জেনে রাখুন এলিকখান! আমি মাহমূদের বিরুদ্ধে লড়াই করবোই। ওকে আমি আর বাড়তে দেবো না। হিন্দুস্তানের ধন-দৌলত ওকে বিরাট শক্তিশালী করে দিচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সমরকন্দ বুখারা বলখ তুর্কিস্তান খাওয়ারিজম সবই এক সময় তার দৌলতের গোলামী করতে শুরু করবে। আর অপরাধীর মতো দুর্গম পাহাড়ে আমাদেরকে লুকিয়ে থাকতে হবে।
আমি তো শুনেছি, তোমার সেলজুকী গোত্রের কিছু লোক মাহমূদের সেনা বাহিনীতেও নাকি ঢুকেছে? বললেন এলিকখান।
হ্যাঁ, কয়েকজন সেলজুকীকে ধনসম্পদের লোভ দেখিয়ে কিনতে সক্ষম হয়েছে মাহমূদ। এখন তো তার বাহিনীতে একজন সেনাপতিও সেলজুকী। আব্দুল কাদের নামের এই সেলজুকী শুধু সেনাপতি নয়, হিন্দুস্তানের শাসকও বটে।
তুমি স্বগোত্রের এই লোকগুলোকে নিজ গোত্রে ফিরিয়ে আনতে পারবে না?
আরে, একথা না বলে বলুন যে, তুমি এই সেলজুকীদের হাতে মাহমূদকে হত্যা করতে পারো না? আরে খান! লড়াই শুধু রণাঙ্গনেই হয় না, দেয়ালের আড়ালের লড়াই আরো বেশী শক্ত। আমি মাহমূদকে তার সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকীর হাতেই মারার আয়োজন করেছি। কিন্তু এর আগে একবার আমি তার সাথে ময়দানের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে চাই। যদি পরাজিত হই তাহলে মাহমুদকে হত্যা করার জন্যে সেলজুকী সৈন্যদের ব্যবহার করবো বললো ইসরাঈল সেলজুকী।
শরাবের পেয়ালা একের পর এক গলদকরণ করছে দুই সর্দার। এলিকখানের সুন্দরী রক্ষিতা দু’জন শরাবের পেয়ালা ভরে দিচ্ছে। এলিকখানের ডানে বামে আরো তিন চারজন রূপসী বসা। ইসরাঈল সেলজুকী এই সুন্দরীদের মতো এতোটা রূপ জৌলুসের অধিকারী না হলেও সুঠাম শক্তিশালী টবগে যৌবনের অধিকারী একজন আকর্ষণীয় যুবক। শরাবের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সে বললো– আমি স্বপ্নে জাগরণে সব সময় নিজেকে গযনীর শাহী কুরসীতে আসীন দেখতে পাই।
ঠিক আছে, দেখা যাবে গযনীর তখতে কে বসে? তুমি ক’দিন আমার এখানে আতিথ্য গ্রহণ করো। মেহমান হিসেবে কয়েক দিন তার এখানে থাকার জন্যে ইসরাঈলকে আমন্ত্রণ জানালেন এলিকখান।
চাঁদনী রাতে রকমারী বুনো ফুলের মনোমুগ্ধকর গন্ধে আনমনে পায়চারী করছিল ইসরাঈল। হাঁটতে হাঁটতে সে তার জন্যে নির্ধারিত তাঁবু থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিল। এক সময় ইসরাঈল অনুভব করলো, সে একাকী নয়, তার পেছনে কেউ না কেউ আছে।
অতি সন্তর্পণে সে তার খঞ্জরের উপর হাত রেখে আঁড় চোখে এপাশ ওপাশ দেখতে চেষ্টা করলো। সে অনুভব করলো, একটি ছায়ামূর্তি গাছগাছালির ভেতর থেকে এগিয়ে আসছে। তার মনে হলো, ছায়া মূর্তিটি কোন পুরুষের নয়। ইসরাঈল নিঃশংক গলায় জিজ্ঞেস করলো, কে তুমি?
