কারণ তরুণী দুজন ছিল পুরুষের মনে কামনা জাগানোর ব্যপারে পারদর্শী। কিভাবে কথা বলে, অঙ্গ-ভঙ্গি, চাহনী ও হাসি দিয়ে দৃষ্টি ও শরীর প্রদর্শন করে পুরুষের মনে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায়, এ ব্যাপারে এরা ছিল চারুণ পারঙ্গম।
দুই তরুণীর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর ইসরাঈল গা ঝাড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে পড়লো। তার মন থেকে পরাজয়ের গ্লানি দূর হয়ে গেল এবং সে ফিরে পেলো নতুন শক্তি, নতুন উদ্যম। দুই তরুণী ইসরাঈলের মধ্যে জাগিয়ে দিলো জীবনী শক্তি।
ডুবন্ত মানুষ খড়খুটোকে আঁকড়ে ধরেও বাঁচতে চেষ্টা করে। আর সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিতরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য গোপন চক্রান্ত শুরু করে। ইতিহাস সাক্ষী? বহু খ্যাতিমান বীর পুরুষ যাদেরকে সম্মুখ যুদ্ধে কেউ পরাজিত করতে পারেনি তাদেরকে নারীর ফাঁদে ফেলে অনায়াসে নিঃশেষ করা হয়েছে। বহু ক্ষমতাধর রাজা বাদশাকে নাকানী চুবানী খাইয়েছে নারী। আবার বহু নারী নিজেকে জলাঞ্জলী দিয়ে অধপতনের অতল থেকে উদ্ধার করেছে পতনমুখ রাজা বাদশাকে।
সম্মুখ যুদ্ধে বারবার পরাস্ত হওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে কুচক্রী এলিকখান সুলতান মাহমূদকে পরাস্ত করার জন্য ইহুদীদের শরনাপন্ন হয়। ইহুদীরা এলিকখানের পাঠানো দুই তরুণীকে দীর্ঘ দিন প্রশিক্ষণ-দেয়, কিভাবে নারী দেহ প্রদর্শন করে এবং নারীত্বের ছলাকলা দেখিয়ে পুরুষকে ফাঁদে ফেলতে হয়। কিভাবে নারীর ইজ্জত বিকিয়ে দিয়ে কাংখিত পুরুষকে ঘায়েল করতে হয়।
ইহুদীদের হাতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দুই মুসলিম তরুণী হতাশাগ্রস্থ সেলজুকী গোত্রপতি ইসরাঈলকে উজ্জীবিত করে পুনরায় সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে তৈরী করতে এসেছে এবং সেলজুকী মেয়ের পরিচয়ে গযনী বাহিনীর সেলজুকী কমান্ডারদের বিয়ের নামে বিভ্রান্ত করে গযনী বাহিনীর সৈন্যদের দিয়েই সুলতানকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
এদিকে আরেক এলিকখানী মেয়ে মারয়াম রাণী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। অথচ এই খান মেয়েদেরই একজন আম্বরী। মারয়ামের মতোই যুবতী সে। একই আলো বাতাস ও পরিবেশে বড় হয়েছে মারয়াম এবং আম্বরী। তাদের পরিবার ও পরিবেশে সুলতান মাহমুদের নাম অত্যন্ত ঘৃণাভরে উচ্চারিত হতো। ছোট বড় সকল এলিকখানী সুলতান মাহমূদকে ধ্বংসের জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকতো। সেই পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে উঠেও আম্বরী ছিল ব্যতিক্রম। সমবয়সীরা যখন সুলতান মাহমুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতো, তখন সেটির মধ্যেও সে খোঁজে পেতো শ্রদ্ধার উপাদান।
আম্বরীর এই ব্যতিক্রমী বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা ছিল মারয়ামের।
আম্বরী একদিন মারয়ামকে দৃঢ়ভাবে বলে ছিলো, তোমাদের এই ঘৃণা বিদ্বেষ আসলে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না, ইসলামের বিরোধ্যিায় পর্যবসিত হচ্ছে। সুলতান মাহমূদের বিরোধিতা করে তোমরা বাস্তবে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করছে।
