ইসরাঈল এলিকখানের সান্নিধ্যে তিন রাত থাকলো। তিন রাতেই মারয়াম অতি সংগোপনে ইসরাঈলের সাথে সাক্ষাত করলো। শেষ রাতে তারই এক সমবয়সী তরুণী আম্বরীকে মারয়াম ইসরাঈলের সাথে সাক্ষাতের সময় সঙ্গে নিয়ে এলো। মারয়াম যখন ইসরাঈলের সাথে কথা বলতে গেলো, তখন আম্বরী একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল। তার পরের দিন ইসরাঈল সেলজুকী চলে গেল।
ইসরাঈল চলে যাওয়ার পর আম্বরী মারয়ামকে বললো তোমার পছন্দ ঠিকই আছে মারয়াম! ইসরাঈলই তোমার জন্যে যোগ্য ব্যক্তি। এমন পুরুষই তোমার প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু একটা কথা মারয়াম! ইসরাঈলকে বিয়ে করে তুমি সুলতান মাহমুদের সাথে শত্রুত তৈরী করছে। অথচ চাচা এলিকখান বলেছেন, তিনি প্রয়োজনে মাহমূদের খান্দানে মেয়ে বিয়ে দিয়ে হলেও তার সাথে মৈত্রী গড়ে তুলবেন। তুমি কি একথা শোননি?
আরে, রাখো এসব কথা। এসব কথাই তো প্রমাণ করে তিনি জীবনের জন্যে হার মেনে নিয়েছেন। এগুলো তার পরাজয়ের পরিণতি। চাচা সুলতান মাহমূদকে এতোটাই ভয় পাচ্ছেন যে, নিজ খান্দানের মেয়ে দিয়ে হলেও তার সঙ্গে আপস করতে চান। কিন্তু ইসরাঈল সেলজুকী আপসহীন। সে কোন অবস্থাতেই মাহমূদের সাথে মৈত্রী করবে না। বললো মারয়াম–
মৈত্রী হয়তো করার সুযোগই পাবে না, পরাজিত হয়ে দৌড়ে পালাবে। কিছুটা তীর্যক কণ্ঠে মারয়ামের উদ্দেশে বললো আম্বরী। দেখবে ইসরাঈলেরও সেই একই পরিণতি হবে যা এলিকখানের হয়েছে। যে পরিণতি কাদের খানের হয়েছে, খাওয়ারিজম শাহীর হয়েছে, কারামতীদের হয়েছে। তোমার সেলজুকী বাহাদুরেরও একই পরিণতি বরণ করতে হবে মারয়াম!
আরে দেখে নিয়ো, ইসরাঈল সবার পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে। কিছুটা গর্বিত কণ্ঠে বললো মারয়াম। আম্বরী! তুমি এমন ভাবে কথা বলছো, যাতে গযনী শাসকদের গোলামী ও পরাজয়ের গন্ধ আসে।
আরে শাহজাদী! তুমি আমার কথায় গযনী শাসকদের গোলামী আবিষ্কার করছো কেন, এটা ইসলামের গোলামী বলল। দেখো, তোমরা এই পার্থিব দুনিয়ার কথা বলো, আর আমি সেই দুনিয়ার কথা বলি, মৃত্যুর পর যে দুনিয়াতে আমাদের সবাইকে যেতে হবে। দেখো, মুসলিম শাসকরা পরস্পর লড়াই করে কি পেয়েছে? আসলে তো সেই সম্ভাবনাময় শক্তিকেই বিনষ্ট করছে যে শক্তি ইসলামে শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যয় করার কথা ছিল। খান আর সেলজুকীরা মিলিত হয়ে যদি সুলতান মাহমুদকে পরাজিত করে তবুও প্রকৃত জয় খান আর সেলজুকীদের হবে না, শক্তিশালী হবে ইসলামের বিরোধী শক্তি।
হেসে ফেললো মারয়াম, তার হাসিতে বিদ্রূপ। সে বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠে বললো– তোমার মুখে সব সময় ইসলাম ইসলাম। ইসলামের কথা বলতে বলতে তুমি মারা যাবে আম্বরী! তুমি বিশ্বাস করো, একদিন না একদিন আমি গযনী সিংহাসনের রাণী হব। আর তুমি হবে কোন বুড়ো সেনাপতির বিবি।
অবশ্য আমি সেটা হতে দেবো না। তোমাকে আমি তোমার মতোই সুন্দর সুপুরুষ কোন যুবকের সাথে বিয়ে দেবো। সে হবে এমন যুবক যার থাকবে অঢেল সম্পদ আর ক্ষমতা।
আর ইসরাঈল সেলজুকী হবে গযনীর বাদশা। তাই না? তীর্যক কণ্ঠে বললো আম্বরী।
হ্যাঁ আম্বরী! সে তো এখনো বাদশা। তবুও তার সেই সিংহাসন চাই যে সিংহাসনে সুলতান মাহমূদ বসে।
তুমি জেগে জেগে দিবা স্বপ্ন দেখছো মারয়াম!