আমি মারয়াম! এগিয়ে এসে বললো এক নারী মূর্তি।
ভয় পাওয়ার কিছু নেই! আমি এলিকখানের ভাতিজী মারয়াম। ইসরাঈল গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে বললো– আমার তো মনে হয় গতকাল এলিকখানের পাশে যারা বসেছিল তাদের মধ্যে তুমিও ছিলে। তো এখানে কেন এসেছো?
এটা কি জিজ্ঞেস করার কোন বিষয় হলো? বললো মারয়াম। ভুল বোঝার আগেই আমি আপনার ভুল ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে বলছি আপনার সুঠাম দেহ আর সর্দারীর মোহে আমি আপনার কাছে আসিনি। আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি সূলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে আপনার সংকল্পে মুগ্ধ হয়ে আপনাকে মোবারকবাদ জানাতে এবং উৎসাহিত করতে। দেখুন, আমি একজন কুমারী মেয়ে। তা ছাড়া আমি খানদের আভিজাত্যের অংশ। কিন্তু খানদের আভিজাত্য মান-মর্যাদা সবই এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাচা এলিকখান এবারের পরাজয়ের পর মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু আমার আত্মমর্যাদাবোধ চাচার এই মনোবল হারানোকে মেনে নিতে পারছে না।
আচ্ছা? গযনীর মাহমূদ কি কোন জিন-ভূত না দৈত্য দানব? যে ব্যক্তি এই মাহমূদকে পরাজিত করে এমন পাহাড়ে পাহাড়ে লুকিয়ে বেড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারবে তার জন্যে আমার সব কিছু কুরবান করে দিতে প্রস্তুত আমি। আমি দেখেছি, আপনার মধ্যে সেই সংকল্প আছে। এজন্য আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।
আচ্ছা, তাই নাকি? মাহমূদের সাথে শাহজাদীর দুশমনি কেন?
কেন নয়? ইসরাঈল সেলজুকীর সাথে মাহমূদের কি নিয়ে দুশমনী? আপনার সাথে যে কারণে মাহমূদের শত্রুতা, আমার সাথেও এ কারণেই মাহমূদের শক্রতা।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। এসো এসো, আমরা এক জায়গায় বসে কথা বলি। আসলে শত্রু শত্রুই। কেন শত্রুতা, কেন দুশমনি, এসব বিষয় শত্রুকে পরাজিত করার পরই কেবল আলোচিত হতে পারে।
মারয়াম! তুমি অল্প বয়সী কুমারী তরুণী বটে কিন্তু তোমার চিন্তা ভাবনা আনাড়ী নয়, তুমি তো বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতো কথা বলছে। এতে বিদ্যা বুদ্ধি তুমি কোথায় পেলে?
আরে, প্রয়োজনেই মানুষ বিজ্ঞ হয়ে ওঠে। আমিও প্রয়োজনের তাকিদেই এমনটা হয়ে উঠেছি।
এরপর তারা দুজন একটি বড় গাছের নীচে বসে কথা বলতে শুরু করলো । দীর্ঘক্ষণ নানা বিষয়ে কথা বলার পর পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেল। এক পর্যায়ে ইসরাঈল মারয়ামকে বললো–
এলিকখানের সাথে কি তোমার ব্যাপারে কথা বলবো?
তোমার মন চাইলে বলল, আমার কোন সমস্যা নেই। তিনি সম্মত না হলেও আমি তোমার কাছে চলে আসবো। তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। আমি আমার ভবিষ্যত তোমার সাথেই বেঁধে ফেলেছি ইসরাঈল! বহুদিন ধরে আমি তোমার মতো দৃঢ়চেতা একজন বীর পুরুষের খোঁজ করছিলাম। আমার স্বপ্নগুলো যার মাধ্যমে বাস্তব রূপ দেয়া সম্ভব। সুলতান মাহমুদকে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্যে তুমি আমাকে যে ভাবে ইচ্ছা কাজে লাগাতে পারো, আমাকে সব সময় প্রস্তুত পাবে।
