সুলতানের পাঠানো দুই সেলজুকী সেনাপতি ইসরাঈল সেলজুকী ও আহমদ তোগা খানকে জীবন্ত পাকড়াও করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ওরা চিল সাসার সেলজুকীদের চেয়ে অনেক সতর্ক। তাঁবুতে আক্রমণ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তারা দু’জন জীবন নিয়ে পালাতে সক্ষম হলো। সকাল বেলায় জ্বলন্ত তাঁবু ও অগণিত লাশের স্তূপের মাঝে ইসরাঈল সেলজুকী ও আহমদ তোগা খানের মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেল না।
কয়েক দিন পরে ঘটনা। ইসরাঈল সেলজুকী মারয়ামকে বিয়ের পর যেখানে দাঁড়িয়ে তার গোত্রের লোকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলো– তোমরা সবাই তোমাদের তীর ধনুক ঠিক ঠাক করে নাও, তরবারীকে শান দিয়ে নাও, আমাদের আগামী উৎসব হবে বিজয় উৎসব। পালিয়ে এসে ঠিক সেই টিলার পাদদেশে একটি তাঁবুতে ভগ্ন হৃদয়ে হতাশ ইসরাঈল বিছানায় পড়ে এপাশ ওপাশ করছিল। আর মারয়াম নিজ হাতে ইসরাঈলকে শরাব পান করাচ্ছিল। আর ইসরাঈলের পাশে বসা ছিল একজন পণ্ডিতধরনের লোক।
জীবনের প্রথম পরাজয়ই শেষ যুদ্ধ নয় ইসরাইল! তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না। কারণ, তোমার অজ্ঞাতসারে অতর্কিত আক্রমণে তুমি পরাজয় বরণ করেছে। আবার নিজেকে শানিত করে প্রস্তুতি নিয়ে মোকাবেলা করো, শেষ বিজয় তোমারই হবে।
ইসরাঈল নীরব। যেনো কোন কথাই তার কানে প্রবেশ করছে না। এ অবস্থা দেখে পণ্ডিত লোকটিকে মারয়াম বাইরে চলে যেতে ইঙ্গিত করলে সে তাঁবুর বাইরে চলে গেলো। এবার ইসরাঈলকে একান্তে পেয়ে তাকে চাঙা করার জন্যে নিজের রূপ যৌবনের যাদুকরী কৌশল প্রয়োগ করতে লাগলো মারয়াম। খুব মায়াবী কণ্ঠে ইসরাঈলকে স্মরণ করিয়ে দিলো, একটু খানি পরাজয়ে তুমি এতোটা ভেঙ্গে পড়েছো? অথচ আমার সাথে প্রথম পরিচয়ের দিনই তুমি বলেছিলে, প্রথম মোকাবেলায় পরাজিত হলেও পরবর্তী মোকাবেলায় তুমি ভিন্ন। কৌশল অবলম্বন করে মাহমূদকে শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দেবে।
মারয়ামের উদ্দীপনামূলক কথাবার্তা ও দৈহিক উষ্ণতায় ইসরাঈল যেনো প্রাণ ফিরে পেলো। সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করলো এবং মারয়ামকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে নতুনভাবে প্রস্তুত হওয়ার প্রতিজ্ঞা করলো।
কয়েক দিন পর যখন পরাজয়ের অবসাদ ও গ্লানি কাটিয়ে ইসরাঈল আবার সেলজুকীদের একত্রিত করে পুনরায় যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো, তখন খবর এলো– এলিকখান মারা গেছে। মৃত্যুর আগে সে বলে গেছে, ইসরাঈলকে বলবে, সে আমাকে আমার জীবদ্দশায় মাহমুদকে পরাজিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তার পরাজয়ের বর্ণনা শুনে আমি এতোটাই শোকাহত হয়েছি যে, এই বয়সে এতোটা কষ্ট আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হলো না। আমি আমার ছেলে আহমদ তোগা খানকে আমার স্থলাভিষিক্ত করে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। ইসরাঈলকে বলল, সে যেনো আমার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণ করে। নয়তো আমার বিদেহী আত্মা প্রেতাত্মা হয়ে তাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না।
ইসরাঈল যেনো তোগা খানের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রাখে এবং আলাফতোগীনের সাথেও মৈত্রী বজায় রাখে। কারণ, তোমাদের কারো একার পক্ষে মাহমূদকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না। আমি আলাফতোগীনকে শীঘ্রই তার কাছে পাঠাচ্ছি। ইসরাঈল ও আলাফতোগীন দু’জন এক সাথে বসে যেন ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণ করে।
বস্তুত আলাফতোগীনের হাতেই এলিকখান এই লিখিত পয়গাম দিয়েছিল। সে পয়গামে আরো জানালো, আলাফতোগীনের সাথে তোমার কাছে আমি দু’জন যুবতাঁকে পাঠালাম। মারয়াম এদেরকে ভালো ভাবেই জানে। মৃত্যুর আগে আমি তোমাকে একটা গোপন কৌশল বলে দিতে চাই–
আমার সাথে সাক্ষাতে তুমি বলেছিলে, প্রথম আক্রমণে মাহমূদকে পরাজিত করতে পারলে তুমি অন্য পন্থা অবলম্বন করবে। অন্য পন্থা হিসেবে এই দু’টি মেয়েকে তুমি ব্যবহার করতে পারো। এরা খুবই চতুর ও সতর্ক মেয়ে। সুলতান মাহমূদের সেনাবাহিনীতে কয়েকজন সেলজুকী কমান্ডার রয়েছে। এদেরকে এই মেয়ে দুটি দিয়ে তুমি ফাঁদে আটকাতে পারো। মেয়ে দুটিকে গযনী পাঠিয়ে দেবে। এরা সেখানে গিয়ে সেলজুকী কমান্ডারদের বিয়ে করবে। কিন্তু পর্দার অন্তরালে এরা মাহমূদের সেনাবাহিনীতে কর্মরত অন্যান্য সেলজুকীদেরকে তাদের ফাঁদে ফাসাতে থাকবে।
এদেরকে বুখারার বাইরের একজন উস্তাদ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সে ইহুদী। ইহুদীর কথা শুনে মনে করো না, ইহুদী হয়তো আমাদের ক্ষতি করবে। আসলে আমাদের ক্ষতি করবে না, তার লক্ষ্য বস্তু মাহমূদ। সে আমার সাথে ওয়াদা করেছে মাহমূদের সেনাবাহিনীতে কর্মরত সেলজুকীদের খরীদ করতে যতো টাকার প্রয়োজন হয় সে নগদ অর্থ সহায়তা দেবে। এ ব্যাপারে অর্থ খরচের ব্যাপারে তুমি মোটেও চিন্তা করো না। আহমদ তোগা খানও তোমাকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা করবে।
ইসরাঈল যখন তার তাঁবুতে আগত দুই তরুণীকে দেখলো, তখন তার কাছে মনে হলো, রূপ সৌন্দর্যের দিক থেকে এরা মারয়ামের কাছে কিছুই নয়। তবে সুন্দরী।
দুই তরুণী যখন ইসরাঈলের সাথে কথা বলতে শুরু করলো এবং তাদের যাদুকরী অঙ্গভঙ্গি দেখাতে শুরু করলো, তখন মারয়ামের রূপসৌন্দর্য ইসরাঈলের কাছে পানসে হয়ে গেলো। তার হৃদয় থেকে ধীরে ধীরে মারয়ামের প্রেম ফিকে হতে শুরু করলো। সেখানে ঝড় তুললো এই দুই তরুণী।
