খবর পেয়েই সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকী ঝড়ের বেগে রাড়ীতে পৌঁছলেন। তিনি এসে ঘটনার আদি অন্ত সব শুনে গোবিন্দকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুমি পালিয়ে যেতে চেষ্টা করো। ছাড়া পেয়ে গোবিন্দ পালানোর জন্য দৌড়াতে লাগল। আবদুল কাদের সেলজুকী তার এক সহকর্মীর কাছ থেকে। একটি তীর ও ধনুক নিয়ে দ্রুত তীরটি গোবিন্দকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে তীরটি গিয়ে গোবিন্দের পিঠে বিদ্ধ হলো এবং গোবিন্দ আর্ত চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। সেনাপতি সেলজুকী সৈন্যদের বললেন, ওর মরদেহটিকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে শহরের বাইরে ফেলে এসো।
একজন পরাজিত বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া রাজার খুন হয়ে যাওয়াটা সুলতান মাহমূদের জন্যে এমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না যে, দ্রুত তাকে এ ব্যাপারে অবহিত করতে হবে। আসলে পরাজিত রাজা রাজ্যপালের মৃত্যুর চেয়ে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের হিন্দু রাজাদের চক্রান্তের বিষয়টি ছিল গযনী সুলতান ও গযনী বাহিনীর জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মহারাজা রাজ্যপালের খুনের ব্যাপারটি এবং গোবিন্দের দ্বিমুখী গোয়েন্দাগিরি ও কালাঞ্জর এবং গোয়ালিয়রের হিন্দু রাজাদের চক্রান্তের খবর দিয়ে একজন দ্রুতগামী দূতকে তখনই সেনাপতি সেলজুকী গযনীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিয়ে দিলেন।
সুলতান মাহমূদ দূতের মুখে এই সংবাদ শুনে সাথে সাথেই সৈন্যদেরকে হিন্দুস্তানে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন।
তিন দিন পর এক ঐতিহাসি লড়াইয়ের জন্যে গযনী বাহিনী হিন্দুস্তানের দিকে রওয়ানা হলো। আর এদিকে গোয়ালিয়র, কালাঞ্জর ও লাহোরের হিন্দু সৈন্যরা চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিল। হিন্দু রাজারা জানতো, রাজ্যপালের খুনের চক্রান্ত ফাঁস হয়ে গেলে এবং তিন রাজার মিলিত যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর প্রকাশ হয়ে গেলে সুলতান মাহমূদ ঝড়ের বেগে হিন্দুস্তানের দিকে রওয়ানা হবেন। আর এটিই হবে তাদের সাথে গযনী বাহিনীর চূড়ান্ত লড়াই।
৫.২ বিস্ময়কর ঘটনা
নয়শ’ সত্তর সালের ঘটনা। সুলতান মাহমুদের শায়খ ও মুর্শিদ শায়খ আবুল হাসান কিরখানী একদিন গযনী সুলতানের উদ্দেশ্যে বললেন–
যে যুগের মুসলমানরা হিন্দু ও ইহুদীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সেই যুগটি হবে মুসলমানদের পতনের যুগ। সেটি হবে ইসলামের কালো যুগ। সে যুগেই আল্লাহর এই যমীন মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হবে।
তোমার শাসিত এলাকায় অমুসলিমরা দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের খেয়াল খুশী মতো শাসনের নামে দুঃশাসন চালাবে। গযনী কান্দাহার কাবুল গার দিজ বিধর্মীদের পায়ের চাপে পিষ্ট হবে। যাদের কাছে ন্যূনতম কোন নীতি নৈতিকতা ও মানবতাবোধ নেই, যারা মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর নির্মম তাদেরকে মুসলমানদের একটি অংশ শুভাকাঙ্ক্ষী ভাবতে শুরু করবে। মাহমূদ! সেদিন তোমার কবর অমুসলিমদের কিছুই করতে পারবে না। বরং তোমার কবরের উপরেও চলবে রক্তের হোলি খেলা। তখন আমাদের পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব হবে না। তাই যদি কিছু করতে হয় তবে এখনই করতে হবে।
সুলতান মাহমূদ তার জীবনের সিংহভাগ বাতিলের বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে কাটিয়েছেন। অবশেষে এক সময় তার হৃদরোগ দেখা দিল। তিনি চিকিৎসককে কঠোরভাবে নির্দেশ দিলেন, তার এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারটি যেন তার কাছ থেকে কেউ জানতে না পারে। সুলতানকে তার আধ্যাত্মিক গুরু বলেছিলেন, যেহেতু মৃত্যুর পর আমাদের আর করণীয় কিছু থাকবে না, তাই ভবিষ্যত করণীয় কাজটি এখনই করতে হবে। এজন্য সুলতান তার বর্তমানকে ভবিষ্যত রচনার কাজে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তিনি তার আরাম বিসর্জন দিয়ে বিশ্রাম শরীর দেহ মনকে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যত বিনির্মাণের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে সেই মরণজয়ী বীরযোদ্ধা ও তার আধ্যাত্মিক গুরুর কবরের চারপাশে আস্তানা গেড়েছে বিদেশী হানাদার বাহিনী। এই হানাদার বাহিনী নিরীহ মুসলমানদের জীবন ও ইজ্জত নিয়ে হায়েনার মতো হিংস্র উন্মত্ততায় মেতে উঠেছে। যাদের কোন নীতি নৈতিকতা নেই, নেই কোন মানবিক বিচারবোধ। অথচ এই দখলকার বাহিনীকেই কথিত মুসলমানরা তাদের ত্রাণকর্তা মেনে নিয়েছে।
কেন? কেন এমনটা হলো? স্বাধীনতা পাগল দীন ও ইসলামের প্রশ্নে আপসহীন এই জাতির আজ কি হলো? কোথায় হারিয়ে গেছে বিশ্বখ্যাত স্বাধীনচেতা মুসলমানদের পরাজয় পরাভব না মানার অমিত তেজ ও সাহস? কেন একদল আফগান সোনালী অতীতকে ভুলে বিলাসিতা ও পার্থিব স্বার্থের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলো? কেন হাজার হাজার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজ ভূলুণ্ঠিত?
আসলে স্বাধীনতার প্রদীপ জাতির রক্ত পুড়িয়ে আলো বিকিরণ করে। সেই রক্ত আজ বিক্রি হয়ে গেছে। তাদের ঈমানী চেতনা আজ মরে গেছে। শহীদানের রক্ত শুষ্ক মাটি শুষে নিয়েছে, আর নিজেদের অদূরদর্শিতা স্বার্থান্ধতা এবং দলবাজীর মূল্য আজ বিশ্বের মুসলিম উম্মাহকে কড়ায় গণ্ডায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। ইতিহাসের প্রতি আমরা মোটেও সুবিচার করিনি। কল্পিত ইতিহাস সুলতান মাহমুদের প্রতিও চরম অবিচার করেছে। মুসলিম বিদ্বেষী ইসলামের শত্রুদের চরম বিজয় হয়েছে। যারা ছিল পৃথিবীর অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ বীর পুরুষ তাদেকেই তারা খুনী, সন্ত্রাসী লুটেরা হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তারা মূর্তি সংহারীকেই মূর্তি পূজারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
