উল্লেখিত সংখ্যার যে কোন একটিকে সঠিক মনে করলেও একথা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, গয়নী থেকে এবার সুলতান মাহমুদ যে সৈন্য নিয়ে ভারতের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন তাদের সংখ্যা উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে অর্ধেকেরও কম ছিল।
সৈন্য সংখ্যা কম ছাড়াও সুলতান মাহমূদের জন্যে সবচেয়ে বেশী অসুবিধা ছিলো, এবার তিনি এমন এক জায়গায় মোকাবেলার জন্যে রওয়ানা হয়েছিলেন, যে জায়গাটি ছিল চতুর্দিক থেকে হিন্দুবেষ্টিত। এখানকার পরিবেশ, মাটি মানুষ সবই ছিল তার প্রতিকূলে।
কনৌজের রাজা রাজ্যপালের নিহত হওয়া এবং তিন রাজার ষড়।ন্ত্রের কথা শুনে সুলতান মাহমূদ তার সেনাদের অভিযানের নির্দেশ দিয়ে দেন। অবশ্য গযনী সেনাদের জন্যে হিন্দুস্তানের একজন পরাজিত রাজার মৃত্যু তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। কিন্তু রাজা রাজ্যপাল গযনী সুলতানের অনুগত এবং মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ থাকার কারণে ব্যাপারটির রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল। তার চক্রান্তমূলক হত্যার ব্যাপারটি ছিল সুলতান মাহমূদের জন্যে একটি পরিতার বার্তা। যে বার্তা চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিচ্ছিল, হিন্দুরা এবার সুলতান মা মূদকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে শক্তি সঞ্চয় করেছে। কনৌজে নিয়োজিত আব্দুল কাদের সেলজুকী তার পাঠানো সংবাদে এ বিষয়ে ইঙ্গিত করেছিলেন যে, হিন্দুস্তানের হিন্দু রাজা মহারাজারা একত্রিত হয়ে গযনীর বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।
শায়খ আবুল হাসান কিরখানী ছাড়াও আবু সাঈদ আব্দুল মালেক নামের আরেকজন বিদগ্ধ আলেমেরও ভক্ত ছিলেন সুলতান মাহমুদ। তিনি গযনী থেকে অনেক দূরে বসবাস করতেন। সুলতান মাহমুদ তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্যে কয়েকবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাঁর কাছে গেছেন।
এবার সুলতান যখন হিন্দুস্তানে যাত্রা করলেন, যাত্রার দ্বিতীয় দিন অগ্রবর্তী বাহিনী থেকে এক কমান্ডার উধ্বশ্বাসে ঘোড়া হাঁকিয়ে সুলতানের কাছে এসে জানালো– আবু সাঈদ আব্দুল মালেক নামের একজন আলেম ও বুযুর্গ আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্যে পথিমধ্যে অপেক্ষা করছেন। এ খবর পেয়ে সুলতান তখনই ঘোড়ায় চড়ে আবু সাঈদের কাছে পৌঁছলেন এবং ঘোড়া থেকে নেমে তার কপালে চুমু দিয়ে মোসাফাহা করলেন।
গতকাল আমি জানতে পেরেছি আপনি হিন্দুস্তান যাচ্ছেন– বললেন আবু সাঈদ আব্দুল মালেক। দু’আ করছি আল্লাহ এ সফরে আপনাকে সাফল্য দান করুন। এখন আপনাকে আমি কিছু বলবো না। শুধু এতটুকু বলতে চাই, আপনি ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছেন। আপনার এই অভিযান আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এই যুদ্ধকে আপনি ব্যক্তিগত যুদ্ধে পরিণত করবেন না। মনে রাখবেন, রাজত্ব ও বাদশাহী এককভাবে আল্লাহ তাআলার। ক্ষমতা ও রাজত্বের নেশা মন থেকে বের করে দিন।
ক্ষমতা ও রাজত্বের নেশা এমন ভয়ংকর যে, এই নেশা যদি কাউকে পেয়ে বসে তাহলে সে দীন ধর্ম সবই ভুলে যায়। ক্ষমতালোভী শাসকরা একথাও ভুলে যায় মুহূর্তের মধ্যে তার মৃত্যু ঘটতে পারে। তাদের কানে মজলুম আর্তের আর্তনাদ পৌঁছে না। তাদের চোখ অন্ধ হয়ে যায়। প্রজাদের দুর্ভোগ দুর্দশা তাদের চোখে পড়ে না। ক্ষমতা পিপাসু শাসকেরা তাই দেখে এবং তাই শুনে যা তাদের তোষামোদকারী দরবারী মোসাহেবরা দেখায় এবং শোনায়। মোসাহেব ও তোষামে দকারীরা তাই শোনায় যার মধ্যে তাদের স্বার্থ জড়িত থাকে। সুলতান মাহমূদ মাথা নত করে আবু সাঈদ আব্দুল মালেকের কথা শুনছিলেন।
আবু সাঈদ আরো বললেন, আমি বেশী সময় আপনাকে আটকে রাখবো না সুলতান! আপনি কখনো ভুলে যাবেন না, দুনিয়ার সকল বেঈমানদের দৃষ্টি আপনার উপর। কুফরী শক্তি আপনার মৃত্যুর জন্যে প্রহর শুনছে। আপনার মুসলমান প্রতিবেশীরাও আপনার মৃত্যু কামনা করে। এজন্য আপনার এমন প্রতিজ্ঞা করা উচিত, আপনি মরে গিয়েও যাতে অমর থাকেন। আপনি আপনার কাজ কর্মে অনুকরণীয় আদর্শ রচনা করে মানুষের হৃদয়ে জীবিত থাকবেন। আপনার এমন কাজ করতে হবে যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম আপনার আদর্শিক পথে চলে আপনাকে জীবন্ত রাখে। আপনি যদি হিন্দুস্তানের পৌত্তলিকদের মাথা গুঁড়িয়ে দিতে না পারেন, তবে এরা যতত দিন পর্যন্ত হিন্দুস্তানে একজন মুসলমান জীবিত থাকবে ততো দিন পর্যন্ত মুসলিম নির্যাতন অব্যাহত রাখবে।
দুআ করুন হযরত! আল্লাহ তাআলা যেন আপনাদের প্রত্যাশা পূরণে আমাকে সফলকাম করেন– বললেন সুলতান মাহমুদ। এবার আমি সফল হলে হিন্দুস্তানে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবো। সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক সেনাবাহিনীকেও রেখে আসবো।
আল বিদা মাহমূদ! দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে সুলতানকে বিদায় জানিয়ে বললেন আবু সাঈদ। আপনার সাফল্যের জন্যে আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে। দু’আ করছি। দুআ করি আল্লাহ যেনো আপনার সঙ্গে থাকেন এবং আপনাকে সাহায্য করেন।
সুলতান মাহমূদ আবু সাঈদের হাতে চুমু খেয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে গেলেন।
সুলতান মাহমূদ জানেন, তার অগ্র-পশ্চাৎ ডানে বামে চতুর্দিকে শত্রু। তার সামনে দৃশ্যমান হিন্দু শত্রু আর পেছনে অদৃশ্য মুসলিম শত্রু। কিন্তু তার জানা ছিল না এবার প্রাণঘাতি শত্ৰু তার সফর সঙ্গী হয়ে তার কাফেলায় মিশে গেছে এবং তার সাথেই যাচ্ছে।
