ধড়ফড় করে জেগে উঠলো যুলকারনাইন। ঘটনার আকস্মিকতায় সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে বাতি জ্বালালো। তার বিছানায় রক্তমাখা খঞ্জর দেখে অবাক হয়ে গেল। রাজিয়া তখন দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে। যুলকারনাইন আকস্মিক এই অবস্থার কোন কূলকিনারা বুঝে উঠতে না পেরে রাজিয়াকে টেনে তুলে জিজ্ঞেস করলো, এসব কি? এই রক্তমাখা খঞ্জর কোত্থেকে এসেছে? তুমি এভাবে কাঁদছো কেন?
রাজিয়া কান্না জড়িত কণ্ঠে বললো-”না, আমি তোমাকে হত্যা করতে পারবো না। আমি আমার কলিজায় খঞ্জর চালাতে পারবো না। একথা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো রাজিয়া।
তখনো যুলকারনাইন ঘটনার মাথামুণ্ডু কিছুই পরিষ্কার বুঝতে পারল না। তবে এতটুকু আন্দাজ করতে পারলো, নিশ্চয় কোন চক্রান্তের শিকার হয়েছে রাজিয়া। যা সে সহজে বলতে পারছে না। একজন কমান্ডার হিসেবে সে যে হিন্দুদের টার্গেট সে সম্পর্কে সতর্ক ছিল যুলকারনাইন। তাই ঠাণ্ডা মাথায় সে রাজিয়াকে জিজ্ঞেস করলো–
কি হয়েছে রাজিয়া? আমাকে সব খুলে বললো, তোমার কোন ভয় নেই। তুমি কোন অপরাধ করে থাকলেও আমি কিছুই বলবো না। পরিষ্কার করে আমাকে সব বলো।
যুলকারনাইনের আশ্বাস ও উপর্যপরী অনুরোধে রাজিয়া বললো- আমি কতক্ষণ আগে নিজ হাতে মহারাজা রাজ্যপালকে খুন করে এসেছি। কথা ছিল এরপর তোমাকে হত্যা করবো।
কি বলছো এসব? তোমার মাথা ঠিক আছে? তোমার মতো একটি মেয়ে মহারাজাকে খুন করতে পারে? আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আসল কথা আড়াল না করে আমার কাছে প্রকৃত ঘটনা খুলে বলল।
রাজিয়া জানালো, আমি দু’জন হিন্দু মেয়ের সাথে নদীতে গোসল করতে যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে সন্ন্যাসীরূপী এক বয়স্ক সাধুকে দেখতে পাই। তারপর রাজিয়া জানালো, সন্ন্যাসী তাকে দেখে কি ভবিষ্যদ্বাণী করলো এবং ইসলাম গ্রহণের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হলে তাকে কি করতে হবে। রাজিয়া এও জানালো, হিন্দু মেয়েরা তাকে কি ভাবে রাজ্যপালকে হত্যার জন্যে উদ্বুদ্ধ করলো এবং হত্যাকাণ্ডে যাওয়ার আগে সন্ন্যাসীর দেয়া তুলা ভেজানো পানি পানের কথাও যুলকারনাইনকে জানালো।
রাজিয়া বললো- আমাকে ক্ষমা করে দাও যুলকারনাইন, এই খঞ্জর দিয়ে আমাকে তুমি খুন করে ফেলো। আমি তোমার প্রেমে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম বটে। কিন্তু তোমার ধর্মকে আমি মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারিনি। ধর্ম নয়, আমার হৃদয়ে শুধু তোমার প্রতিই ভালোবাসা ছিল। আমি তোমার শেখানো ইবাদত বন্দেগীর কোনটাই নিষ্ঠার সাথে পালন করতে পারিনি। তুমি আমাকে হিন্দু মেয়েদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দিয়েছিলে কিন্তু আমি হিন্দু মেয়েদের সাথে মেলামেশা করে ইসলাম প্রচারের বিপরীতে হিন্দুত্বকেই আরো বেশি আত্মস্থ করেছি। রাজিয়া বললো, সেই শৈশবকাল থেকেই আমাকে বুঝানো হয়েছে, মুসলমানরা পাপী, অপবিত্র, ঘৃণার পাত্র। আমিও মুসলমানদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়েই বড় হয়েছি। কিন্তু তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে তোমাকে আমি ঘৃণা করতে পারিনি। তবে অন্য মুসলমানদের প্রতি আমার কোনই শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়নি।
হঠাৎ দ্রুত পায়ে উঠে রক্তাক্ত খঞ্জরটি যুলকারনাইনের প্রতি বাড়িয়ে দিয়ে রাজিয়া বললো- এই খঞ্জর দিয়ে তুমি আমাকে খুন করে ফেলো। আমি আর বাঁচতে চাই না। আমি যে পাপ করেছি মৃত্যুই এর উপযুক্ত শাস্তি।
যুলকারনাইন রাজিয়ার হাত থেকে খঞ্জর ছিনিয়ে নিয়ে বললো, তোমাকে মরলে চলবে না, বেঁচে থাকতে হবে। অচিরেই তোমার হৃদয়ও বলবে, মুসলমানরা সত্যিকারে অপবিত্র নয়, পবিত্র। ইসলাম কোন মিথ্যা ধর্ম নয় বরং হিন্দুত্ববাদই মিথ্যা। অনেক কথা বলে অনেক কষ্টে যুলকারনাইন রাজিয়াকে শান্ত করলো।
রাত পোহালে যুলকারনাইন রাজ্যপাল নিহত হওয়ার খবর দিয়ে কনৌজের গভর্ণর আব্দুল কাদের সেলজুকীর কাছে দ্রুত পাঠালো এবং রাজিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী দুই হিন্দু মহিলাকে গ্রেফতার করে আনলো। মহিলা দু’জনকে হুমকি ধমকি ও ভয়-ভীতি দেখানোর পর তারা গোবিন্দের কারসাজির কথা প্রকাশ করে দিল। তাৎক্ষণিক গোবিন্দকে পাকড়াও করা হলো।
কিন্তু চক্রান্তের ব্যাপারে গোবিন্দকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে এর সাথে সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করলো এবং বললো– এই দুই মহিলার সাথে কখনো আমার কোন কথা হয়নি। গোবিন্দকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেও যখন যুলকারনাইন তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি বের করতে পারলো না, তখন সে দুটি ঘোড়া আনতে বললো। সহকর্মীরা দু’টি ঘোড়া নিয়ে এলে যুলকারনাইন গোবিন্দের দু’পায়ের গোড়ালীতে রশি বেধে দু’টি ঘোড়ার সাথে বেধে দিল এবং দু’জন অশ্বারোহীকে বললো, দুটি ঘোড়াকে দু’দিকে তাড়া দাও। ঘোড়া দুটি দু’দিকে চলা শুরু করলেই গোবিন্দের দু’পা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সাথে সাথে সে চিৎকার দিয়ে বললো, আমিই রাজাকে হত্যা করেছি। এরপর ঘোড়াকে থামিয়ে গোবিন্দকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কেন এ কাজ করেছো?
গোবিন্দ জানালো, কালাঞ্জর ও গোয়ালিয়রের মহারাজা তাকে বড় অংকের পুরস্কার দানের লোভ দেখায়। সে আরো জানায়, কালাঞ্জর ও গোয়ালিয়রের দুই রাজা মিলে কি পরিকল্পনা করেছে। গোবিন্দ এও জানায়, সে এতো দিন দু’মুখী গোয়েন্দাগিরি করে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই সুবিধা লাভ করেছে।