দু’জন খান তরুণীকে যখন বাইরের এক লোক একটি বদ্ধ কক্ষে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতে এটি তখন আম্বরীর নজর এড়াতো না। তার চোখের সামনেই প্রতিদিন একটি গোপন কক্ষে ভিনদেশ এক পুরুষের সাথে সময় কাটাতো তারই বয়সী দুই খান তরুণী।
একদিন আম্বরী তরুণীদের জিজ্ঞেস করলো- তোমরা এই ঘরে দীর্ঘ সময় ধরে কি করো? ওই অপরিচিত লোকটি কে? ওরা আম্বরীকে জানালো, তিনি আমাদের গৃহ শিক্ষক। আমরা সেখানে তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করি।
একথা শুনে আম্বরীর খুব আফসোস হলো । সে মনে মনে বললো, দুরের মেয়েদের জন্য বাইরে থেকে শিক্ষক এনে শিক্ষা দেয়া হয়; কিন্তু ঘরের মেয়ে হওয়ার পরও তাকে উস্তাদের কাছে বসতে দেয়া হয় না। অবশ্য আফসোস হলেও পরবর্তীতে আম্বরীর কারণ উদঘাটনে মোটেও কষ্ট হয়নি। এলিকখানের বংশের সবাই আম্বরীকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মনে করতো। কারণ সব সময় তার মুখে থাকতো, ইসলাম দীন পরকাল জান্নাত জাহান্নাম, পাপ পুণ্য ইত্যাকার কথাবার্তা। শাহী খান্দানের অন্যান্য তরুণীদের মতো আম্বরী বিলাস ব্যাসনও আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকতো না। ফলে সবাই তাকে বলতো, ওর মধ্যে আবেগ উচ্ছ্বাস নেই। রাগ অনুরাগহীন নিরামিষ ধরনের একজন নারী আম্বরী।
অথচ আম্বরী ছিলো খান পরিবারে যে কোন তরুণীর চেয়ে অনেক বেশী প্রখর অনুভূতির অধিকারী। কিন্তু তার আবেগ উচ্ছ্বাস ছিল নিয়ন্ত্রিত। অশ্বারোহণও তীরন্দাজী ছাড়া আর কোন কাজ ও খেলাধুলায় সে মনোযোগী ছিলো না। সেই যুগে শাহী খানদানের সব মেয়েরাই অশ্বারোহণ ও তীরন্দাজীতে পারদর্শী হতো । এটাই ছিল সাধারণ রীতি। কিন্তু এ কাজে আম্বরীর পারদর্শিতা ছিল অসাধারণ । সে পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘোড়া দৌড়াতে এবং ধাবমান ঘোড়ার উপর থেকে নির্ভুল লক্ষ্যবস্তুতে তীর নিক্ষেপে অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেছিল। আম্বরীর তীর কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। এ ব্যাপারে তার কোন জুড়ি ছিল না। প্রায় দিনই সে একাকী ঘোড়া হাঁকিয়ে বাড়ি থেকে বহু দূরে চলে যেতো।
* * *
সেলজুকীরা মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। জনবল হারানোর পাশাপাশি তাদের বিপুল সংখ্যক উট, ঘোড়া ও সহায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু সুলতান মাহমূদ এই বিজয়ে মোটেও নিরুদ্বিগ্ন হতে পারেননি। কারণ তিনি জানতেন, সেলজুকী একটি বিশাল জনগোষ্ঠী। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এদের লোক সংখ্যা বিপুল। তাছাড়া এলিকখানের রাজশক্তি এবং আলাফতোগীন এদের সহযোগী। কাজেই যে কোন সময় এরা একত্রিত হয়ে সীমান্ত এলাকায় আঘাত হানতে পারে। ফলে এদের উপর দৃষ্টি রাখা জরুরি। সুলতান মাহমুদ সীমান্তরক্ষীদের নির্দেশ দিয়ে দিলেন, সীমান্ত চৌকিগুলোর টহল ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হোক এবং যতদূর সম্ভব টহল সেনাদের সীমান্তের বাইরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে সতর্ক রাখা হোক।
