ইসরাঈল সেলজুকী দুঃসাহসী চাতুর্যপূর্ণ কিছু কথাবার্তা বলে এলিকখানের মন থেকে পরাজয়ের আতংক দূর করে দিল এবং মারয়ামকে তখনই বিয়ে করে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলো।
* * *
এদিকে নিজ কবিলায় ফিরে আসার আগেই সেলজুকী গোত্রের লোকেরা খবর পেয়ে গেল গোত্র সর্দার ইসরাঈল সেলজুকী নতুন বউ নিয়ে আসছে। আর এই বউ কোন সাধারণ কবিলার মেয়ে নয়, অভিজাত খান শাসক গোষ্ঠী এলিকখানের আপন ভাতিজী।
এলিকখান যদিও পরাজিত ও বিপথগামী এক সরদার ছিল, কিন্তু সেই সময় সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাও বিরাট সম্মানের বিষয় ছিল। কারণ, সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কোন বীরপুরুষের পক্ষেই এমন দুঃসাহসিক উদ্যোগ নেয়া সম্ভব ছিল। এ জন্য তদঞ্চলে এলিকখানকেও একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে সম্মানের চোখে দেখা হতো।
এদিকে পাহাড়ী এলাকায় সেলজুকীরা গোত্রপতির বিয়ের খবর শুনে গোত্রের সকল লোক একত্রিত হলো। সারি সারি ছাগল, বকরী, উট জবাই হলো। জবাইকৃত পশুর রক্তে নদী বয়ে গেল। রাতভর চললো আমোদ ফুর্তি ও খানাপিনা।
পানাহার ও আমোদ ফুর্তির পর মারয়ামকে সাথে নিয়ে ইসরাঈল একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে গোত্রের লোকদের বললো– হে সেলজুকী সম্প্রদায়ের লোকেরা! শোন, আজ আমি তোমাদের সামনে এমন এক মহান শাহজাদীকে হাজির করেছি, যে সুলতান মাহমূদের রাজ প্রাসাদের প্রতিটি ইট খোলে ফেলার অঙ্গীকার করেছে। শাহজাদী মারয়ামকে তোমরা যেমন রূপের অধিকারী দেখছো, সে ততোটাই গুণ ও দৃঢ় সংকল্পের অধিকারীনী। সেলজুকী সিংহরা! গযনীর প্রাসাদ থেকে প্রতিটি ইট খোলে ফেলার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে থাক?
একথা শোনে সেলজুকী গোত্রের লোকেরা শ্লোগানের শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুললো।
ইসরাঈল সেলজুকীদের উসকে দেয়ার জন্যে বললো– হিন্দুস্তানের লুণ্ঠনকারী আজও সেলজুকী সিংহদের রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে। আজ তোমরা প্রতিজ্ঞা করো, মাহমূদকে চির নিদ্রায় না পাঠিয়ে তোমরা আর বিছানায় পিঠ লাগাবে না। এখন আমাদের গন্তব্য হবে গয়নী।
হে সেলজুকী সিংহরা! ভুলে যেয়ো না তোমাদের কোন ভূখণ্ড নেই। দুনিয়াতে এমন জায়গা নেই, যেটিকে সেলজুকীরা নিজের দেশ বলতে পারে। আমরা জংলী জীব জন্তুর মতো পাহাড়ে জঙ্গলে যাযাবরের মতো বসবাস করছি। অথচ অস্ত্র ও জনবলের দিক থেকে আমরা মোটেও দুর্বল নই। আমরা একটি শক্তি! আমাদের একটা জনগোষ্ঠী আছে। আমাদের আছে প্রচুর সংখ্যক সাহসী যোদ্ধা। আমাদের শক্তিকে অন্যেরা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে। ইতোমধ্যে আমাদের জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। কয়েকজন সেলজুকী গযনীর সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
সুলতান মাহমূদ তাদেরকে হিন্দুস্তানের লুট করা সম্পদের লোভ দেখিয়ে কিনে নিয়েছে। মাহমূদ ইসলামের নামে সবাইকে ধোঁকা দিচ্ছে। অথচ ইসলামের প্রকৃত প্রহরী আমরা। তবে আমরা আগে সেলজুকী, তারপর মুসলমান। মাহমূদ ইসলামের সবচেয়ে বড় দুশমন। সে নিজেকে মূর্তি সংহারী বলে প্রচার করে। অথচ বাস্তবে সে নিজেকেই জীবন্ত মূর্তিতে পরিণত করেছে। মাহমূদ আমাদের সবাইকে তার পায়ে সিজদা দিতে বাধ্য করতে চায়। আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত করতে রাজি নই। সেলজুকী সিংহরা! আজ তোমরা তোমাদের তরবারীকে তীক্ষ্ণ করে তোলো। প্রস্তুত হয়ে যাও, আমাদের পরবর্তী উৎসব হবে বিজয় উৎসব।
গোত্রপতি ইসরাঈলের ভাষণের পর সেদিন থেকেই পাহাড়ে শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ প্রস্তুতি। নিক্ষেপযোগ্য বর্শা তৈরী হতে থাকল। অনেকে তীর ধনুক বানাতে লেগে গেল। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেলজুকীদের একত্রিত করা শুরু হলো। এক মাসের মধ্যে তৈরী হয়ে গেল একটা বিরাট বাহিনী।
ইসরাঈল সেলজুকী এলিকখানের সেনাবাহিনী থেকেও কিছুসংখ্যক সৈন্য তার বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করলো। এলিকখানের সৈন্যদের সাথে তার ছেলে আহমদ তোগাখান কমাণ্ডার হিসেবে যোগদান করলো।
গযনী বাহিনীতে আরবাব খান সেলজুকী নামের এক ব্যক্তি একটি সেনা ইউনিটের কমান্ডার ছিল। একদিন তার বাবা তার সাথে সাক্ষাত করতে এলেন। আরবাব খানের বাবা শুধু ছেলের সাথে সাক্ষাত করতে আসেননি, তিনি সাক্ষাতের পাশাপাশি একথাও জানাতে এলেন সেলজুকীরা সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই সাথে সেলজুকী নেতারা বলছে, যে সব সেলজুকী গযনী বাহিনীতে রয়েছে তাদের উচিত, গযনী বাহিনী ত্যাগ করে ইসরাঈল সেলজুকীর নেতৃত্বে মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। এরা যদি তা না করে তাহলে গোত্রের সাথে বেঈমানীর জন্যে কাফের হয়ে মারা যাবে।
আরবাব খান তার বাবার কাছ থেকে ইসরাঈল সেলজুকীর যুদ্ধ প্রস্তুতির বিস্তারিত শোনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরবাব খান তার ঊর্ধ্বতন সেনাপতির কাছে গিয়ে জানাল–সেলজুকী গোত্রপতি ইসরাঈল সেলজুকী গযনী সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ খবর এখনই সুলতানকে জানানো উচিত মাননীয় সেনপতি!
কিছুক্ষণ পর আরবাব খান ও তার পিতাকে সুলতানের সামনে হাজির করা হলো।
আমি তোমার ছেলের নৈতিকতাকে শ্রদ্ধা জানাই। কারণ সে তার বাবাকে আসামী করে আমার সামনে হাজির করেছে। আমি বুঝতে পারছি না তাকে কি পুরস্কার দিব? অবশ্য প্রকৃত পুরস্কার তাকে আখেরাতে আল্লাহ তাআলা দিবেন। আরবাব খানের পিতার উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান মাহমদু।
