সুলতান মাহমূদ কয়েকজন সেলজুকীকে তার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার কারণে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে ছিলেন। কারণ বংশানুক্রমে সেলজুকীরা ছিল লড়াকু। সেলজুকীরা ছিল বুখারার পাহাড়ী এলাকার অধিবাসী। সেলজুকীরা তুর্কি ও সামানীদের লড়াইয়ে সামানীদের পক্ষাবলম্বন করেছিল। অন্যভাবে বলা চলে, সামানীরা সেলজুকীদের উস্কানিতেই লড়াই করেছিল। এর পর থেকে সেলজুকীরা একটি সামরিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়।
সেলজুকী সরদার লুকমান সেলজুকীর ছেলে ইসরাঈল সেলজুকী বুখারা শাসকদের কাছে যথেষ্ট মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী ছিল। বুখারার শাসক আলাফতোগীনের খুবই প্রিয় পাত্রে পরিণত হয় ইসরাঈল সেলজুকী। তাদের মধ্যে গড়ে উঠে গভীর হৃদ্যতা। সুলতান মাহমূদ যখন এই কুচক্রীদের দমন করার জন্যে বুখারা আক্রমণ করেন তখন এরা উভয়েই পাহাড়ী এলাকায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
অপর দিকে পূর্ব তুর্কিস্তানের এলিকখান ছিল একটি শক্তিশালী রাজ্যের শাসক। সে সব সময় কাউকে না কাউকে সাথে নিয়ে সুলতান মাহমুদের বিরোধিতায় লিপ্ত থাকতো। কিন্তু যতো বার এলিকখান সুলতান মাহমুদের মুখোমুখী হয়েছে ততোবারই মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়েছে।
সর্বশেষ পরাজয়ের পর এলিকখান যখন তার পরিবার পরিজন নিয়ে পাহাড়ী এলাকায় আত্মগোপন করেছিল তখন ইসরাঈল সেলজুকী এলিকখানের সাথে সাক্ষাত করতে গেল। সর্বশেষ লড়াইয়ে ইসরাঈল সেলজুকীর নেতৃত্বাধীন সেলজুকী উপজাতিরাও এলিকখানের সহযোগী ছিল না।
এলিকখান সবুজ ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত পাহাড়ী এলাকায় তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছিল। ইসরাঈল সেলজুকী তাকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে পৌঁছে গেল। এলিকখানের তাঁবুতে সুন্দরী নারীও ছিল। নর্তকী ও গায়িকাও ছিল তার সাথে। রাজ প্রাসাদের বিলাসবহুল সব ধরনের আসবাব পত্র ছিল এলিকখানের তাঁবুতে। ইসরাঈল সেলজুকী যখন সেখানে উপস্থিত হলো, তখন এলিকখান তার তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। এলিকখানের তাঁবুটি ছিল ছোটখাটো একটা রাজ প্রাসাদের মতো।
এলিকখান পূর্ব থেকেই ইসরাঈল সেলজুকীকে চিনতেন। ইসরাঈল সেলজুকী একজন আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী তাগড়া যুবক। অত্যন্ত মোহনীয় দেহ সৌন্দর্যের অধিকারী ব্যক্তিত্ববান তরুণ। ইসরাঈল সেলজুকী ছিল তার গোত্রের সর্দার। তখন সেলজুকী গোত্র ছিল একটি আলোচিত সামরিক শক্তি।
এখন আমার কাছে কেন এসেছে ইসরাঈল? ইসরাঈল সেলজুকীকে জিজ্ঞেস করলেন এলিকখান।
রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসা নেতাদের অবস্থা নিজ চোখে দেখতে এসেছি। তারা কেমন থাকে কিছুটা তীর্যক ভাষায় জবাব দিলো ইসরাঈল।
আপনার হয়তো এজন্য আমার প্রতি ক্ষোভ আছে, আমি আপনার কোন উপকার করিনি, তাই না? আমিও কিন্তু একথা বলতে পারি, আপনিও আমার কাছে কোন ধরনের সহযোগিত চাননি। আপনি কি নিজেকে এতোটাই শক্তিশালী ভেবে বসেছিলেন যে, আমার সহযোগিতা ছাড়াই আপনি গযনীর মাহমূদকে পরাজিত করতে পারবেন?
