সেলজুকী বৃদ্ধ ভয় ও আতংকে কাঁপতে লাগলো। সে আশংকা করছিল কঠিনতম কোন শাস্তি তাকে দেয়া হবে।
যাকে কেউ সত্য পথের সন্ধান দেয়নি, সে যদি বিপথগামী হয়, তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। আজ তোমার ছেলে তোমাকে সত্য পথ দেখিয়েছে। এখন তুমি আমাকে বলল, ইসরাঈল সেলজুকী কি ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে? আরবাব খানের বাবার উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান। তিনি আরো বললেন, তুমি যদি সেলজুকীদের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও তাদের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে কোন কথাই না বল তবুও আমরা তোমাকে জেলখানায় বন্দি করবো না। কারণ, তুমি আমাদের সম্মানিত মেহমান। আমরা তোমাকে সম্মানের সাথে মেহমানদারী করবো। আমরা তোমাকে সসম্মানে বিদায় দেবো। যাতে তুমি বুঝতে পারো, কারা সত্যের অনুসারী। কারা ইসলামের সঠিক আদর্শের অনুগত। আর কারা ইসলামের নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তুমি কি সত্য গোপন করে আল্লাহর বিরুদ্ধে যাবে?
সুলতানের কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠলো আরবাব খান। সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো– গোস্তাখী মাফ করবেন সুলতান! আমার বাবা যদি সত্য কথা না বলে, ঐ তাহলে আপনার সামনেই তার মাথা কেটে আপনার পায়ে সোপর্দ করবো।
থামো আরবাব খান! তুমি আমার সাথে কোন গোস্তাখী করোনি। গোস্তাখী করেছো তোমার বাবার সাথে। বেচারা তো ইসলামের একটি দিক দেখেছে, তাকে ইসলামের প্রকৃতরূপ দেখার সুযোগ দাও। উচ্চ কণ্ঠে বললেন সুলতান।
বৃদ্ধ সুলতানের কথায় এতোটাই মুগ্ধ হলো যে, সামনে অগ্রসর হয়ে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে পড়লো এবং কোমর থেকে তরবারী খোলে সুলতানের পায়ের কাছে রেখে বললো– সেলজুকী গোত্রপতি ইসরাঈল খান এলিক খানের ভাতিজীকে সম্প্রতি বিয়ে করে নিয়ে এসেছে এবং এলিকখানের কিছু সৈন্য সাথে নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল সেলজুকী উপজাতিদের একত্রিত করে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সুলতান মাহমূদ আরবাব খানের বাবার সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলে প্রয়োজনীয় সব তথ্য জেনে নিলেন এবং তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন- এই মুরুব্বীর জন্য শাহী মেহমান খানায় যাবতীয় আপ্যায়ন ও মেহমানদারীর ব্যবস্থা করা হোক।
বৃদ্ধকে মেহমানখানায় পাঠিয়ে দিয়ে সুলতান আরবাব খানকে কিছু পুরস্কার দিয়ে বললেন– তুমি নিজেকে ইসরাঈলের বিশ্বস্ত লোক ঘোষণা দিয়ে ওখানে কিছু দিন থাকবে। সব কিছু জানা ও দেখা হয়ে গেলে সুযোগ মতো চলে আসবে।
এই ঘটনার পনেরো দিন পর আরবাব খান সেলজুকীদের খবর নিয়ে সুলতানের কাছে ফিরে এলো। সে এসেই সুলতানকে ইসরাঈল সেলজুকীর যাবতীয় প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দিল।
সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীতে দু’জন ছিলেন সেলজুকী সেনাপতি। এদের একজন আরবাব খানের বিশ্বস্ততার ব্যাপারে প্রশংসা করলেন। আরবাব খান ছাড়াও আরো দু’জন সেলজুকী ছিলেন গযনী বাহিনীর কমান্ডার। একজন সেনাপতি তাদের বিশ্বস্ততার ব্যাপারে দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করলেন। সুলতান এই দু’জন সেলজুকী কমান্ডারকে ডেকে বললেন, তোমরা দু’জন ইসরাঈলের কাছে চলে যাও। তাকে কৌশলে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে এদিকে নিয়ে এসো।
দুই কমান্ডার সেলজুকীদের কাছে গিয়ে কি ভূমিকা রাখবে এবং কখন কি উদ্যোগ নেবে এ ব্যাপারে তাদের বিস্তারিত দিক নির্দেশনা দিয়ে ইসরাঈলের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে সুলতান সেনাপতিদের ডেকে নির্দেশ দিলেন, যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে সেনাদেরকে বুখারার পাহাড়ী অঞ্চলে রওয়ানার জন্য তৈরী করুন।
* * *
১০১৭ সালের ঘটনা। সেলজুকী বাহিনীর যোদ্ধারা তিরমুজ নামক স্থান দিয়ে ককেসাস নদী পার হলো।
সেলজুকীরা ছিল প্রকৃত অর্থেই লড়াকু জাতি। ফলে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তারা বন্যার পানির মতোই ধেয়ে আসছিল। সেলজুকীরা ছিল উপজাতি। তাদের নিজস্ব কোন সরকার ব্যবস্থা ছিল না এবং ছিল না প্রথাদুরস্ত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী। ফলে সেলজুকীরা যে পথে অগ্রসর হচ্ছিল সকল জনপদ তারা লুণ্ঠন করে এবং লোকদের মাঠের ফসল তাদের ঘোড়া উট দিয়ে মাড়িয়ে আসছিল।
তিরমুজ থেকে ষাট মাইল এগুলে আহাঙ্গরা পাহাড়ী এলাকা। সেলজুকী বাহিনী সুলতান মাহমুদের পাঠানো টু’জন প্রশিক্ষিত কমান্ডারের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী অগ্রসর হচ্ছিল। আহাঙ্গরা পাহাড়ী এলাকায় এসে সেলজুকী বাহিনী একটি জায়গায় তাঁবু ফেললো। সুলতানের দুই কমান্ডার ইসরাঈল সেলজুকীকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিল, যে এলাকায় সুলতানের সেনাবাহিনী নেই, তারা সেই এলাকা দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সেলজুকীরা দীর্ঘ ক্লান্তিকর সফরের পর অসংখ্য তাঁবু ফেলে আহারাদি সেরে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে সবাই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।
মাঝ রাতে তাঁবুগুলোর মাঝখান থেকে একটি মশাল উপরের দিকে উঠে ডানে বামে দোলে উঠলো। এটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত সংকেত। এই সংকেতের পর চতুর্দিক থেকে তাঁবু এলাকায় এমন হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল যেন পাহাড়ের চূড়া ভেঙ্গে তাঁবুতে শায়িত মানুষগুলোর উপর আঁছড়ে পড়ছে। সুলতান মাহমুদের দুই সেলজুকী সেনাপতি সেলজুকীদের পণ্যসামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দিল এবং আগুনের আলোয় গযনী বাহিনী ঘুমন্ত সেলজুকীদের উপর চড়াও হলো।
সেলজুকীদের তুলনায় সুলতান মাহমুদের পাঠানো সৈন্য সংখ্যা ছিলো খুবই নগন্য। কিন্তু ঘুমন্ত সৈন্যদের পিষে মারার জন্য মাত্র দুটি অশ্বারোহী ইউনিটই যথেষ্ট ছিলো । আসলে সেই ঘুমন্ত তাঁবুপল্লীতে যা ঘটেছিল তা কোন লড়াই ছিল না, ছিল সেলজুকীদের গণ হত্যা। সেলজুকীরা কোন প্রতিরোধ বা আত্মরক্ষার সুযোগ পেলো না, ঘনী বাহিনী সেলজুকীদের কচুকাটা করতে লাগল।
