ইসলাম বিদ্বেষীরা ইতিহাসের মুখে ছাই দিয়ে চরম মিথ্যাকে সত্য বলে এবং সত্যকে মিথ্যা বলে প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষাকে মুসলমানরা ভুলে গিয়েছে। আর মুসলিম বিদ্বেষী ইসলামের শত্রুরা এ বিষয়টিও মনে রেখেছে, কোন জনগোষ্ঠীকে তার অবস্থান থেকে নিচে নামাতে হবে এবং তাদের সুউচ্চ মর্যাদার আসন থেকে ভূতলে নিক্ষেপ করতে হবে। ইসলামের শত্রুরা সাফল্যের সাথে কঠোর পরিশ্রমী এবং আড়ম্বরহীন জীবন যাপনকারীদেরকে বিলাসী জীবনে অভ্যস্থ করেছে এবং জাগতিক জীবনকে ভোগবাদ ও বস্তুবাদের আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের প্রকৃত ইতিহাস থেকেও বিমুখ রাখার মিশনে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে। অজস্র প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে যে ইতিহাস ইসলামের বীর সৈনিকেরা নির্মাণ করেছিলো, সেই ইতিহাসকে মদের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছে। সুন্দর ও স্বচ্চ আবেগকে পাশবিকতার মোড়কে ঢেকে দিয়েছে। ফলে মুসলমানরা ভুলে গেছে কি ছিল তাদের স্বরূপ এবং কি ছিল তাদের কর্তব্য। তাই মুসলমানরা তাদের আসল গন্তব্য ভুলে গিয়ে নিশ্চিত ধ্বংসের পথে চলতে শুরু করেছে। ফলে যে মাটি মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গীরা জয় করেছিল, যে মাটিতে গযনীর বীর সেনানীদের গন্ধ মিশে গিয়েছিল, বীর সেনানীদের রক্ত ও দেহের সেই গন্ধই তখনকার মুসলমানদেরকে কুফর ও বেঈমান শক্তির বিরুদ্ধে পাহাড়ের মতো দৃঢ়তায় মোকাবেলা করতে সাহস ও শক্তি যোগাতো।
সে জাতিই তার লব্ধ সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, যে জাতি তার শহীদানের রক্তে লেখা ইতিহাস ভুলে না গিয়ে শহীদানের গড়া ইতিহাস মিটে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। সে জাতিই তার ইতিহাসকে রক্ত ও আবেগ দিয়ে জীবন্ত রাখে, পূর্বসূরীদের ঐতিহ্যকে মুছে যেতে দেয় না। বরং পূর্বসূরীদের ঐতিহ্যকে উত্তরসূরীদের জন্য আরো স্থায়ী ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
সুলতান মাহমূদ বাতিল ও ইসলাম বিদ্বেষীদের জন্যে ছিলেন এক জীবন্ত আতংক। সকল ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, সুলতান মাহমূদ ছিলেন সর্বকালের সেরা যোদ্ধা। তার সময়ে বর্তমান পাকিস্তানের মুলতান অঞ্চল কেরামতী নামের একটি ভ্রান্ত ও শিরক মিশ্রিত অনৈসলামিক গোষ্ঠীর আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। কেরামতীরা ওই অঞ্চলে বিরাট সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তারা সুলতান মাহমূদের জন্যে মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাতিল জনগোষ্ঠীর শিকড় উপড়ে ফেলার জন্যে সুলতান মাহমূদকে একজন সাধারণ যোদ্ধার মতোই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে হয়েছিল।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, কেরামতী বিরোধী লড়াইয়ে সুলতান মাহমূদ এমন কঠিন যুদ্ধ করেছিলেন যে, তার ডান হাত জমাটবাঁধা রক্তের কারণে তরবারীর বাটে আটকে গিয়েছিল। রক্তের পর রক্ত লাগতে লাগতে তা জমাট বেঁধে যায়। সুলতানের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তরবারীর বাট থেকে আলাদা করতে দীর্ঘ সময় গরম পানি ঢালতে হয়েছিল। দীর্ঘ সময় গরম পানি ঢালার পর জমাট বাধা রক্ত ধুইয়ে গেলে তরবারীর বাটে আটকে যাওয়া সুলতানের হাত আলাদা করা সম্ভব হয়।
আজো ইসলামের নামে কুফরী শক্তি মুসলিম বিশ্বকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। বিভ্রান্ত মুসলমানরা ইহুদী, খৃষ্টান ও পৌত্তলিকদের ক্রীড়নক হয়ে সত্যিকার মুসলমানদের বিনাস সাধনে লিপ্ত। সুলতান মাহমুদের কবর আজ খ্রিস্টান, ইহুদী শক্তির ট্যাংক বামারু বিমানের ছোঁড়া হাজারো বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত।
দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয়, তৎকালীন ভারতে অসংখ্যবার অভিযান পরিচালনাকারী বীর মুজাহিদ সুলতান মাহমূদের অভিযানকে মাত্র সতেরোটি অভিযানে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। তার বিশাল কৃতিত্বকে মুছে ফেলা হয়েছে। বস্তুত একজন খাঁটি সৈনিকের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখানোর জন্যেই ইতিহাসের নামে এসব গল্প ফাঁদা হয়েছে। যেগুলোর সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই। আমাদের কর্তব্য, এই ক্ষণজন্মা বীর যোদ্ধার প্রতিটি পদক্ষেপকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে সঠিক ভাবে তোলে ধরা। তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম বুঝতে পারবে, কতোটা বৈরী পরিবেশ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও ইসলামের জন্যে নিবেদিত প্রাণ এই মর্দে মুজাহিদ ইসলামের জন্য কি বিশাল অবদান রেখে গেছেন। যা কেয়ামত পর্যন্ত যে কোন মুসলমানের জন্যে অনুপ্রেরণার উৎস।
১০২০ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪১২ হিজরী সনের বসন্তকালের শুরুর দিকে গযনী থেকে সুলতান মাহমুদের বাহিনী বন্যার মতো ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। গযনীর সেনা বাহিনীর গতি ক্ষিপ্র ছিল বটে। কিন্তু তাদের জনবল এতোটা ছিল না, যে পরিমাণ জনশক্তি নিয়ে গঙ্গা যমুনার মধ্যবর্তী স্থানে কালাঞ্জর গোয়ালিয়র ও লাহোরের সম্মিলিত বাহিনী একত্রিত হয়েছিল। দৃশ্যত এই তিন রাজ্যের সেনা সংখ্যা ছিল গযনী বাহিনীর চেয়ে তিনগুণ বেশী।
সকল ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে একমত, তিন রাজার সেনাদের মধ্যে এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার ছিল পদাতিক সৈন্য, ছত্রিশ হাজার অশ্বারোহী এবং ছয়শ চল্লিশটি ছিল জঙ্গি হাতি। সেই সময়কার ঐতিহাসিক ফারখী লিখেছেন, কালা র, গোয়ালিয়র ও লাহোরের সম্মিলিত সৈন্যদের মধ্যে এক লাখ বত্রিশ হাজার ছিল পদাতিক সৈন্য, ছয়ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী এবং নয়শ জঙ্গি হাতি।