আমার বলার প্রয়োজন হবে কেন? তোমার তো নিজ উদ্যোগেই আমার সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত ছিল–বললেন এলিকখান।
আসলে ব্যাপারটিতে আপনি এখন যে ভাবে বলছেন তেমন ছিল না। আপনি হয়তো তখন চেয়েছিলেন আমার সহযোগিতা ছাড়াই আপনি সুলতান মাহমূদকে পরাজিত করে গযনী ও বুখারার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাবেন। অথচ সামানীরা আমার সহযোগিতা ছাড়া কখনো তুর্কিদের পরাজিত করতে পারেনি। সেলজুকীরা যখন সামানীদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে তখন সামানীদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে। সেই যে তুর্কিরা সেলজুকীদের হাতে মার খেয়েছিল আজ পর্যন্ত সেলজুকীদের নাম শুনলে তুর্কিদের ভয়ে শরীর কাঁপে।
.
তুমি কি আমাকে পরাজয়ের জন্য তিরস্কার করতে এসেছো? তুমি কি আমাকে দেখতে এসেছো আমি এই পরাজয়ের পর কতোটা দুর্বল হয়ে পড়েছি? বললেন এলিকখান।
না, না, এলিকখান! এতটুকু পরাজয়ে আপনি এতোটা হীনমন্যতার শিকার হবেন না যে, দোস্ত-দুশমনের ভেদাভেদ গুলিয়ে যাবে। মনে রাখবেন, আমাদের শত্রু অভিন্ন। গযনীর মাহমূদ উভয়ের শত্রু। আপনি একাকি ওকে পরাজিত করতে পারবেন না। ইচ্ছা করলে সেলজুকীরই তাকে পরাজিত করতে পারে। আমি এখন আপনার সাথে এজন্য সাক্ষাত করতে এসেছি মাহমুদের বিরুদ্ধে আপনি আমাদের কতটুকু সহযোগিতা করতে পারেন। আপনি কি আমাদের সৈন্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন?
আপনি সহযোগিতা না করলেও আমি মাহমূদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। আলাফতোগীন আছে আমার সঙ্গে।
মাথা ঠিক করে কথা বলো ইসরাঈল- কিছুটা তাচ্ছিল্যমাখা কণ্ঠে বললেন এলিকখান। এ পর্যন্ত তোমাদের ইতিহাস হলো অন্যদের তোমরা সহযোগিতা করেছো, এবং সহযোগী হিসেবেই লড়াই করেছে। মূল শক্তি হিসেবে লড়াই করোনি। তোমরা মাহমূদের সৈন্যদের সাথে কখনো মুখোমুখি লড়াই করোনি। মাহমূদ জঙ্গি চালে তার চেয়ে তিনগুণ বেশী শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম। তার সৈন্যরা কঠিন সংকটেও কখনো বেসামাল হয় না। দীর্ঘ প্রশিক্ষিত ঘোড়ার মতোই আমৃত্যু লড়াই করে। ওরা সামান্য ইঙ্গিতেই বিদ্যুতের গতিতে জায়গা বদল করে কিন্তু আমাদের সৈন্যদের এই গুণ নেই।
এলিকখান! আমি বুঝতে পারছি এবারের পরাজয়ের ক্ষত আপনার রগরেশায় ঢুকে পড়েছে। আতংক ভর করেছে আপনার মনে। মনে হচ্ছে আপনার কাছে সহযোগিতা প্রত্যাশা করাই উচিত হবে না। যদি খান সর্দারের মনেই এমন আতংক বাসা বেঁধে থাকে তবে খানদের সৈন্যরা তো ভয়ে কম্পমান।
