিণগুলো কান খাড়া করে উর্ধশ্বাসে দৌড়াতে লাগল। মনে হচ্ছে ওরা কোন শত্রুর উপস্থিতি টের পেয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উমর ইয়াজদানীর কানে ভেসে এলো ছুটন্ত অশ্বখুড়ের আওয়াজ। ধীরে ধীরে ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ আরো কাছে এগিয়ে এলো। উমর ইয়াজদানী ঘোড়া থামাল। চতুর্দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সে দেখতে পেলো, একটি ধাবমান অশ্বারোহী ডানে বামে তীর চালাচ্ছে আর তার ঘোড়াটি একে বেঁকে দৌড়াচ্ছে।
হঠাৎ ঘোড়াটি একদিকে ঘুরে গেলে উমর দেখলো, অশ্বরোহী একজন নারী এবং তাকে তাড়া করছে চারটি চিতা বাঘ। মহিলা তার ঘোড়াকে ডানে বামে ঘুরিয়ে চিতাগুলোর উপর তীর চালাচ্ছিল, কিন্তু কোন তীরই চিতাকে আঘাত করতে পারছিল না।
সেই অঞ্চলের চিতাবাঘের হিংস্রতা ছিল প্রবাদতুল্য। অন্যান্য বাঘের চেয়ে ওখানকার বাঘ ছিলো অনেক বেশী শক্তিশালী ও হিংস্র। বাঘের ভয়ে ঘোড়া উর্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছিল। কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতে ঘোড়াটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এ দিকে একটি মেয়ের পক্ষে চারটি চিতাবাঘের মোকাবেলা করা ছিল অসম্ভব। দৃশ্যত চিতাবাঘের আক্রমণ থেকে মেয়েটির বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে কাল বিলম্ব না করে ধনুকে তীর ভরে উমর ইয়াজদানী তার ঘোড়া চিতার পেছনে ছুটালো। ততোক্ষণে চিতা ও আক্রান্ত মেয়েটি অনেক দূর চলে গেছে। আর দুটি চিতা মেয়েটির দু’পাশ থেকে ঘোড়াকে আক্রমণ উদ্যত অবস্থায়।
উমর তার ঘোড়াকে ইশারা করতেই সেনাবাহিনীর তাজাম প্রশিক্ষিত ঘোড়া বাতাসের আগে ছুটতে লাগল। ততোক্ষণে একটি চিতা মেয়েটির ঘোড়ার গায়ে দু’একটি থাবা মেরে দিয়েছে। এমন নাজুক অবস্থায় তীর চালালে তীর লক্ষভ্রষ্ট হয়ে মেয়েটি আহত হতে পারে, এই আশংকায় তীর না চালিয়ে উমর ইয়াজদানী বিদ্যুৎবেগে মেয়ের ঘোড়াকে আক্রমণকারী একটি চিতার উপরে তার ঘোড়াটি তুলে দিলো। ঘোড়র পায়ে পিষ্ট হয়ে বাঘটি পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘোড়াকে ঘুরিয়ে ধাবমান ঘোড়া থেকে একটি চিতাকে লক্ষ করে তীর ছুড়ল । চিতা একটি আর্ত চিৎকার দিয়ে শিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উল্টো দিকে দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু বেশী দূর যেতে পারলো না, পড়ে গিয়ে ছটফট করতে লাগল।
অপর দুই চিতা সঙ্গী দু’জনের অবস্থা দেখে শিকার ত্যাগ করে জীবন নিয়ে পালালো। চিতার তাড়া না থাকলেও চিতার ভয়ে ভড়কে যাওয়া মেয়েটির ঘোড়া বেলাগাম হয়ে পড়েছিল। সে তখনো জীবনপণ দৌড়াচ্ছে, থামার নাম নেই। উমর ইয়াজদানী লাগামহীন হয়ে যাওয়া ঘোড়াটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যে তার ঘোড়াকে সেই ঘোড়ার পাশে চালিয়ে দিল। এবার সে দেখতে পেলো আরোহী বয়স্ক মহিলা নয়, একজন দারুন সুন্দরী তরুণী। চেহারা ছবি দেখে মনে হয় কোন শাহী খান্দানের মেয়ে।
উমর ইয়াজদানী তরুণীর ঘোড়াকে অতিক্রম করে থাবা দিয়ে ঘোড়ার লাগামটি হাতিয়ে নিয়ে ঘোড়াটিকে থামাতে চেষ্টা করল। বহু কষ্টে সে আতংকগ্রস্ত ঘোড়াটিকে থামাল। তবে আরোহী তরুণীকে মোটেও শংকিত মনে হলো না। হাপাচ্ছিল তরুণী। এভাবে জীবন বাঁচানোর জন্য উমর ইয়াজদানী ক্লান্ত কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা জানালো তরুণীকে। তরুণীর কণ্ঠ শোনে উমর ইয়াজদানী বললো– আচ্ছা! আপনি এলিকখানী?