তুমি হয়তো ঠিকই বলছো আম্বরী! আসলেও আমি স্বপ্নময় ঘোরের মধ্যে আছি। ইসরাঈলকে আমার স্বপ্নগুলোর বাস্তব রূপকার মনে হচ্ছে। জানো, সেই ছোট্ট বেলা থেকেই আমি রানী হওয়ার স্বপ্ন দেখি। রাণী আমাকে হতেই হবে। মাথার উপর রাণীর মুকুট রাখার জন্যে আমি যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি।
* * *
তিন দিন এলিকখানের আতিথ্য গ্রহণ করার পর ফিরে যাওয়ার সময় মারয়ামকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিল ইসরাঈল সেলজুকী।
ইসরাঈলের কথা শুনে এলিক খান বললো–ঠিক আছে ইসরাঈল! মারয়াম তোমাকে পছন্দ করেছে এ খবর আমার অজানা নয়! মারয়ামের বাবাও তোমার কাছে তার মেয়েকে তোলে দেয়ার ব্যাপারে আমাকে অনুমিত দিয়েছে। কিন্তু ইসরাঈল! তোমাকে এই অঙ্গীকার করতে হবে, সুলতান মাহমূদকে পরাজিত করে আমার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তুমি সব ধরনের ঝুঁকি নিতে এবং ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকবে।
বয়সের কারণে আর বন্ধুরা আমার সাথে বেঈমানী করার কারণে আমার পক্ষে মাহমূদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে তো আমি একথাও চিন্তা করেছিলাম, মাহমূদের সাথে কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক করে বাকী জীবনটা নির্বিবাদে আরামে কাটানোর ব্যবস্থা করবো। কিন্তু শেষ জীবনে তুমি আমার কাছে আশার আলো হয়ে এসেছে। ইচ্ছা করলে তুমি আমার শেষ জীবনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারো। আমাকে নতুন জীবন দান করতে পারো।
মারয়াম আমার খুব প্রিয়। ছোট্ট বেলা থেকেই সে বলে আসছে সে হবে রাজরাণী । আশা করি তুমি তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।
আপনার প্রত্যাশা আর মারয়ামের রাণী হওয়ার স্বপ্ন আমি পূর্ণ করবো বললো–ইসরাঈল সেলজুকী। এখন পর্যন্ত আমি কখনো মাহমূদের মুখোমুখি হইনি। প্রথমবার তার মুখোমুখি হয়ে যদি সুবিধা করতে না পারি তবে পিছিয়ে আসবো। দ্বিতীয় বারেও যদি আমি তাকে পরাজিত করতে না পারি তাহলে অন্য কৌশল অবলম্বন করবো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন! আপনার জীবদ্দশাই মাহমূদের পতন ঘটবে। আমার হাতেই তার পতন ঘটবে।
